ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) থেকে সরানোর উদ্যোগ নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠাবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। চিঠির খসড়া অনুমোদনের জন্য গতকাল রবিবার কমিশনে উপস্থাপন করা হয়েছে। কমিশনের অনুমোদন পেলে আজ সোমবার চিঠি পাঠানো হবে বলে দুদকের শীর্ষ এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেন।
দুদকের ওই কর্মকর্তা বলেন, বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার পরিচালক হতে তার যোগ্যতার রেকর্ডপত্র জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। সম্মেলনে তিনজনের প্রতিনিধি নেওয়া হলে বাংলাদেশ থেকে ৯০ জনকে নেওয়া হয়েছে। এতে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ হয়েছে। পুতুলের বিরুদ্ধে চারটি গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের কারণে দুদক চায় তার পরিচালক পদের অবসান ঘটিয়ে নতুন করে পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হোক। তার বিরুদ্ধে যে চারটি অভিযোগ তার মধ্যে প্রথমটি হলো পুতুলকে যেন ভোট দেয় সেজন্য শেখ হাসিনা সরকার ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে অসম চুক্তি করেছে। এতে রাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, পুতুলকে অটিস্টিক সেলের সমন্বয়ক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আর তিনি এ পদে থেকে বেতন-ভাতাসহ বিভিন্ন সুবিধা নিয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রকল্প তৈরি করে ৪৫০ কোটি টাকা লোপাট করেছেন। তৃতীয়ত, পুতুলের যে সূচনা ফাউন্ডেশন রয়েছে, সেই ফাউন্ডেশনে জোর করে সদস্য বানানো হয়েছে। কেউ সদস্য হতে না চাইলে তাদের হয়রানি করা হয়েছে। চতুর্থত, পুতুল জালিয়াতির মাধ্যমে প্লট নেওয়ায় দুদক মামলা করেছে।
দুদকের তথ্যমতে, সায়মা ওয়াজেদের ক্ষেত্রে প্রার্থীর যোগ্যতা হিসেবে যেসব অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা উল্লেখ করা হয়েছে, তা শুধুই কাগুজে ও ফরমায়েশি। যোগ্যতা না থাকলেও মেয়ে পুতুলকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে নিয়োগে তার ক্ষমতাকে অনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছিলেন শেখ হাসিনা।
দুদকের কাছে অভিযোগে বলা হয়েছে, পুতুল ‘সূচনা ফাউন্ডেশন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান খুলে বিভিন্ন সামাজিক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান থেকে জোরপূর্বক উপঢৌকনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করেন। তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ওপর অবৈধ প্রভাব বিস্তার করে ফাউন্ডেশনের নামে পাওয়া অর্থ করমুক্ত করিয়ে নেন, যাতে সরকারের বিপুল অর্থের ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য বিভাগের আওতায় অটিস্টিক সেলকে ব্যবহার করে ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে পুতুল রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করে নিজে লাভবান হয়েছেন।
দুদকের তথ্যমতে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা পুতুল এখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা হয়েছে। তার মেয়ে পুতুলের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা হয়েছে, যার মধ্যে দুদক একটি মামলা করেছে ‘তথ্য গোপন ও ক্ষমতার অপব্যবহার’ করে পূর্বাচলে পুতুলের নামে প্লট বরাদ্দের অভিযোগে।
পুতুলের বিষয়ে দুদকের পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল সংস্থাটির মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, প্লট দুর্নীতিতে তার বিরুদ্ধে একটি মামলা করা হয়েছে। ইতিমধ্যে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করবেন।
আক্তার হোসেন বলেন, পুতুলের বিশ্ব স্বাস্থ্য নিয়োগসংক্রান্ত বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে। অনুসন্ধান দল তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। অভিযোগ প্রমাণে যেসব দালিলিক প্রমাণাদি প্রয়োজন সেসব তথ্যের জন্য তারা কার্যক্রম চালাবে। যেসব দপ্তর থেকে তথ্য পাওয়া যাবে, সেসব দপ্তরে তদন্ত দল যোগাযোগ করবে। অভিযোগ প্রমাণে সহায়ক সবার বক্তব্য নেবে।
জানা গেছে, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় ক্ষমতার অপব্যবহার করে মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালক পদে নিয়োগ পাইয়ে দিয়েছেন কি না, তাও খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক।
ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিতে লেখাপড়া করা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল যুক্তরাষ্ট্রে স্কুল সাইকোলজিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন। তার মা শেখ হাসিনা তাকে অটিজম ও নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডারবিষয়ক বাংলাদেশ জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপারসনের দায়িত্ব দেন। পরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ উপদেষ্টা প্যানেলেরও তাকে সদস্য করা হয়। ২০২৩ সালের নভেম্বরে ভারতের নয়া দিল্লিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক কমিটির ৭৬তম অধিবেশনে সংস্থাটির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক নির্বাচিত হন সায়মা ওয়াজেদ। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সেই দায়িত্ব নেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের দপ্তর ভারতের দিল্লিতে। দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে পুতুল সেখানেই আছেন।
