গায়েবি মামলার খড়্গ

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২৫, ০১:৪৯ এএম

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কোন ধরনের, সে বিষয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। আওয়ামী লীগ শাসনামলে, সাইবার আইনে হাজার হাজার মিথ্যা মামলা হয়েছে যা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও গায়েবি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে  ঘটনা সাজিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলা করা হয়েছে।  প্রতিপক্ষকে দমন অথবা ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে এসব মামলা হয়েছে। ফলে সুগম হয়েছে পুলিশের হয়রানি ও উৎকোচ আদায়ের পথ। কারণ তদন্ত পর্যায়ে সন্দেহজনক হিসেবে ওই মামলায় যে কাউকে আটক করতে পারে পুলিশ। মিথ্যা বা গায়েবি মামলার আইনগত প্রতিকারের বিধান সাধারণভাবে যেমন দণ্ডবিধিতে আছে আবার বিশেষ কিছু আইনে আলাদাভাবে প্রটেকশন ক্লজও রয়েছে। কিন্তু মামলা হয়ে গেলে হয়রানি থেকে মুক্তি নেই। কারণ যিনি এর শিকার তাকে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে, মামলাটি মিথ্যা অথবা তাকে মিথ্যা আসামি করা হয়েছে। মামলাজটের কারণে দীর্ঘদিন মিথ্যা আসামিদের অপচয় হয়েছে সময় এবং অর্থ। আর সামাজিক সম্মানের কথা না বলাই ভালো। আশার কথা,  অন্তর্র্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেছেন, ‘সাইবার নিরাপত্তা আইনে স্পিচ অফেন্স (মুক্তমত প্রকাশে মামলা) সম্পর্কিত মামলা দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রত্যাহার করা হবে। আশা করছি, ফেব্রুয়ারির মধ্যে সব গায়েবি মামলা প্রত্যাহারের কাজ সম্পন্ন করতে পারব।’ তিনি আরও জানাচ্ছেন ‘বিগত সরকারের আমলে করা ৩২২টি স্পিচ অফেন্স সম্পর্কিত মামলার বিচার চলছে। এগুলো প্রত্যাহার করার বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা রাখার অবকাশ আছে। এসব মামলার মধ্যে সরকারি কৌঁসুলির মাধ্যমে ইতিমধ্যে ১১৩টি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে।’  এ বিষয়ে বুধবার দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। জানা যাচ্ছে, ২৫ জেলায় আড়াই হাজারের বেশি মামলাকে গায়েবি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই হিসাবে তাহলে দেশের সমস্ত জেলা, উপজেলাকে হিসাবে নিয়ে এলে মামলার সংখ্যা কত হতে পারে?   

গায়েবি মামলার সঙ্গে শুধু বাদী নয়, পুলিশ এবং এক শ্রেণির আইনজীবীও জড়িত থাকেন।  যেসব মামলা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য করা হয়, তার পেছনে থাকেন স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা। আর অজ্ঞাতপরিচয় আসামি মামলায়  দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য, সাধারণ মানুষকে হয়রানি করে অর্থ আদায়। ২০১৮ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন, সাবেক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ও বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক সানাউল্লাহ মিয়া হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট করেন। তখন আবেদনে বলা হয়েছিল, ২০১৮ সালের ১ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন থানায় বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক  নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৩ হাজার ৭৩৬টি গায়েবি মামলা করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছিল ৩ লাখ ১৩ হাজার ১৩০ জনকে। আর অজ্ঞাতনামা আসামি ছিলেন কয়েক হাজার। ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় গায়েবি মামলার তুলনায় ২০১৪ সালে এসব মামলা বেশি হয়েছে এবং ২০১৮ সালে মামলার সংখ্যা আরও  বেড়েছে। এসব মামলা মোকাবিলা করতে গিয়ে রাষ্ট্রের সময় নষ্ট হয়, কোর্টের সময় নষ্ট হয়,  উকিল নিয়োগ করতে হয়। এর ফলে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। শারীরিক, মানসিক, আর্থিক ও সামাজিকভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন ব্যক্তি। কারণ এসব গায়েবি মামলার ফলে সামাজিক ভারসাম্য, নৈতিকতা নষ্ট হয়। বাস্তবে মিথ্যা মামলাকারীর বিরুদ্ধে মামলা ও প্রতিকার পাওয়ার নজির বিরল। যদিও আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ দেখা যায় না। আবার এ থেকে প্রতিকার পাওয়া দীর্ঘ সময়ের প্রক্রিয়ার ব্যাপার।

যদি মিথ্যা ও গায়েবি মামলার খড়্গ থেকে আমরা বের না হতে পারি, তাহলে সুস্থ রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্ধকার। একই সঙ্গে  অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান থাকবে এসব মামলা শুধু চিহ্নিত নয়, উদ্দেশ্যপূর্ণ হওয়ার কারণে বিবাদী যেহেতু যথেষ্ট ভোগান্তির মধ্যে ছিলেন, ফলে বাদীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হোক। একই সঙ্গে যুগোপযোগী করা হোক সাইবার আইন। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত