পুলিশ কি পেশাদার!

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২৫, ১২:১১ এএম

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘চেইন অব কমান্ড’ বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশ মান্য করা। আপাতদৃষ্টিতে সেই নির্দেশনা নিজের কাছে অন্যরকম মনে হলেও সেটি পালন করা অধস্তনদের কর্তব্য। এর ব্যতিক্রম হয় তখন, যখন কোনো বাহিনী বা বাহিনীর অংশ বিদ্রোহ ঘোষণা করে। অথবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কোনো আদেশ যদি অধস্তনরা দেশ ও গণবিরোধী মনে করে তার প্রতিবাদ করে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্র্বর্তী সরকার দায়িত্ব পালন করছে। এরপর ৫ মাস পার হয়েছে। কিন্তু পুলিশের তৎপরতা খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। কারণ দেশের থানা ও মহানগর এলাকায় পুলিশ সদস্যদের এখনো পুরো মাত্রায় সক্রিয় করা যায়নি। এমনকি আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে মাঠের পুলিশ সদস্যরা কোনো কোনো ক্ষেত্রে কমান্ডও মানছেন না বলে জানা গেছে। এ রকম ঘটনা কি এর আগে ঘটেছে যে, এক সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া পুলিশ সদস্যরা পরের সরকারের আমলে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছেন, কাজ করেননি বা বিদ্রোহ করেছেন? যদি তা না-ই হয়, তাহলে কাজ করতে না চাওয়া, নিষ্ক্রিয় থাকা কেন? রাজধানীসহ সারা দেশে অসংখ্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের খবর পাওয়া যাচ্ছে। পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘ঢাকায় পুলিশের অধস্তন পর্যায়ের সদস্যদের বড় অংশই শেখ হাসিনা সরকারের সময়ের। তাই তারা কথা শুনতে চায় না। অনেকে আবার ঢাকায় নতুন আসায় বিষয়গুলো বুঝে উঠতে পারে না। সব মিলিয়ে আমরা খুবই বিপাকে আছি।’ প্রশ্ন উঠেছে, পুলিশের মাঠপর্যায়ের সদস্যরা কি তাহলে আগের সরকারের আমলের নিয়োগপ্রাপ্ত বলে বর্তমান অন্তর্র্বর্তী সরকারকে সহযোগিতা করতে চাচ্ছে না? যদি একটি বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে এ রকম মানসিকতা কাজ করে, তাহলে পেশাগত চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলার অবনতি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের অসহযোগিতা এবং নিস্পৃহতা এর জন্য অনেকাংশেই দায়ী। অভিযোগ, অভিমান বা অন্য যে কারণই থাকুক না কেন, দায়িত্বে অবহেলা করে পুলিশের কি মূল কর্তব্য থেকে নিজেকে নির্দোষ বা নিরপরাধ হিসেবে প্রমাণ করা সম্ভব? পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় অপরাধীরা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। বাড়ছে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ। আবার পুলিশের পোশাকের নির্ধারিত রঙ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বিভিন্ন পর্যায়ের পুলিশ সদস্য। তারা বলছে, গত ২০ জানুয়ারি আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে গোপন ভোটের মাধ্যমে পুলিশের পোশাকের জন্য লোহার রঙ (আয়রন কালার) নির্ধারণ করা হয়েছে। এ রঙ বাংলাদেশের আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই নয়। এ রঙের পোশাকে ময়লা বেশি জমে। কোনো পর্যায়ের পুলিশ সদস্যই এ রঙের পোশাককে ইতিবাচক হিসেবে নেননি। শনিবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানা যাচ্ছে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর পুলিশের ‘নিষ্ক্রিয়তায়’ অপরাধের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছে কেরানীগঞ্জ। বেড়েছে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতির মতো অপরাধ। খুন, ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে গত পাঁচ মাসে। এ ছাড়া দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেও প্রায় প্রতিদিন হামলা, সংঘর্ষের মতো ঘটনা ঘটছে। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে এসব ঘটনায় পুলিশের তৎপরতা নেই। এই দৃশ্য শুধু কেরানীগঞ্জের নয়। অধিকাংশ জেলা, উপজেলা এমনকি গ্রামেও বেড়েছে অপরাধীদের তৎপরতা।

দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, একটি সরকারি বাহিনীর কাজ, দল-মতের ঊর্ধ্বে থেকে নিজেকে নিরপেক্ষ রাখা। যেহেতু তারা সরকারের কর্মচারী এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, সেহেতু কোনোভাবেই তারা অপরাধীর সামনে নিস্পৃহ থাকতে পারেন না। তাদের প্রতি দেশের মানুষের প্রত্যাশা অনেক। সেখানে থাকতে পারে না কোনো রাজনৈতিক বিষয় । যেহেতু জনগণের করের টাকায়, মানুষের নিরাপত্তার জন্যই পুলিশ বাহিনী, সেখানে তারা একটি রাজনৈতিক দলের বিশ্বাস নিয়ে কোনোভাবেই নিজ কর্তব্য ও দায়িত্ব আড়াল করতে পারেন না। এটা পেশাদার পুলিশের আচরণ নয়। এ রকম চলতে থাকলে মানুষের দৃঢ় ধারণা জন্ম নেবে, পুলিশ বাহিনীতে বিগত সরকারের আজ্ঞাবহ দলীয় বাহিনীই নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন- যা আমরা প্রত্যাশা করি না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত