লক্ষ্যমাত্রার ৩৪ শতাংশ পাঠ্যবই ছাপা হয়েছে

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৫, ০৮:০০ এএম

আজ ২০ জানুয়ারির মধ্যে শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছানোর লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলো না জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি)। এ বছর প্রাক-প্রাথমিক থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ৪ কোটি ৩৪ লাখ ৩ হাজার ২৮৩ শিক্ষার্থীর জন্য বই ছাপা হচ্ছে ৪০ কোটি ১৫ লাখ ৬৭ হাজার ২০২ কপি। সেখানে গতকাল রবিবার পর্যন্ত ছাপা হয়েছে ১৪ কোটি বই। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৩৪ শতাংশ বই ছাপা শেষে শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছেছে। বাকি ২৭ কোটির মতো বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে মার্চ মাস পুরোটাই লেগে যাবে। তবে সে মাস শেষেও মোট বইয়ের ১০-২০ শতাংশ পৌঁছানো যাবে না বলে মনে করছেন প্রকাশকরা।

এমন অবস্থায় আগামী ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে সরকার। আগে যেখানে এসব পরীক্ষার্থী দুই বছর সময় পেত নতুন পাঠ্যসূচি অনুযায়ী পরীক্ষার প্রস্তুতিতে, এই শিক্ষাবর্ষে এক বছর আগেও তাদের হাতে বিনামূল্যের বই তুলে দিতে হিমশিম খাচ্ছে এনসিটিবি কর্তৃপক্ষ। তাই এক সপ্তাহ ধরে অন্য বই ছাপা বন্ধ রেখে দশম শ্রেণির বই ছাপছে প্রেসগুলো। আগামী ২২ জানুয়ারির মধ্যে সরকার দশম শ্রেণির সব শিক্ষার্থীর হাতে বই পৌঁছাতে চায়। গতকাল রবিবার পর্যন্ত চাহিদার ৯০ শতাংশ বই পৌঁছে গেছে বলে জানিয়েছেন প্রেস মালিকরা। তবে এর জন্য আরেক দফা পেছাল অন্যান্য শ্রেণির বই ছাপার কাজ।

অবশ্য সরকারের বিনামূল্যে বই ছাপানো ও শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ কে এম রিয়াজুল হাসান। গতকাল তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সার্বিক অগ্রগতি বেড়েছে। মেশিন টু মেশিন মনিটর করা হচ্ছে। প্রকাশকদের যা সমস্যা, যখন যেটা বলছে, সমাধান করা হচ্ছে। যদিও এসব আমাদের করার কথা না। জাতীয় স্বার্থে এসব করতে হচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, এনসিটিবিসহ সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ সহযোগিতা করছে।’

১ সপ্তাহ বন্ধ অন্য শ্রেণির বই ছাপানো : প্রেসের মালিকরা জানিয়েছেন, এক সপ্তাহ ধরে তারা দশম শ্রেণির বই ছাপছেন। বাকি শ্রেণির বই ছাপার কাজ বন্ধ রয়েছে। এনসিটিবি কর্তৃপক্ষ মৌখিকভাবে নির্দেশ দিয়েছে আগামী ২২ জানুয়ারির মধ্যে দশম শ্রেণির বইগুলো দিয়ে দিতে হবে। কারণ দশম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের এক বছর পর চূড়ান্ত পরীক্ষা। এখন যদি তারা তিন মাস পর বই পায়, তাহলে তাদের আরও তিন মাস চলে যাবে। আগে তারা দুই বছর পড়ে কোর্স কমপ্লিট করত। এবার এক বছর পড়ে কমপ্লিট করতে হবে। এখন এটার জন্য অগ্রাধিকার দিয়ে বলা হয়েছে আগে দশম শ্রেণির বই দিতে। ফলে মুদ্রণ শিল্প সমিতি এখন দশম শ্রেণির বই ছাপানোয় সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে এবং ভালো অগ্রগতি হয়েছে। তারা আশা করছে, ২২ জানুয়ারির মধ্যে দশম শ্রেণির ৯০ শতাংশ বই চলে যাবে। এর ফলে পিছিয়ে গেল চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম শ্রেণির বই ছাপানো। এগুলোর কাজ বন্ধ।

এ ব্যাপারে এনসিটিবি চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, অন্য শ্রেণির বই ছাপানো বন্ধ নেই। প্রাথমিকের চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির বইগুলোর মধ্যে বাংলা ইংরেজি ও গণিত ছাপানো হয়েছে। এই দুই শ্রেণির বাকি যে বই, সেগুলো বাকি যে পাঁচ-ছয়টা মেশিন আছে, সেখানে যেন একটা মেশিনে বইগুলো ছাপানো হয়, সেটা বলা হয়েছে। বাকিগুলোতে দশম শ্রেণির বই ছাপাতে বলেছি। সে কারণে অন্য শ্রেণির বইগুলো একটু ধীরগতিতে ছাপানো হচ্ছে। দশম শ্রেণির বইগুলো ছাপাতে গুরুত্ব দিচ্ছি। কারণ এই শ্রেণির বইগুলো আগে দরকার। তারা ২০২৬ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেবে। সেজন্য দশম শ্রেণির বই ছাপানো শেষ হয়ে গেলে আমরা পূর্ণদ্যমে প্রাথমিকের এবং ষষ্ঠ-নবম শ্রেণির বইগুলো ছাপাব।

