চাকরির আবেদন জমা ৮০০ বৃহস্পতিবার থেকে বাছাই

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২৫, ০৭:১৭ এএম

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতদের পুনর্বাসনে কাজ করছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান বিষয়ক বিশেষ সেল’। গণঅভ্যুত্থানে আহতদের সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির ব্যবস্থা করা হবে। এজন্য আহতদের পক্ষ থেকে আবেদন জমা নেওয়া হচ্ছে। গতকাল পর্যন্ত প্রায় ৮০০ আবেদন জমা পড়েছে। আগামী বৃহস্পতিবার থেকে এসব আবেদন যাচাই-বাছাই শুরু হবে।

এ ব্যাপারে গতকাল শনিবার জুলাই গণঅভ্যুত্থান বিশেষ সেলের সম্পাদক হাসান ইনাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন পর্যন্ত সিভি জমা পড়ছে প্রায় ৮০০। এই প্রক্রিয়া চলমান থাকবে। আগামী বৃহস্পতিবার থেকে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শুরু হবে। আবেদনকারীদের মধ্যে অনার্স-মাস্টার্স পাস ছাড়াও সব পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা আছেন। বাছাই শেষে আমরা সরকারি এবং বেসরকারি চাকরিগুলোতে আবেদনগুলো পাঠাব। আমরা মূলত সমন্বয়ের কাজ করব। ইতিমধ্যে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। সবার কাছে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছি, অনেকেই আহতদের চাকরিতে নিতে চায়।

আহতের চাকরির ব্যাপারে স্বাস্থ্যবিষয়ক কেন্দ্রীয় উপকমিটির সদস্য শাহরিয়ার মোহাম্মদ ইয়ামিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এর আগেও আহতদের বেশ কয়েকজনকে বিভিন্ন জায়গায় চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছি। এর পাশাপাশি তাদের চাকরির জন্য  আবেদন আহ্বান করেছি। এ ছাড়া গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকেও একটা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন টেকনিক্যাল স্কিল যাদের আছে, যেমন মাইক্রোসফট বা অফিস ওয়ার্ক পারেন, এমন ১০০-২০০ জনকে বিভিন্ন ট্রেনিং দিয়ে চাকরির একটা ব্যবস্থা করে দেবেন। মন্ত্রণালয় উদ্যোগী হয়ে এই উদ্যোগ নিয়েছে। আবেদন করার জন্য তারিখ চলমান থাকবে। 

এর আগে গত ২০ জানুয়ারি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সরকারি-বেসরকারিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে শূন্যপদে যোগ্যতার ভিত্তিতে আহতদের চাকরি নিশ্চিত করার জন্য ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান বিষয়ক বিশেষ সেল’ উদ্যোগ নিয়েছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে আহতদের থেকে সিভি আহ্বান করা হচ্ছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘আপনারা যারা এই আন্দোলনে আহত হয়েছেন, তাদের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে, দ্রুত আপনার সিভি জমা দেওয়ার জন্য।’

উন্নত চিকিৎসায় বিদেশে যাচ্ছেন আরও ১৫-২০ জন : জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতদের দেশে ও বিদেশে উন্নত চিকিৎসায় বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আহতদের চিকিৎসায় বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী এখন পর্যন্ত আন্দোলনে আহত ২০ জনকে উন্নত চিকিৎসায় দেশের বাহিরে পাঠিয়েছে সরকার। আরও ১৫-২০ জনকে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলমান আছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী সপ্তাহেই উন্নত চিকিৎসায় বিদেশ পাঠানো হবে তাদের। এর  আগে গত ২৪ জানুয়ারি শুক্রবার সর্বশেষ সাতজনকে চোখের উন্নত চিকিৎসায় সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়েছে। তারা সবাই জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাদের মধ্যে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিয়ে দুজন সুস্থ হয়ে বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন ও সাতজন চিকিৎসা নিচ্ছেন। থাইল্যান্ডে চিকিৎসা নিচ্ছেন ১১ জন।

এ ছাড়া এসব আহতরা দেশের ভেতর বিনামূল্যে চিকিৎসা পাচ্ছেন। ইতিমধ্যেই যারা বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ও চিকিৎসায় ব্যয় হয়েছে, সেই টাকাও ফেরত দেওয়া হচ্ছে।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যবিষয়ক কেন্দ্রীয় উপকমিটির সদস্য শাহরিয়ার মোহাম্মদ ইয়ামিন বলেন, উন্নত চিকিৎসায় আরও ১৫-২০ জনকে বিদেশে নিয়ে যাওয়া হবে। তাদের পাসপোর্ট, ভিসা ও বিদেশের যে হাসপাতালে চিকিৎসা নেবেন, সে হাসপাতালের ট্রিটমেন্ট প্ল্যান ঠিক হয়ে গেছে। এখন বাংলাদেশ সরকারের যে ফান্ড, সেটা পাস করার প্রক্রিয়া চলছে। এটা হয়ে গেলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই তাদের পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে। 

বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যাপারে এই সদস্য বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে সমস্ত বেসরকারি হাসপাতালকে বলে দেওয়া হয়েছিল সম্পূর্ণ ফ্রিতে চিকিৎসা দিতে। অনেক সময় দেখা গেছে কিছু টেস্ট অন্য হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে করা হয়েছে। এই সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অতিরিক্ত ওষুধ বা চিকিৎসা সামগ্রী কেনার বিলগুলো যদি থাকে, সেই বিলগুলো দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল থেকেও অর্থ ফেরত নিতে পারেন, অথবা সেই বিলগুলো একসঙ্গে করে জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনে জমা দিলে, সেই ফাউন্ডেশন থেকেও বিলের টাকা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।           

শহীদদের গেজেট প্রকাশ : জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪-এ শহীদদের তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে সরকার। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় গত ১৫ জানুয়ারি এই গেজেট প্রকাশ করেন। সরকারি এই গেজেট অনুযায়ী, গণঅভ্যুত্থানে শহীদের সংখ্যা ৮৩৪। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হরিদাস ঠাকুর স্বাক্ষরিত ওই গেজেটে ‘মেডিকেল কেস আইডি’, শহীদদের নাম, বাবার নাম, বর্তমান ঠিকানা, স্থায়ী ঠিকানা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সহায়তা পেয়েছে ২২২৯ পরিবার : আগামী ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই আন্দোলনে নিহতের পরিবারের সদস্যরা আর্থিক সহায়তা পাবেন বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম। গতকাল শনিবার রাজধানীর মোহাম্মদপুর রায়েরবাজার কবরস্থানে কবর জিয়ারতের পর নিহতদের স্বজনদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। কবর জিয়ারতের পর জুলাই-আগস্টে নিহতের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন এবং পরিবারের খোঁজখবর নেন উপদেষ্টা। এ সময় নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘শহীদদের ঋণ কখনো শোধ করা যাবে না। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সব সময় শহীদ পরিবারের পাশে থাকবে। ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতেই শহীদ পরিবারের মধ্যে আর্থিক সহায়তা প্রদান কার্যক্রম চালু হবে।’ রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা অজ্ঞাত পরিচয়ের শহীদদের শনাক্তের কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলেও জানান উপদেষ্টা নাহিদ।

এর আগে গত ১ জানুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন জানায়, গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত ২ হাজার ২২৯ ব্যক্তির পরিবারকে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে ৪৭ কোটি ৩২ লাখ টাকার বেশি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

সেদিন ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ জানান, সেদিন পর্যন্ত ১০৯ কোটি ২০ লাখ টাকার বেশি ফাউন্ডেশনের ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে। সহায়তা হিসেবে ৪৭ কোটি ৩২ লাখ টাকার বেশি দেওয়া হয়েছে। ২ হাজার ২২৯ ব্যক্তির পরিবার সহায়তা পেয়েছে। এর মধ্যে শহীদ পরিবার ৬২৮। আহত ব্যক্তির পরিবার ১ হাজার ৬০১।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের জন্য অর্থসহায়তার পরিমাণ বাড়ানো হবে। পাশাপাশি শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত ব্যক্তিদের কর্মসংস্থান, প্রয়োজন অনুযায়ী সম্মানী ভাতা, আহতদের আজীবন চিকিৎসাসুবিধার ব্যবস্থা করা হবে। এ ছাড়া আহত ব্যক্তিদের আঘাতের মাত্রা অনুযায়ী ক্যাটাগরি করে সহায়তা দেওয়া হবে।

চলতি অর্থবছরে প্রত্যেক শহীদ পরিবারকে ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনে দেওয়া হবে। এ ছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ১৫ হাজার আহতের চিকিৎসায় অনুদান হিসেবে ১৫০ কোটি টাকা দেওয়ারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত