সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী। সম্প্রতি নির্বাচনে জিতে যুক্তরাষ্ট্রে নাটকীয়ভাবে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার এই প্রত্যাবর্তন বিশ্বব্যাপী নানান আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পাশাপাশি আলোচনায় উঠে আসছে অন্তর্বর্তী সরকারের কূটনৈতিক সক্ষমতা এবং পরিবর্তিত ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রে চীন ও ভারত প্রসঙ্গ। এসব বিষয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন সাবেক এই কূটনীতিক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী
দেশ রূপান্তর : প্রথমে দেশের সূত্র ধরেই আলাপ শুরু করি। সদ্য শুরু হওয়া ট্রাম্প জমানায় কি দিল্লির চোখে ঢাকাকে দেখবে ওয়াশিংটন? মোদি ও ট্রাম্পের সম্পর্কটাও যদি বিবেচনায় নেন...
সাকিব আলী : এটাই তো সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আমাদের জন্য, তাই না? ২০১৮ সালে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তখনকার ডেপুটি সেক্রেটারি অব স্টেট এসেছিলেন কয়েক দিনের সফরে। উনি এসে বলেছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের চোখ দিয়ে বাংলাদেশকে আর দেখবে না। একদম স্পষ্ট করেই বলছি এবং সেই সময়ে কিন্তু স্টেট ডিপার্টমেন্টকে রি-অর্গানাইজেশন করা হয়। বাংলাদেশকে ইন্ডিয়া থেকে আলাদা ডিপার্টমেন্টে দিয়ে দেওয়া হয় সেটা তিনি এখানে এসে বলে যান। বাট এনিওয়ে আমরা জানি যে, অনেক ভারতীয় বংশোদ্ভূত সদস্য মার্কিন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে থাকতে পারে, স্টেট ডিপার্টমেন্টে যদিও এখন পর্যন্ত কাউকে ওপরের দিকে দেখছি না। সেক্রেটারি অব স্টেট মার্কো রুবিও ছাড়া আর কারোর নাম আমরা এখনো জানি না। কিন্তু ভারতীয় মিডিয়া অপপ্রচার করে যাচ্ছে যে, ট্রাম্প এসেই একদম ভারতের পক্ষেই সব করে দেবে। আমার কাছে মনে হয়, এটাতে একধরনের ভারতের যে নিজস্ব একটা দুর্বলতা আছে, সেটা প্রকাশ পাচ্ছে। এটা বোধহয় ভারতীয়রা বুঝবে আশা করি। ব্যাপারটা এমন আপনি অন্য মোড়লের খোঁজ করছেন। তবে, আমি মনে করি না যে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ইচ্ছে অনুযায়ী সব করবে। আমি শুনেছি নরেন্দ্র মোদি তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করকে পাঠিয়েছিলেন, উনি যাতে শপথ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পান। কিন্তু ৮ দিন বসিয়ে রাখা হয়েছিল জয়শঙ্করকে এবং উনি তো আমন্ত্রণ পাননি। সেই হিসেবে বলতে চাই, যতটা ভারত মনে করছে যে ট্রাম্প এসেই সব করবেন, আমি সেটা মনে করি না। তবে বাংলাদেশ সরকারের নতুন ট্রাম্প সরকারের সঙ্গে প্রো-অ্যাক্টিভ কাজ করা দরকার।
দেশ রূপান্তর : আমরা জানি চীন-ভারতের একটা বৈরিতা আছে। কিন্তু ট্রাম্পের বিশ্বব্যবস্থা মোকাবিলায় চীন-ভারত কি কাছাকাছি চলে আসতে পারে? বাণিজ্য যুদ্ধ কি শুরু হবে?
সাকিব আলী : আসলে চীনের সাহায্য ছাড়া ভারতের পক্ষে এখন সত্যিকার অর্থে এখন অর্থনৈতিক ওই রকমভাবে উন্নয়ন করাও সম্ভব না। তাদের জন্য তাদের এই সাপোর্টটা লাগবে। উল্টোদিকে যদি দেখি, ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর কর বসিয়ে দিচ্ছেন, চায়নার ওপরেও বসাচ্ছেন, কানাডার ওপরেও বসাচ্ছেন, মেক্সিকোর ওপরেও বসাচ্ছেন। তাহলে সবাই কি একটু এক হয়ে যাবে না! তারা তো ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অন্তত এক হবে। সুতরাং ওটা একটা চান্স থেকেই যায়। তবে ট্রাম্প আগেও যেটা বলেছেন এত এত কর বসাবেন এগুলো আমার মনে হয় মুখের কথা, উনি বেশি বলেন। আমার মনে হয় না উনি যতটা বলছেন, ততটা করবেন। আর যদি ট্রেড ওয়ার শুরুই করেন, তাহলে আমেরিকার ভোক্তাদের জন্য জিনিসপত্রের দাম অনেক বেশি বেড়ে যাবে, যদি আপনি ট্যারিফ দেন। এইটা ওখানকার ভোক্তারা নেবেন বলে আমি মনে করি না। ট্রাম্প আবার নিজের পপুলারিটির ব্যাপারে খুবই সচেতন। তিনি টার্গেটেড কিছু করতে পারেন কিন্তু বেসিকভাবে ট্রেডওয়ার করবেন বলে আমি মনে করি না।
দেশ রূপান্তর : এটার তো প্রভাব অলরেডি আমরা দেখছি। শুল্ক বসানোর কথার পরপরই কানাডার শেয়ারবাজারে একটা প্রভাব পড়েছে।
সাকিব আলী : আপনি যেটা বলছেন শেয়ার মার্কেটের কথা, শেয়ার মার্কেট তো পড়বে, উঠবে এগুলো তো হবেই। বিষয়টা হচ্ছে, আপনি কন্সিস্টেন্টলি যদি একটা জিনিস করতে থাকেন। মানে ট্যারিফ স্ট্র্যাটেজি কতদিন রাখবেন সেগুলো হলো বড় ব্যাপার। কন্সিস্টেন্টের কোনো স্ট্রাকচারাল চেঞ্জ হবে কি না সেগুলোও বিষয়।
দেশ রূপান্তর : ট্রাম্প আমদানি পণ্যের ওপর শুল্ক বসিয়ে দিলে চীনও তো বসিয়ে দেবে।
সাকিব আলী : চীন তো অলরেডি অনেকবার এগুলো করেছে। আপনি যেটা বলেছেন হ্যাঁ, সেটা পড়বে। মনে আছে আপনার, চীনের স্টিলের ওপর চাপিয়ে দিল ওরা। তখন ওদের কর্নের ওপরে কর চাপিয়ে দিল এরা এগুলো অনেক কিছু করেছে। সো দে উইল ডু ইট ডেফিনেটলি, এটা তো হয়ই। সো ইউ নো, ওগুলো তো চলছে। ওদের ডিফেন্স প্রতিযোগিতা ভীষণভাবে চলছে এবং তাইওয়ান নিয়ে যে ক্লাশ পয়েন্ট আছে সেটা যে কোনো সময় কিছু হতে পারে। কারণ যত দিন যাবে তত চাইনিজ গ্যাপটা বাড়তে থাকবে, চাইনিজদেরটা অনেক বেশি বেশি বাড়তে থাকবে। কারণ চায়না অনেক বেশি ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোডাকশনে আছে, যেটা আমেরিকার থেকে অনেক বেশি। সো, ওরা জাহাজ হয়তো একটা বানাচ্ছে এরা তখন হয়তো ২০টা বানাবে। চায়না যেভাবে আমেরিকাকে টেকনোক্যালি, ফাইনান্সিয়ালি, ইন্ডাস্ট্রিয়ালি ফেইস করছে এ রকম তো কেউ কোনোদিন করেনি।
দেশ রূপান্তর : আমি শুনেছি আমেরিকার ম্যাক্সিমাম ব্যাংকের মালিকানা চীনের হাতে, তাছাড়া চীনের হাতে প্রচুর ডলারও রিজার্ভ আছে।
সাকিব আলী : হ্যাঁ, তার কাছে ডলার রিজার্ভ আছে। তাবে ব্যাংকের যে মালিকানার কথা বলছেন, সেটা তেমন না। দেখেন, আমেরিকার যে মজাটা আপনি আমেরিকার চেয়ে বেশি বিক্রি করছেন ওর কাছে ওয়ান ট্রিলিয়ন ডলার আছে কানাডাতে, তো চায়না এই ওয়ান ট্রিলিয়ন ডলারটা দিয়ে করবেটা কী আলটিমেটলি? ওকে আবার ওই আমেরিকাকেই ইনভাইট করতে হবে। যখন ও আমেরিকাকে ইনভেস্ট করতে যাবে তখন আমেরিকা বলবে, ‘নো নো, তুমি এটা কিনতে পারবা না।’ যেমন ধরেন ও যদি গিয়ে বলে আচ্ছা, আমি বাল্টিমোর পোর্টটা কিনতে চাই। আমেরিকা বলবে, না তুমি কিনতে পারবা না। আবার যদি বলে আমি ওই স্টেটে জমি কিনতে চাই, বলবে আচ্ছা ওটা কেন। একচুয়েলি, ওদের কাছে টাকা আছে কিন্তু আসল জিনিসের মালিকানা নেই। দিস ইস আ ব্যাড প্রবলেম। এ জন্যই তো তারা ডলার ডমিনেশন থেকে বেরিয়ে আসতে চায়।
দেশ রূপান্তর : মিয়ানমারে একটা ক্রাইসিস চলছে, রোহিঙ্গাসহ দেশটির সঙ্গে নিরাপত্তার মতো আমাদের নানা ইস্যু আছে। বাইডেনের সময়ে বার্মা অ্যাক্ট নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছিল, তো ট্রাম্প প্রশাসন কি আসলে তার পলিসি একই রকম রাখবে?
সাকিব আলী : আমি যা বুঝি, ট্রাম্পের ডিপার্টমেন্ট অব স্টেট মার্কো রুবিও অনেক বেশি বেশি অ্যান্টি চায়না। তো উনার যারা লিডার হবেন তারা যদিও তার যে ডিফেন্স সেক্রেটারি সেও যদি খুব অ্যান্টি চায়না হয় এবং পেন্টাগন তার নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য কিন্তু হকিস পলিসি চায়। কিন্তু, বার্মা অ্যাক্টে তো বলা আছে যে, তারা কোনো মিলিটারি এইড দিতে পারবে না, তাই না? একচুয়েলি আমেরিকা অলমোস্ট সাইডলাইন ইন মিয়ানমার। মিয়ানমারে জান্তাবিরোধী যারা আছে আরাকান আর্মি বা অন্যরা, তাদের সঙ্গে সেইরকম কোনো মার্কিন সম্পর্ক কিন্তু আমরা দেখতে পারছি না। ওই দিক দিয়ে ট্রাম্প এখানে আমেরিকান মিলিটারি সুপারভিশন বা মিলিটারি মনিটরিং বাড়াতে পারে বলে মনে করি। কারণ, চীনের তুলনায় মিয়ানমারে আমেরিকার অবস্থা খুবই উইক। আমি এখানে বাংলাদেশের পয়েন্ট অব ভিউ থেকে এই জিনিসটা দেখব। বাংলাদেশের এখানে রোহিঙ্গা পপুলেশন আছে তাদের রিটার্ন করতে হবে। তাদের অর্গানাইজ হতে দেওয়া উচিত ছিল। শেখ হাসিনা ভারতীয় আনুগত্যের কারণে এটা করা হয়নি। আরাকান আর্মির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত ক্লোজ হওয়া উচিত এবং আমাদের তরফ থেকে তাদের হেল্প করা উচিত। যদি সরকারিভাবে না পারি তবে ভিন্নভাবে সেটা করা সম্ভব। পাশাপাশি, আমাদের যেটুকু অবস্থান নেওয়া উচিত, সামরিক-বেসামরিক সেগুলো নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি।
দেশ রূপান্তর : আপনি জানেন, যুদ্ধবিরতিতে পুতিন আলোচনায় বসতে রাজি না হলে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎটা ট্রাম্প জামানায় কী রকম হতে পারে?
সাকিব আলী : আমি তো মনে করি যে, ইউক্রেন যুদ্ধ ট্রাম্প জামানায় এসে আর টিকবে না, এটা সম্ভব না। সাধারণত ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে অন্যান্য যুদ্ধে জড়ান না। গতবারও করেননি। আমরা ধরে নেব যে বাইডেন যে ইউক্রেনকে ৫০ বিলিয়ন দিয়েছেন, সেটা দিতে ট্রাম্প রাজি হবেন না। তার যারা প্রতিরক্ষামন্ত্রী তারাও রাজি হবেন না। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সাহায্য ছাড়া তো জেলেনস্কি থাকতে পারবেন না। হ্যাঁ, হয়তো প্রথমে একটু সময় লাগবে, কিন্তু আমার মনে হয় এই যুদ্ধ থামতেই হবে।
দেশ রূপান্তর : সম্প্রতি গাজার যুদ্ধবিরতি নিয়ে যে চুক্তি হয়েছে সেটা নিয়ে ট্রাম্প আশাবাদী না বলে মন্তব্য করেছেন। আপনি কি আশাবাদী? এ ব্যাপারে ট্রাম্পের মন্তব্য ধরে যদি বলেন যে তিনি হঠাৎ কেন এ রকম বললেন।
সাকিব আলী : আমি আসলে জানি না তিনি আশাবাদী না কেন। তবে আমি আশাবাদী না একটা কারণে, নেতানিয়াহু যতক্ষণ পাওয়ারে আছেন ততক্ষণ এটা নিয়ে আশাবাদী হতে পারছি না, বুঝেছেন। আসলে ইসরায়েল চরম খারাপ অবস্থায় এবং নেতানিয়াহু হচ্ছেন আসল প্রবলেম। ট্রাম্পের এখন পর্যন্ত অ্যাকশনগুলোতে মনে হচ্ছে যে, তিনি প্রো-ইসরায়েল হলেও প্রো-নেতানিয়াহু না।
দেশ রূপান্তর : ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে ক্যাপিটল হিলে হামলায় দোষী সাব্যস্ত প্রায় দেড় হাজার জনকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত ট্রাম্পের মনোনীত যে প্রতিরক্ষামন্ত্রী তার বিরুদ্ধে স্ত্রীকে নির্যাতনের অভিযোগ আছে। আবার ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে তো আপনিই বললেন প্রো-ইসরায়েল। প্রশ্ন হচ্ছে, ট্রাম্প জামানায় আমেরিকা আরও বিভক্ত হয়ে পড়বে কি না? উনি তো তৃতীয় লিঙ্গও বাতিল করেছেন।
সাকিব আলী : হ্যাঁ, অবশ্যই করবেন। কারণ আমেরিকায় সাদারা মনে করে এটা শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টান রাষ্ট্র। এটা কিন্তু একটা বিরাট সংখ্যক লোক মনে করে। এবং তারাই আসলে নির্বাচিত হয়েছে। যারা সামনে আসবে এখন তারা এই জিনিসটাকে খুব জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইবেন। ফলে যারা অশ্বেতাঙ্গ তাদের ওপর আক্রমণ বাড়বে। সুতরাং বিভক্তি অনেক বাড়বে এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই এবং উনি বিভক্তি খুব পছন্দ করেন, উনি বিভক্তির মাধ্যমেই শাসন করেন। কিছু মানুষ আছেন না, বিভক্তির ওপরে দেশ শাসন করেন? যেমন শেখ হাসিনা ছিলেন, আবার মোদির কথাও যদি বলি। মানে আস ভার্সেস দেম, মানে তাদের এটা লাগবেই আরকি। ডোনাল্ড ট্রাম্পও একদম তাই। তারা সবাই বিভক্তি পছন্দ করেন।
দেশ রূপান্তর : বলা হচ্ছে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসায় যুক্তরাষ্ট্রের ১৯ শতকে যে সম্প্রসারণবাদী নীতি ছিল সেটা ফিরে আসছে। যেমন পানামা খালের নিয়ন্ত্রণ, মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তন করা, কানাডাকে আমেরিকার অংশ দাবি করা। এই বিষয়গুলো শুধু বাণিজ্যযুদ্ধ দিয়ে হাসিল হবে নাকি ফ্রন্টলাইনও খুলতে হবে। আপনি তো বললেন ট্রাম্প ফ্রন্টলাইনে আগ্রহী না।
সাকিব আলী : ট্রাম্পকে যতদিন ধরে জানি, তিনি কখনো একটা ওয়ারফ্রন্ট খোলার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেননি। নাম্বার টু হচ্ছে, তিনি গ্রিনল্যান্ড কিনে বা নিয়ে নেওয়ার কথা যেটা বলছেন বা পানামা ক্যানেল সেগুলো তার দেশের কাছে, পানামা ক্যানেল তাদেরই ছিল একসময়। কিন্তু জিনিসগুলো ন্যাশনালিস্ট যে ক্রাউড তাদের জন্য খুব উদ্দীপনা জোগায়। তবে কৌশলগতভাবে কিন্তু এগুলো আমি মনে করি না যে অত বড় কিছু। আর কানাডাকে ওদের অংশ করে ফেলা কোনোদিনও হবে না। এটার প্রশ্নই আসে না। কানাডিয়ানরা কখনই রাজি হবে না, আমেরিকানরাও চাইবে না। এটা একটা সস্তা বুলি।
দেশ রূপান্তর : এসব সস্তা বুলি বা জাতীয়তাবাদ উসকে দিলেও এটা তো এখন একটা প্রবণতা হয়ে উঠছে। যেমন পুতিনের সম্প্রসারণবাদিতা, তারপর ভারতের একরকম সম্প্রসারণবাদ আছে। আমাদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের তরুণ নেতৃত্বের মুখেও আমরা একরকম সম্প্রসারণবাদের আলাপ শুনছি।
সাকিব আলী : ট্রাম্প কী করছেন, উক্তি করছেন। পুতিন কিন্তু এত বেশি উক্তি করেন না, তিনি করে দেখান। এটা মোদিরও আছে, ট্রাম্পেরও আছে। আপনি প্রচার করছেন। প্রচার করে করে আপনি পয়েন্ট স্কোর করছেন। এটা কিন্তু আমাদের পাশের দেশের গোদি মিডিয়া করছে। আর আপনি কী করছেন? ঘটনা হচ্ছে আপনি যে এখানে বীরত্ব দেখাচ্ছেন সেটা কি আলটিমেটলি আপনি দেখাতে পারবেন? এই কাজগুলো করে কি আলমেটলি আপনার অবস্থার উন্নয়ন ঘটবে? অন্যদিকে আপনার যে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী তিনি কিন্তু দিনের পর দিন কাজ করে যাচ্ছেন। এই ৪ বছর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে চায়না দেখে গেছেন আজ কিন্তু সেই চায়না নেই। সেইক্ষেত্রে আমি বলব, ইউরোপের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কের যে অবস্থা, তাতে আমেরিকা আইসোলেশনের ভেতর যাচ্ছে যদি ইউরোপের দিক থেকে ভাবেন। ফলে, আমেরিকা যে এখন সম্প্রসারণবাদের দিকে ঝুঁকবে সে রকম কিছু তো দেখছি না।
দেশ রূপান্তর : সারা বিশ্বের নেতৃত্বের মধ্যে এ রকম সম্প্রসারণবাদের প্রবণতা তৈরি হয়েছে কি না। এটা তো ক্ষমতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। যেমন ট্রাম্প বা মোদি একটা কথা বলেন তিনি যে রকম টিকে থাকতে পারেন, ওটার পক্ষে ন্যারেটিভ দাঁড় করাতে পারেন। কিন্তু আমাদের তরুণ নেতৃত্বকে পোস্টটি সরিয়ে ফেলতে হলো।
সাকিব আলী : এখানে যারা সরকারে আছেন বা নেতৃত্বে আছেন বা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে তারা আসলে গণ-অভ্যুত্থান থেকে তার নেতৃত্ব দিয়ে ফেলেছেন এবং সেটাই স্বাভাবিক ছিল এবং অসাধারণ ছিল। সেটা ঠিক আছে। কিন্তু সরকার চালানো কী জিনিস, সরকার কী জিনিস, কীভাবে একটা স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে হয় সেগুলো সম্পর্কে তাদের ধারণা নেই বললেই চলে, এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু আমি মনে করি, তাদের বয়স বিবেচনায় নিতে হবে। ক্ষমতা পেয়ে তারা অনেকেই মনে করেছেন কথা বললেই অন্য জিনিসগুলোও করে ফেলতে পারব। তারা কয়েকজন ছাত্রকে নিয়ে বিচারপতিদের সরিয়ে দিয়েছিলেন। তারা মব জাস্টিস করে অনেক কিছু করতে পারছিলেন। কিন্তু এখন এগুলো সম্ভব না। তাদের এই যে অপরিক্বতা, এটা স্বাভাবিক জিনিস। কিন্তু ওখানে মোদি যেটা করছেন, অখ- ভারতের ম্যাপ দেখাচ্ছেন, সেটা আরেক জিনিস। মাহফুজ আলমের এটা আর মোদির ওটাকে এক বলতে পারব না। যদি সত্যি সত্যি ওরা মনে করেন যে বাংলাদেশকে এত বড় করব, এই করব, সেই করব আমি সেটার সাপোর্টার না। আমার কাছে বাংলাদেশের জনগণের বিষয় সবচেয়ে বড় কথা। গরিব মানুষ খেতে পারছে না, আমার কাছে তাদের খাওয়া, তাদের বাচ্চাদের শিক্ষা, তাদের চিকিৎসা এটাই সবচেয়ে বড় কথা। ওসবের দিকে ভাবতে চাই না।
দেশ রূপান্তর : ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানে ইলন মাস্ক, জাকারবার্গ, জেফ বেজোসসহ বড় বড় টেক জায়ান্টদের উপস্থিতি দেখলাম।
সাকিব আলী : এটা হচ্ছে অলিগার্কি। এরা তো অন্য লেভেলের। এরা এখন আমেরিকার পুরো নীতি কন্ট্রোল করবে। আমেরিকা সবকিছু করবে এদের স্বার্থ দেখে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প কিন্তু এটাতেই বিশ্বাস করেন। এখন ওরাই চালাবেন দেশ, এটাই বলতে চাচ্ছি।
দেশ রূপান্তর : ডলারের প্রসঙ্গ বলছিলেন। ট্রাম্প তো ব্রিকসের ব্যাপারে বেশ কড়া কড়া কথায় মন্তব্য করেছেন। আপনার কি মনে হয়, ব্রিকস একটু মুখ থুবড়ে পড়বে নাকি ব্রিকস এগিয়ে যাবে যে গতিতে এগোচ্ছিল?
সাকিব আলী : অবশ্যই এগিয়ে যাবে। বললাম না, উনি যতই বলুন, ৪ বছর আগে চায়না ফাইনান্সিয়ালি যে জায়গায় ছিল আজ তো সেখানে নেই। ব্রাজিল, ইরান, সৌদি আরবসহ যারা জয়েন করেছে আমি মনে করি না এরা এখন আমেরিকান হেজিমনিতে আবার ফেরত যাবে।
দেশ রূপান্তর : বলা হয় যে, আমাদের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্পর্ক অতটা উষ্ণ না। বাইডেনের সময় দেখেছি যে আমেরিকার সঙ্গে লেনদেন ও সম্পর্ক; ট্রাম্পের সময় এই জায়গাটার কোনো পরিবর্তন হবে কি না?
সাকিব আলী : সমস্যা হচ্ছে, ড. ইউনূস বিল ক্লিনটন এবং বিশেষ করে হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে ভীষণভাবে যুক্ত ছিলেন বলে ওখানে একটা রেপুটেশন আছে। আর হিলারি ক্লিনটনকে তো ট্রাম্প পছন্দ করেন না। এখন এ ব্যাপারে কোনো চিন্তাও বোধহয় বাংলাদেশ সরকারের নেই। এই অবস্থায় ডোনাল্ড ট্রাম্প ভালো ব্যবহার করবেন আমাদের ড. ইউনূসের সঙ্গে সেটা তো আমার মনে হয় আশা করা ঠিক হবে না। তবে বাংলাদেশের যে গুরুত্ব আছে সেটা অনুযায়ী কিন্তু স্টেট ডিপার্টমেন্টে বাংলাদেশের সঙ্গে কী পলিসি হবে ঠিক করবে। আমি মনে করছি যে আমেরিকা দেখবে যে বাংলাদেশে সে যদি ইন্ডিয়ার স্বার্থ নিয়ে আসে, তাহলে আমেরিকা এখানে তাদের ইনফ্লুয়েন্স হারাবে। আমি মনে করি না যে তারা প্রো-ভারতীয় পলিসি নিয়ে আসবে।
দেশ রূপান্তর : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আমাদের সময় দেওয়ার জন্য।
সাকিব আলী : আপনাকেও ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন।
অনুলিখন : মোজাম্মেল হৃদয়