ছাপানো হয়েছে ১৪ কোটি : মুদ্রণ শিল্প সমিতির তথ্য অনুযায়ী, এ বছর বই ছাপা হবে ৪১ কোটি। এখন পর্যন্ত ছাপা হয়ে ও বই চলে গেছে ১৪ কোটির মতো। এখনো বাকি ২৭ কোটির মতো। এসব বইয়ের মধ্যে প্রাথমিকের বইগুলোর ফর্মা ছোট। পৃষ্ঠা সংখ্যা কম। মাধ্যমিকের বই বড় ও পৃষ্ঠা বেশি। প্রথম শ্রেণির ইংরেজি বই চার ফর্মা। আর মাধ্যমিকের পদার্থবিদ্যার বই ৪৫ ফর্মা, ১১ গুণ বড়। এটার জন্য কাগজ, ছাপা ও বাঁধাইয়ের সময় বেশি লাগবে। একটা দিক ভালো দশম শ্রেণির বড় বইগুলো চলে যাচ্ছে। কিন্তু সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বইগুলোও বড়। এখন প্রতিদিন ছাপা বই ডেলিভারি হচ্ছে ২০-৩০ লাখ। তা হলে বাকি ২৬ কোটি বই ছাপা শেষে যেতে কমপক্ষে তিন মাস লাগবে। এই সময় দিতেই হবে।

সে ক্ষেত্রে কবে নাগাদ সব শিক্ষার্থীর হাতে বই পৌঁছানো সম্ভব হবে, জানতে চাইলে মুদ্রণ শিল্প সমিতির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মার্চের আগে সম্পূর্ণ বই দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। মার্চ মাস পুরোটা লেগে যাবে। তাও সংশয় আছে যে, মার্চের মধ্যে ১০-২০ শতাংশ বই থেকে যেতে পারে। সেটি এপ্রিল নাগাদ শেষ হবে।’

এ ব্যাপারে এনসিটিবি চেয়ারম্যান বলেন, ‘বই ছাপা হওয়া ও বই পিডিএফ হয়ে ট্রাকে চলে যাওয়া এ দুটির মধ্যে পার্থক্য আছে। এই মুহূর্তে ৩-৪ কোটি বই ছাপা হয়ে আছে। সেগুলো বাঁধাই হয়ে পিডিএফের জন্য অপেক্ষা করছে। এগুলো বাদ দিলে এখন পর্যন্ত ১২-১৩ কোটি বই ছাপা হয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে চলে গেছে। আর যদি এগুলো ধরি, তা হলে ১৫ কোটির বেশি বই ছাপা হয়েছে।,

লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাল ৩৫% : এনসিটিবির লক্ষ্যমাত্রা ছিল আজ ২০ জানুয়ারির মধ্যে সব শিক্ষার্থীর হাতে বই পৌঁছানো। কিন্তু তাদের সে লক্ষ্যকে ‘অনভিজ্ঞতা’ বলে দাবি করেন মুদ্রণ শিল্প মালিক সমিতির নেতা ও সাধারণ প্রেস মালিকরা। তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, এনসিটিবি বলেছিল ২০ জানুয়ারির মধ্যে সবার হাতে বই পৌঁছে দেবে। এটি হাস্যকর। এনসিটিবি আমাদের লোকজনের থেকে টাকা নিয়েছিল আর্ট কার্ড কেনার জন্য। এই আর্ট কার্ড দেবে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এই আর্ট কার্ড না হলে বইয়ের কাভার ছাপা হবে না। আর সেটি যদি দেওয়া হয়, ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত, তা হলে এনসিটিবি কীভাবে ২০ জানুয়ারির মধ্যে সবাইকে বই দেবে?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রেস মালিক বলেন, ‘এনসিটিবি চেয়ারম্যান ২ হাজার টন কাগজ আমাদের আমদানি করে দিচ্ছেন। আমরা সবাই টাকা জমা দিয়েছি। এই কাগজ আসবে ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে। তা হলে কীভাবে উনি ২০ জানুয়ারির মধ্যে বই দেবেন?’

এ বছর বই ছাপানোর দেরির কারণ উল্লেখ করে প্রেস মালিকরা জানান, এনসিটিবি ১৯ ডিসেম্বর নবম শ্রেণির বই ছাপার ওয়ার্ক অর্ডার দিয়েছে। সে অনুযায়ী ২৮ দিন বৈধ সময় আছে ওয়ার্ক অর্ডার অনুযায়ী বই ছাপার কাজ শুরু করার। এরপর বৈধভাবে ৪০ দিন সময় দেওয়া আছে বই ছাপার জন্য। এরপর আরও ৪০ দিন সময় আছে মোট বইয়ের এক চতুর্থাংশ চূড়ান্তভাবে ছাপিয়ে দেওয়ার। ততদিন পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ ওয়ার্ক অর্ডার বাতিল করতে পারবে না। সে অনুযায়ী সাড়ে তিন মাস, অর্থাৎ মার্চের শেষ পর্যন্ত বই ছাপিয়ে দেওয়ার বৈধ সময় আছে। সেখানে উনি (এনসিটিবি চেয়ারম্যান) কীভাবে ২০ জানুয়ারির মধ্যে সবার হাতে বই পৌঁছাতে চান? এটা হলো তাদের অনভিজ্ঞতার ফসল। এই অনভিজ্ঞতা বই ছাপাতে দেরি করেছে।’

দেরির কারণ দেরিতে কাজ শুরু : এক প্রেস মালিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ বছর ইসলাম, অঙ্ক, বিজ্ঞান, রসায়ন, পদার্থ, জীববিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান, বাণিজ্য, বৌদ্ধ খ্রিস্টান ইসলাম এসব বইয়ে কোনো সংশোধন বা পরিবর্তন নেই। সেগুলো আগে ছাপলে কোনো সমস্যা হতো না। তারা এসব পরামর্শ শোনেননি।

আরেক প্রেস মালিক বলেন, আরও কিছু কাগজের জন্য এনসিটিবি প্রকাশকদের থেকে টাকা নিয়েছে। সেই কাগজ আসতে ফেব্রুয়ারি লাগবে। আমি যদি কাগজই ফেব্রুয়ারিতে পাই, সেগুলো দিয়ে বই ছাপব, বাঁধাই করব, কাটিং করব, স্টাফ রেডি করে উপজেলায় পাঠাব। দ্বিতীয়ত হলো, ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনেক প্রতিষ্ঠানে বৈধভাবে ওয়ার্ক অর্ডারের সময় আছে। তারপরও আমরা জাতীয় স্বার্থে চেষ্টা করছি, আমরা যত দ্রুত বই ছাপানো যায়।

তবে দেরির মূল কারণ দেরিতে কাজ শুরু বলে জানান মুদ্রণ শিল্প সমিতির এক নেতা। তিনি বলেন, এবার দেরির কারণ হলো আগে জুলাই-আগস্ট থেকে কাজ শুরু করতাম। একটা কাগজের মিলের উৎপাদন ক্ষমতা ১০০-৪০০ টন পর্যন্ত। তারা আমাদের ভাগ করে কাগজ দিত। আগস্ট-ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাস কাগজ দিত। এখন কাজই শুরু হয়েছে নভেম্বরের শেষে। মিলের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়েনি। যে কাগজ উৎপাদন হচ্ছে, সেটা ভাগ করে দিচ্ছে। ভাগে পরিমাণে কম পাচ্ছি, কম ছাপাচ্ছি। আগে প্রথমে প্রাইমারি, পরে সেকেন্ডারি, এভাবে বই ছাপতাম। সময় পেতাম প্রচুর।

এই প্রেস মালিক উদাহরণ দিয়ে বলেন, আমার প্রেসে প্রতিদিন যদি চার ট্রাক বা ৫০ টন কাগজ দেয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবে কাজ করা যায়। এখন আমি পাই ১-২ ট্রাক কাগজ। সর্বোচ্চ তিন ট্রাক পর্যন্ত পেয়েছি। অথচ আমার পাঁচটি কাগজ মিলে সাড়ে ১৯ কোটি টাকা দেওয়া আছে।

কিন্তু এনসিটিবি চেয়ারম্যান বলেন, প্রকাশকরা যে সক্ষমতা দেখিয়ে কাজ নিয়েছিলেন, তার মাত্র এক পঞ্চমাংশ সক্ষমতা তাদের রয়েছে। ১১৬টি প্রিন্টার ১ কোটি ৪২ লাখ বই প্রিন্ট করার কথা প্রতিদিন। সেখানে তারা সর্বোচ্চ ৪৮ লাখ ৪৮ হাজার বই প্রতিদিন ছাপছেন। সুতরাং তাদের ডেকে গত বৃহস্পতিবার প্রকৃত সক্ষমতার কথা বললাম। তার মানে তারা সক্ষমতার অতিরিক্ত কাজ নিয়েছেন। এখন অতিরিক্ত কাজ যেটা তারা নিয়েছেন, সেটা অন্য প্রেস থেকে ছাপিয়ে দিতে বলেছি। আর যদি তারা নিজেরা এটা করতে না পারে, তা হলে বলুক কোন প্রেস কাজ পায়নি বা কারা ছাপতে সক্ষম, আমরা তাদের দিয়ে ছাপাব। এখন এই কাজগুলো চলছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত