২০১৩ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি এক আইনজীবীর সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন রাজধানীর পূর্ব জুরাইনের এক তরুণী। একপর্যায়ে তাদের সম্পর্কে টানাপড়েন শুরু হয়। ভরণপোষণ ও দেনমোহরের দাবিতে একই বছরের ৮ মে স্বামীকে বিবাদী করে স্ত্রী মামলা করেন ঢাকার পঞ্চম অতিরিক্ত সহকারী জজ ও পারিবারিক আদালতে। এ আদালতের অন্তর্বর্তী আদেশের বিরুদ্ধে পারিবারিক আপিল আদালতে যাওয়াসহ নানা কারণে বিচার বিলম্বিত হয়। গত বছরের ৩ মার্চ বিচারিক আদালত এক রায়ে বিবাদীকে ৫ লাখ টাকা দেনমোহর এবং মামলার সময়কাল থেকে বাদীকে ভরণপোষণ বাবদ ১২ লাখ ৭০ হাজার টাকা দিতে রায় দেয়। এরপর রায়ের ডিক্রি পেতে বাদীকে মামলা করতে হয় গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর। তবে, মূল মামলা প্রায় ১২ বছর পার হলেও নিষ্পত্তি হয়নি। ইতিমধ্যে বাদী ও বিবাদীর বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। এ মামলাটি পারিবারিক আদালতে বিচারাধীন হাজার হাজার অনিষ্পন্ন মামলার একটি। দিনের পর দিন মামলার সংশ্লিষ্ট বাদী, বিবাদী ও তাদের সন্তানরা আদালতে হাজির হন। মামলা যত নিষ্পত্তি হয় তার চেয়ে অনেক বেশি মামলা বিচারের জন্য আসে আদালতে। নানা কারণে নিষ্পত্তিতে রয়েছে ধীরগতি। অন্যদিকে আদালতগুলোতে বিচারবান্ধব পরিবেশ না থাকায় বিচারপ্রার্থী নারী-পুরুষরা হন বিব্রত, মা-বাবার সঙ্গে ধার্য তারিখে আসা শিশুরা বড় হচ্ছে নেতিবাচক মানসিকতায়।
পারিবারিক সমস্যার সমাধান, পারিবারিক শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা, সুখী দাম্পত্য জীবনের পরিবেশ সৃষ্টি ও সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তার লক্ষ্যে প্রায় ৪০ বছর আগে ‘পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫’ প্রণয়ন করে সরকার। এটি দেশে পারিবারিক ও সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আইন হিসেবে প্রশংসিত হয়। এই অধ্যাদেশটিকে আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে এক বছরের বেশি সময় আগে পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ রহিত করে ‘পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩’ প্রণয়ন করে সরকার। পারিবারিক আদালতের বিচারযোগ্য এখতিয়ার হিসেবে বিয়ে বিচ্ছেদ, দেনমোহর, ভরণপোষণ, সন্তানের অভিভাবকত্ব, হেফাজত ও তত্ত্বাবধান, দাম্পত্য সম্পর্ক পুনরুদ্ধার সংক্রান্ত মামলার বিচারের কথা বলা হয়েছে। তবে, এ আইনে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) সুযোগসহ অনেক কিছু থাকলেও বিচার নিষ্পত্তির সময়সীমা নিয়ে কিছু বলা নেই। আইনের বিধান অনুযায়ী, প্রতিটি জেলায় এক বা একাধিক পারিবারিক আদালত থাকবে এবং সহকারী জজ ও সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের বিচারক হবেন। এ ছাড়া জেলা জজ আদালত পারিবারিক আপিল আদালত হিসেবে বিবেচিত হবে।
বিচারাধীন ৭৭ হাজার মামলার চার হাজারের বেশি পাঁচ বছরের পুরনো:
সুপ্রিম কোর্ট, আইন ও বিচার সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে পাওয়া সব শেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের অন্তত ৭০টি পারিবারিক আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৭২ হাজার ৮২। সবচেয়ে বেশি বিচারাধীন মামলা ঢাকার তিনটি পারিবারিক আদালতে এবং এ সংখ্যা ৯ হাজার ৬১১। এরপর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিচারাধীন চট্টগ্রামে ৬ হাজার ৬৮৭। সবচেয়ে কম মামলা বিচারাধীন সুনামগঞ্জে ১৪৬টি। ৭২ হাজারের বেশি বিচারাধীন মামলার মধ্যে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন ৪ হাজার ১৯৮ মামলা।
পারিবারিক আদালতে মামলার বিচারে দীর্ঘসূত্রতার কারণ হিসেবে আইনজীবী, নারী ও শিশু অধিকারকর্মীরা বলেন, মামলার প্রবণতা বেড়ে যাওয়া, বিচারব্যবস্থা আধুনিকীকরণ ও যুগোপযোগী না হওয়া, পারিবারিক আদালতের অন্তর্বর্তী আদেশের বিরুদ্ধে এক আদালত থেকে আরেক আদালতে আবেদন, ঘন ঘন শুনানি মুলতবি, বিচারক ও আদালতের এজলাস স্বল্পতা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মামলার বাদী ও বিবাদীদের কিংবা সন্তান নিয়ে বাবা-মায়ের ‘ইগো’ বা জেদ, আইনে আপস বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) সুযোগ থাকলেও তাতে পক্ষদের অনাগ্রহ মূল কারণ।
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের পারিবারিক আদালতগুলোর পরিবেশ এবং মামলার অবস্থা দেখলে মনে হয় না যে উদ্দেশ্যে আইন ও আদালত করা হয়েছিল তা সফল হচ্ছে। মামলা নিয়ে বাদী, বিবাদী তাদের সন্তান ও বিচারক সবাই যন্ত্রণায় ভোগেন। শিশুরা এমন পরিবেশে নেতিবাচক মানসিকতা নিয়ে বড় হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই এমন অবস্থা চলছে। যেহেতু এসব মামলায় নারী ও শিশুদের উপস্থিতি রয়েছে, তাই পারিবারিক আদালতগুলোকে পৃথক স্থানে নিয়ে যেতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘একে তো আদালতগুলোতে উপযুক্ত পরিবেশ নেই। অন্যদিকে হাজার হাজার মামলার জট। এ পরিস্থিতি থেকে অবশ্যই উত্তরণ ঘটাতে হবে। বিচার দ্রুত নিষ্পত্তির কৌশলের পাশাপাশি আদালতগুলোকে বিচারবান্ধব করতে হবে।’ প্রতিবেদনের শুরুতে উল্লিখিত মামলায় বাদীর আইনজীবী আজাদ রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘‘এক মামলা থেকে আরেক মামলা। দিনের পর দিন হাজিরা, এটাই এখন ‘সিস্টেম’। দুঃখজনক হলেও এই পরিস্থিতি বছরের পর বছর চলছে।”
আদালতগুলোতে বেশি ভোগেন নারী ও শিশু:
আইনজীবী ও আদালত সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা বলেন, মামলার ধার্য তারিখে অনেক নারী ও পুরুষ দূরদূরান্ত থেকে আসেন। বিচারপ্রত্যাশীদের বেশিরভাগ নারী ও শিশু। কিন্তু তাদের জন্য কোনো পৃথক বিশ্রামাগার, শৌচাগার নেই। আদালত এলাকায় যে কয়েকটি শৌচাগার আছে তা খুবই নোংরা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ। তাতে পুরুষের গা ঘেঁষে যেতে হয় নারীদের। আদালতগুলোর ধারেকাছে নেই দুগ্ধপোষ্য শিশুকে মাতৃদুগ্ধ পান করানোর স্থান (ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার)। ঢাকা জেলা ও দায়রা আদালত ভবনের (নতুন) নিচতলায় দ্বিতীয় অতিরিক্ত সহকারী জজ ও পারিবারিক আদালত ঘুরে দেখা গেছে, ছোট একটি এজলাসে কোনোমতে চলে বিচারকাজ। আদালতকক্ষে নথি রাখার জায়গা পর্যন্ত নেই। নথি ছড়িয়ে আছে এখানে-সেখানে। এমনকি বিচারকের বসার এজলাসেও উপচে পড়ছে মামলার নথি। আদালতের বারান্দায় একটি মাত্র বেঞ্চ। তাতে কোনোমতে বিচারপ্রার্থী চারজন নারীকে বিব্রতকর অবস্থায় বসে থাকতে দেখা গেছে। অনেক নারী, শিশু ঠায় দাঁড়িয়ে। এদের অনেকেই কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত শুনানির অপেক্ষায় বসে আছেন। পাশেই তৃতীয় অতিরিক্ত সহকারী জজ ও পারিবারিক আদালতে গিয়ে দেখা গেছে, ছোট আদালতে তিনটি ভাঙাচোরা বেঞ্চে আর জায়গা নেই। আইনজীবী ও বিচারপ্রত্যাশীদের বেশিরভাগ দাঁড়িয়ে আছেন। সাতটি স্টিলের আলমারি নথিতে ঠাসা। আদালতের এখানে সেখানেও নথি। দুই আদালতে মায়েদের সঙ্গে আসা অন্তত সাত শিশুকে দেখা গেছে দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষায় ক্ষুধা আর ক্লান্তিতে নুয়ে পড়ছে। বিচারপ্রার্থী কয়েকজন পুরুষকে দেখা গেছে ক্লান্ত শ্রান্ত ভঙ্গিতে পায়চারি করছেন।
গত ২২ জানুয়ারি দুপুরে পৌনে ১টার দিকে তৃতীয় অতিরিক্ত সহকারী জজ ও পারিবারিক আদালতের বারান্দার বেঞ্চিতে দুই নাতিকে নিয়ে বসেছিলেন ষাটোর্ধ্ব এক নারী (সংগত কারণে নাম প্রকাশ করা গেল না)। এসেছেন শনির আখড়া থেকে। আলাপকালে ওই নারী বলেন, পাঁচ বছর ধরে জামাতা মেয়ে ও দুই শিশুসন্তানের (একজনের বয়স ১১ অন্যজনের ৭ বছর) দেখভাল করেন না। আলাদা থাকেন। শিশু দুটি স্কুলে পড়ে। ভরণপোষণের জন্য পাঁচ বছর ধরেই তারা আদালতে ঘুরছেন। মেয়ে আদালতের ভেতরে শুনানির অপেক্ষায় আছেন। ওই নারী বলেন, ‘খালি মামলার তারিখ পড়ে। তবু টাকা খরচ করে আসতে হয়। মামলা করে যন্ত্রণা কিনেছি।’ জেলা ও দায়রা আদালত ভবনের (পুরনো) দোতলায় পঞ্চম অতিরিক্ত সহকারী জজ আদালত আয়তনে একটু বড় হলেও আদালতের পরিবেশ প্রায় একই অবস্থা।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রশান্ত কুমার কর্মকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পেশাগত কারণে এসব আদালতে প্রায়শই শুনানির জন্য যেতে হয়। কিন্তু যে পরিবেশ তাতে কোনোভাবেই এগুলোকে বিচারপ্রত্যাশী-বান্ধব বলার সুযোগ নেই। একদিকে আদালতে এসে নারী ও শিশুরা বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। অন্যদিকে মামলাজটে পক্ষদের মানসিক ও আর্থিক চাপ বাড়ে।’ তিনি বলেন, ‘মামলার কোনো কোনো পক্ষও বিচার বিলম্বিত করতে চেষ্টা চালান। মামলা নিষ্পত্তির মানসিকতা যেমন থাকতে হবে, তেমনি আদালতের চাপ কমিয়ে বিকল্প নিষ্পত্তির দিকে যেতে হবে।’
