‘সংক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার’ মিছিলে পুলিশের লাঠিচার্জ, আহত ৭

আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২৫, ০৫:০৭ এএম

‘সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র-জনতার’ ওপর হামলার প্রতিবাদে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিমুখে ‘সংক্ষুব্ধ পাহাড়ি ছাত্র-জনতার’ ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ বাধা দিয়েছে। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে জলকামান, টিয়ার শেল এবং সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। এ ঘটনায় অন্তত সাতজন আহত হয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) টিএসসি থেকে সচিবালয় অভিমুখে মিছিল নিতে যাত্রা শুরু করে সংক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। মিছিলটি হাইকোর্ট মোড়ের দিকে যাওয়ার পথে কার্জন হল এলাকায় পৌঁছালে পুলিশের বাধার সম্মুখীন হয়।

এদিকে গত বুধবার এনটিসিবি ভবনের সামনে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর। গতকাল প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বার্তায় এই নিন্দা জানানো হয়। অন্যদিকে ‘সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র-জনতার’ ডাকা বিক্ষোভে হামলার প্রতিবাদ জানিয়েছেন দেশের ২৭ বিশিষ্ট নাগরিক। একই ঘটনার প্রতিবাদে পার্বত্য অঞ্চলে বিক্ষোভ হয়েছে। আগামীকাল শনিবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সংহতি সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে ‘সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র-জনতা’।

গতকাল পুলিশের লাঠিচার্জে আহতরা হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তাসমিয়া তাবাসসুম নেবুলা (২২), জাহিদুল ইসলাম রিয়াদ (২২) নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা প্রথম বর্ষের মারুফ হোসেন (২০), অর্থনীতি তৃতীয় বর্ষ ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী তৈয়ব ইসলাম (২৪), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ইভান তাহসিব (২৩), ইডেন কলেজের সমাজকর্ম বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সুমাইয়া খাতুন (২৪) ও পথচারী মো. বাবুল (৪৮)।

আহত ইভান তাহসিব জানান, গত বুধবার এনসিটিবি কার্যালয়ের সামনে আদিবাসী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানাতে তারা সংক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার ব্যানারে রাজু ভাস্কর্যের সামনে থেকে হাইকোর্টের সামনে দিয়ে সচিবালয়-স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় হাইকোর্ট এলাকায় এলে পুলিশি বাধার সম্মুখীন হন। বাধা অতিক্রম করে যাওয়ার সময় পুলিশ তাদের ওপর লাঠিচার্জ, জলকামান নিক্ষেপ করে।

পুলিশি হামলার বর্ণনায় পাহাড়ি ছাত্র-জনতার ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিলে অংশগ্রহণকারী সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের নেত্রী ও ইডেন কলেজের ছাত্রী জয়মা মুনমুন বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করে সচিবালয়ের দিকে যাচ্ছিলাম। তখন তারা (পুলিশ) আমাদের ওপর দফায় দফায় লাঠিচার্জ করেছে। জলকামান ব্যবহার করেছে, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে। হামলায় ছয় থেকে সাতজন আহত হয়েছেন। আমরা এই হামলার তীব্র নিন্দা জানাই।

রমনা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম বলেন, আমরা তাদের বলেছিলাম, এভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দিকে যাওয়া যাবে না। আপনাদের কোনো প্রতিনিধি আমাদের সঙ্গে যেতে পারেন। কিন্তু তারা রাজি না হয়ে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে ফেলে। তখন পুলিশ জলকামান নিক্ষেপ করে। এ সময় পুলিশকে উদ্দেশ্য করে পাহাড়িরা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে।

শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে গতকাল বিকেলে বাম সংগঠনের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিস ঘেরাও করেন। বিক্ষোভের একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর শেহরিন আমিন মোনামি উপস্থিত হলে বিক্ষোভকারীরা তার সঙ্গে বাগবিত-ায় জড়িয়ে পড়েন। এরপর, প্রক্টর অফিসের ভেতরে গিয়ে প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদ খানের সঙ্গেও বাগবিত-ায় জড়ান তারা। এ সময় তারা প্রক্টরকে, হামলাকারী পুলিশদের বিরুদ্ধে মামলা করা এবং হামলার দায়ভার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নিয়ে বিবৃতি দেওয়ার জন্যে জোর করতে থাকেন। প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমদ তাদের কথা শুনে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও তারা তার ওপর চড়াও হন। এ সময় তারা জানান, সন্ধ্যার মধ্যে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে প্রক্টর অফিসে তালা ঝুলানো হবে। এ ঘটনায় ছাত্র ফ্রন্ট, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশন ও অন্যান্য কয়েকটি বাম সংগঠনের নেতাদের নেতৃত্ব দিতে দেখা যায়।

গত বুধবার হামলার ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার আরিফ আল খবির ও মো. আব্বাসকে কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত। গতকাল ঢাকার অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জিয়াদুর রহমানের আদালত শুনানি শেষে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়। এদিন তাদের ফৌজদারি কার্যবিধি ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাদের ঢাকার আদালতে হাজির করা হয়।

আগামীকাল সংক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার সমাবেশ : এনসিটিবি ভবনের সামনে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে আগামীকাল শনিবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সংহতি সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে ‘সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র-জনতা’। আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও এনসিটিবিতে হামলার বিচার দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশে জগদীশ চাকমা এই ঘোষণা দেন। এরপর রাজু ভাস্কর্য থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে রোকেয়া হল-ভিসি চত্বর-কলাভবন-কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি-শাহবাগ হয়ে আবার রাজু ভাস্কর্যে এসে শেষ হয়।

ঢাবিতে ছাত্রদল ও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ : শিক্ষা ভবনের সামনে বামপন্থি সংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশি হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল। গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাস চত্বর থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন তারা। মিছিলটি ভিসি চত্বর ঘুরে রাজু ভাস্কর্য প্রদক্ষিণ করে মিলন চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। এদিকে এনসিটিবির সামনে সংক্ষুব্ধ ছাত্র জনতার কর্মসূচিতে হামলার ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তিন শিক্ষার্থী আহত হন। এ ঘটনায় বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন বিভাগটির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। গতকাল সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

পার্বত্য অঞ্চলে বিক্ষোভ : আদিবাসী শব্দ সংবলিত গ্রাফিতি বাতিলের প্রতিবাদে ঢাকায় কর্মসূচিতে হামলার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং বিচারের দাবিতে রাঙ্গামাটিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল সকালে জিমনেসিয়াম থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। পরে মিছিলটি শহরের প্রধান সড়ক ঘুরে একই স্থানে রাঙ্গামাটি চট্টগ্রাম সড়ক অবরোধ করে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে সব ধরনের যানচলাচল বন্ধ থাকে।

বান্দরবানে থানচিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র সমাজ। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ২টায় উপজেলা মুক্তমঞ্চে জড়ো হতে থাকেন উপজেলায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের পাহাড়ি প্রতিনিধি শিক্ষার্থীরা। খাগড়াছড়িতে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন পাহাড়ি শিক্ষার্থীরা। গতকাল বেলা ১১টার দিকে খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ থেকে সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র-জনতার ব্যানারে মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি চেঙ্গী স্কয়ার, মহাজনপাড়া, শাপলা চত্বর ঘুরে ফের চেঙ্গী স্কয়ারে এসে সমাবেশ করে।

হামলায় নিন্দা প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের : রাজধানীর মতিঝিলে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনটিসিবি) ভবনের সামনে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর। একই সঙ্গে এই ঘটনা তদন্তের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বার্তায় নিন্দা জানিয়ে বলা হয়, এ ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং এরই মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দোষী অন্যদেরও শনাক্ত করা হচ্ছে এবং শিগগিরই গ্রেপ্তার করা হবে। সব দুষ্কৃতকারীকে বিচারের আওতায় আনা হবে।

জুলাই বিপ্লবের সত্যিকারের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে, সরকার স্পষ্টভাবে পুনর্ব্যক্ত করছে যে বাংলাদেশে সহিংসতা, জাতিগত বিদ্বেষ এবং ধর্মান্ধতার কোনো স্থান নেই। যারা ঐক্য, শান্তি ও আইনশৃঙ্খলার বিনষ্ট করবে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না বলে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

২৭ বিশিষ্ট নাগরিকের বিবৃতি : পাঠ্যপুস্তকে ‘আদিবাসী’ শব্দসংবলিত গ্রাফিতি রাখা ও না রাখা নিয়ে ‘সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র-জনতার’ ডাকা বিক্ষোভে হামলার প্রতিবাদ জানিয়েছেন দেশের ২৭ বিশিষ্ট নাগরিক। গতকাল সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে ২৭ বিশিষ্ট নাগরিক বলেন, আদিবাসী ছাত্র-জনতার পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচিতে ‘স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি’ পরিকল্পিত হামলা চালিয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত বুধবার দুই দফা আক্রমণে আদিবাসী ছাত্র-জনতার কমপক্ষে ১১ জন আহত হওয়ার কথা জানা গেছে। প্রথম দফা আক্রমণের সময় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও দ্বিতীয় দফা আক্রমণের সময় পুলিশ হামলাকারীদের সরিয়ে নিলেও এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো আইনি পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

বিশিষ্টজনরা বলেছেন, ‘রাজধানীর মতিঝিল এলাকায় এনসিটিবি ভবনের সামনে ‘আদিবাসী ছাত্র-জনতার’ ওপর পরিকল্পিত হামলার ঘটনায় আমরা সংক্ষুব্ধ। সেই সঙ্গে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র বিনির্মাণের বিপরীতে ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠীর সমাবেশের ওপর হামলা রাষ্ট্র ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করবে।’

বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন সুলতানা কামাল, রামেন্দু মজুমদার, সারওয়ার আলী, রাশেদা কে চৌধূরী, সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, রাণা দাশগুপ্ত, ফওজিয়া মোসলেম, নুর মোহাম্মদ তালুকদার, এস এম এ সবুর, খুশী কবির, এম এম আকাশ, রোবায়েত ফেরদৌস, সৈয়দ আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী, জোবায়দা নাসরিন, পারভেজ হাসেম, কাজল দেবনাথ, আবদুল ওয়াহেদ, সালেহ আহমেদ, আব্দুর রাজ্জাক, জীবনানন্দ জয়ন্ত, এ কে আজাদ, জাহাঙ্গীর আলম সবুজ, অলক দাস গুপ্ত, জহিরুল ইসলাম জহির, দীপায়ন খীসা, রেজাউল কবির ও গৌতম শীল।

জড়িত জাতীয় নাগরিক কমিটির প্রতিনিধি : এনসিটিবির সামনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য রুপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যাসহ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জাতীয় নাগরিক কমিটির ধানম-ি থানা প্রতিনিধি শাহাদাৎ ফরাজী সাকিবের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, ভিডিও ফুটেজ এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির স্যোশাল মিডিয়া কার্যক্রমে তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত