ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে একসময় একটি গল্প চালু ছিল। এক ব্যক্তি গুড় কেনার জন্য হাটে গেছেন। গুড়ের দোকানের ডালায় বিভিন্ন ধরনের গুড় থরে থরে সাজানো। ক্রেতা সব রকমের গুড় দেখিয়ে বিক্রেতাকে ‘এখান থেকে দাও, ওখান থেকে দাও’ বলে অনেক গুড় উঠাতে বললেন। বিক্রেতা তার কথামতো পাল্লায় অনেক গুড় উঠিয়ে জানতে চাইলেন, ‘কয় সের নেবেন?’ ক্রেতা ‘আধা সের গুড়’ দেওয়ার কথা বললেন। বিক্রেতা পাল্লা না উঠিয়েই বললেন ‘এত গুড়ে আধা সের হয় না।’ আধা সের গুড়ের গল্প মনে পড়ে গেল, অন্তর্র্বর্তী সরকারের অবস্থা দেখে। প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের অবস্থা ‘এত গুড়ে আধা সের হয় না’র মতো হয়েছে।
অন্তর্র্বর্তী সরকার অনেক কাজ নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। সংবিধান, নির্বাচন ও বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রকাঠামোর বেশ কিছু বিষয়ের সংস্কার, চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র তৈরি, গণহত্যা ও দুর্নীতির বিচার, গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা এবং সর্বোপরি জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করা সরকারের অগ্রাধিকার। সরকার এসব নিয়ে কাজ করে চলেছে। তবে এর বিপরীতে সরকারের সময়সীমা হচ্ছে চলতি বছরের ডিসেম্বর, সর্বোচ্চ আগামী বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত। সরকারপ্রধান অবশ্য বারবার বলছেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো যদি কম সংস্কার করে নির্বাচন চায়, তবে কম সংস্কার করে নির্বাচন দিয়ে তারা বিদায় নেবেন। আর তারা (রাজনৈতিক দল) যদি বেশি সংস্কার চায়, তবে বেশি সংস্কার করে আগামী বছরের প্রথমার্ধে নির্বাচন আয়োজন করবেন।’ রাজনৈতিক দল বিশেষ করে বর্তমানে রাজনীতির ময়দানের প্রধান দল বিএনপি ও তাদের সমমনাসহ কয়েকটি দল দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানানো অব্যাহত রেখেছে। চলতি বছরে তো বটেই, সম্ভব হলে আগস্ট মাসে নির্বাচন দেওয়ার কথা বলছে বিএনপি। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্বাচনের জন্য ‘যতটুকু সংস্কার দরকার ততটুকু সংস্কার করে’ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানাচ্ছেন। দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের তাগিদ দেওয়া প্রসঙ্গে বিএনপির বক্তব্য হচ্ছে, ‘২০১৪ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত তিনটি নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেনি। এর সুযোগ নিয়ে দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম হয়েছিল।
জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে নির্বাচিত সরকার গঠন বিলম্বিত হলে ফ্যাসিবাদী শক্তি আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে। ফ্যাসিবাদী শক্তির দোসররা এখনো দেশের ভেতর নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছে।’ বুধবার এক অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘অনেকে বলে থাকেন যে, বিএনপি এত নির্বাচন-নির্বাচন করে কেন। বিশেষ করে ছাত্ররা তো বলেই। এর কারণ একটাই, আমি বিশ্বাস করি, যেকোনো নির্বাচিত সরকার কোনো অনির্বাচিত সরকারের চেয়ে ভালো। এখনই নির্বাচন করে ফেলতে হবে, আমরা তা তো বলছি না। ন্যূনতম যে সংস্কার, সেটা করে নিয়ে নির্বাচন করলে সমস্যাগুলো অনেকটা সমাধান হবে।’
বিএনপি ও সমমনাদের দ্রুত নির্বাচনের দাবির বিপরীতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আগে ‘সংস্কার ও গণহত্যার বিচার’ তারপর নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছে। দেশ কাঁপানো কোনো অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া সমন্বয়কদের বক্তব্য হলো, রাজনৈতিক দলগুলো স্বাধীনতার ৫৩ বছরেও দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। বারবার সুযোগ পেয়েও তারা (রাজনৈতিক দলগুলো) কোনো স্থায়ী রাজনৈতিক বন্দোবস্ত চালু করতে ব্যর্থ হয়েছে। আর এর সুযোগ নিয়ে দেশে কখনো স্বৈরাচারী শাসন, আবার কখনো ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম হয়েছে। জনগণ বারবার প্রতারিত হয়েছে। সমন্বয়করা মনে করেন, জুলাই অভ্যুত্থানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কারের যে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তা হাতছাড়া হলে আবার সেই সুযোগ নাও আসতে পারে।
সংস্কার প্রশ্নে রাজনৈতিক দল এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অবস্থান অনেকটা বিপরীতমুখী। প্রফেসর ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারও নির্বাচনের আগে সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিতে চাচ্ছে। সংস্কার বিষয়ে প্রফেসর ইউনূস প্রথম পর্যায়ে যে ছয়টি কমিশন গঠন করেছিলেন তার মধ্যে চারটি কমিশন গত ১৫ জানুয়ারি তাদের প্রস্তাব জমা দিয়েছে। সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, দুর্নীতি দমন ও পুলিশ সংস্কার কমিশন প্রধান উপদেষ্টার কাছে নিজ নিজ প্রস্তাব হস্তান্তর করেছে। প্রফেসর ইউনূস সংস্কার প্রতিবেদনকে নতুন বাংলাদেশের সনদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ওই দিন ৪ কমিশনের প্রতিবেদন গ্রহণ করে তিনি বলেন, ‘এ সনদ (চার্টার) আমরা বুকে নিয়ে অগ্রসর হব। যত দ্রুত পারি, যত বেশি এটা বাস্তবায়ন করতে পারি, করতে থাকব। ভবিষ্যতে যে নির্বাচন হবে, এটাও হবে এই সনদের ভিত্তিতে। সেটাও যেন ঐকমত্যের সরকার হয়।
পরবর্তী সরকারও যেন বলে যে, সনদ আমরা ধরে রেখেছি। যত কিছুই হোক, এটা যেন হাত থেকে ছেড়ে না দেই।’ প্রধান উপদেষ্টা সেদিন আরও বলেছিলেন, ‘এই চার্টার থেকে যাবে ইতিহাসের অংশ হিসেবে। এটা আমাদের জাতীয় কমিটমেন্ট। এটা কোনো দলীয় কমিটমেন্ট নয়। আমরা আশা করছি, সব দল এই চার্টারে সাইনআপ (অংশগ্রহণ) করবে। নির্বাচন এই চার্টারের একটা অংশ হবে এবং ঐকমত্যের নির্বাচন হবে। তা না হলে চার্টার হারিয়ে যাবে। কাজেই এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’
প্রধান উপদেষ্টা সংস্কার বিষয়কে কতখানি গুরুত্ব দিচ্ছেন তা তার উপরোক্ত বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, প্রধান উপদেষ্টা ও তার পারিষদ এবং ছাত্র নেতৃত্বের আকাক্সক্ষার সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যাশা একমুখী স্রোতে প্রবাহিত হচ্ছে না। ‘ডিম আগে না মুরগি আগে’ বিতর্কের মতো ‘সংস্কার আগে না নির্বাচন আগে’ এ নিয়ে চলছে বাহাস। বিএনপিসহ রাজনীতির দলগুলো বলছে যে, অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না। জিনিসপত্রের দাম নিয়ন্ত্রণেও সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। একমাত্র জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত অর্থাৎ নির্বাচিত সরকারই পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে সক্ষম। আর নির্বাচিত সংসদই পারে সংস্কার প্রস্তাবের বৈধতা দিতে। এদিকে চার সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবের মধ্যে সংবিধান সংস্কার কমিশনের বেশ কিছু সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দল ও আইনজ্ঞদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক নাম ও মূলনীতি পরিবর্তনের যৌক্তিকতা নিয়ে নেতারা প্রশ্ন তুলেছেন। তারা মনে করেন, মীমাংসিত বিষয় পরিবর্তন করা হলে তা রাষ্ট্রের বা জনগণের জন্য মঙ্গলজনক হবে না। এতে করে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হবে এবং বিভাজন আরও বাড়বে।
রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া সংবিধান সংস্কার জটিলতা সৃষ্টি করবে। সংস্কার নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি এখন জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে শুরু হয়েছে বাহাস। জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীরা বলছেন, ‘ঘোষণাপত্র হলো গণ-অভ্যুত্থানের স্বীকৃতি। গত ৫ আগস্টের পর হঠাৎই একটা সরকার গঠন করা হয়। তখন যদি বৈপ্লবিক সরকার গঠন করা হতো তাহলে সরকার, প্রশাসনসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গা নানা শঙ্কা তৈরি হতো না।’ গত ডিসেম্বরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশের মাধ্যমে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র ঘোষণা করার কথা ছিল। ছাত্রনেতারা তেমনটাই করতে চেয়েছিলেন। ঘোষণাপত্রের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে বিএনপি তখন সন্দেহ, সংশয় ও উদ্বেগ প্রকাশ করে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতা মির্জা আব্বাস সে সময় বলেছিলেন যে, ‘২০২৪ সালের আন্দোলন নিয়ে কেউ ব্রান্ডিং করার চেষ্টা করবেন না। শেখ হাসিনার পতনের বিষয়ে বালখিল্য কথা বলে কেউ জাতিকে বিভক্ত করবেন না।’ বিএনপির নীতিনির্ধারক নেতাদের ধারণা, দেশে কর্র্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এই ঘোষণাপত্র দেওয়ার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। এর ফলে দেশ আবার সংকটের মধ্যে পড়তে পারে। সিপিবিসহ একটি দল তখন ছাত্রনেতাদের সতর্ক করে বলে, ‘সংবিধান ছুড়ে ফেলা দেশবাসী গ্রহণ করবে না।’
ঘোষণাপত্র নিয়ে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায় যে, ঘোষণাপত্রের সঙ্গে সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। মূলত প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপের ফলে ঘোষণাপত্র দেওয়া থেকে বিরত থাকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। প্রেস উইং থেকে তখন জানানো হয়, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সরকার নিজেই এই ঘোষণাপত্র প্রকাশ করবে। ঘোষণাপত্র নিয়ে রাজনৈতিক দলের মতামত জানতে এবং সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে প্রধান উপদেষ্টা ১৬ জানুয়ারি বিএনপি ও জামায়াতসহ কয়েকটি দলের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে প্রশ্ন তুলেও বিএনপি জুলাই ঘোষণাপত্রের বিরুদ্ধে নয় বলে বৈঠকে জানায়। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ঘোষণাপত্রে সবার অবদানের স্বীকৃতি এবং অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে জরুরি ফ্যাসিবাদবিরোধী যে ঐক্য গড়ে উঠেছে তা অটুট রাখতে হবে। ঘোষণাপত্রের কারণে নিজেদের মতবিরোধে ঐক্য বিনষ্ট করা যাবে না।’
এদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র প্রকাশের বিলম্ব হওয়ায় জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তারা আশা করছে, সব রাজনৈতিক দলের মতামতের ভিত্তিতে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হবে। ঘোষণাপত্র কেন লাগবে, সে প্রসঙ্গে সম্প্রতি বক্তব্য দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখপাত্র সামান্তা শারমিন। একটি দৈনিক পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘একটা অভ্যুত্থানের পর ঘোষণাপত্র লাগবে। এ বিষয়ে সবার মতামত নেওয়ার চেষ্টায় আছে সরকার। তবে যথেষ্ট স্লো। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে বোঝানো উচিত গণ-অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র তাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। ভবিষ্যতে তাদের রাজনীতি করা এবং তরুণবান্ধব করার জন্য ঘোষণাপত্র দরকার। আন্দোলনের পর ঘোষণাপত্র না দেওয়া একটি অসমাপ্ত কাজ ছিল বৈষমবিরোধীদের। যেহেতু ঘোষণাপত্র প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাই এটা করা জরুরি।’ অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে কঠিন সব কাজ পড়ে আছে। বিভিন্ন বিষয় সংস্কার (তা রাজনৈতিক দলগুলোর মতে ‘নির্বাচনের জন্য যতটুকু দরকার’ হোক অথবা তার চেয়ে বেশি হোক) করে ঐকমত্যের ভিত্তিতে তা কার্যকর এবং ঘোষণাপত্র তৈরি করা। ঘোষণাপত্রও ঐকমত্যের ভিত্তিতে করার কথা বলা হচ্ছে।
সংস্কার এবং ঘোষণাপত্র তৈরিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা রীতিমতো দুরূহ ব্যাপার। কারণ জাতীয় ইস্যুতে আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের নজির খুব একটা বেশি নেই। সংবিধান ও নির্বাচন সংস্কার বিষয়ে দলগুলো অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছাতে পারবে কি না, তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। বিশেষ করে, সংবিধানের মতো স্পর্শকাতর বিষয়। কারণ ইতিমধ্যে সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবে দেশের সাংবিধানিক নাম বদলের সুপারিশ ও তার মূলনীতি নিয়ে কয়েকটি রাজনৈতিক দল প্রশ্ন তুলেছে। কোনো কোনো রাজনৈতিক দলে এ প্রসঙ্গে মীমাংসিত বিষয় নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়, এমন কিছু না করার কথা বলছে।
প্রত্যাশিত নির্বাচন পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারকে অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হবে। সরকারের হাতে সময় কম। তা চলতি বছরে ডিসেম্বর হোক, অথবা আগামী বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত, যেটাই হোক। শুরু থেকে প্রফেসর ইউনূসের সরকার বিপরীত স্রোত ঠেলে সাঁতার কেটে তীরে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে অর্থনীতি, নষ্ট হয়ে যাওয়া পুলিশ ও প্রশাসন, ইচ্ছা পূরণের বিচার বিভাগ, বিপর্যস্ত ব্যাংকিং খাত এসব কিছুর বোঝা সরকারকে টেনে চলতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রতিদিনের সব ঘটনা বা সমস্যা। আইনশৃঙ্খলায় সরকার এখনো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যাকান্ড সংঘটিত হচ্ছে। সংবাদপত্রের খবর শুধু সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চার মাসে ৯৪৭ খুন হয়েছে। দেশ ছেড়ে গেছে আলোচিত সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলাল ও ইমন (সমকাল, ২৫ জানুয়ারি)। গ্রেপ্তার ছাত্রদল নেতাকে ছিনিয়ে নিতে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে খোদ রাজধানীতে। এতে নিউমার্কেট জোনের সহকারী কমিশনারসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। ঘটনা ঘটেছে শুক্রবার ভোরে নিউমার্কেট থানার সামনে। চলছে ব্যাপক চাঁদাবাজি ও দখলবাজি। বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট, বালু মহাল, মাছের ঘের, সর্বত্র যেন দখলের মহোৎসব চলছে। আওয়ামী স্বৈরাচারের দখলদাররা গণ-অভ্যুত্থানের পর আত্মগোপনে চলে গেছে। সেখানে আগমন ঘটেছে নতুন চাঁদাবাজ ও দখলবাজদের। এক্ষেত্রে অধিকাংশ জায়গায় অভিযোগের তীর বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। দলের হাইকমান্ডের কঠোর বার্তা, শোকজ, বহিষ্কার কোনো কিছুই চাঁদাবাজ ও দখলবাজদের থামাতে পারছে না। রাজধানীতে গুরুত্বপূর্ণ সড়কে বিশেষ করে শাহবাগ, প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণ, কখনো কখনো সচিবালয়ের সামনে প্রায় প্রতিদিনই দাবি-দাওয়া নিয়ে সমাবেশ, মিছিল, ঘেরাও কর্মসূচি চলছে। যখন যার ইচ্ছা সেই সড়কে বসে পড়ছে। সৃষ্টি হচ্ছে নগর জুড়ে তীব্র যানজট। দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ।
জিনিসপত্রের দাম নিয়ে সাধারণ মানুষের কষ্টের অবসান তো দূরের কথা বরং অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে। চালের দামের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষ হিমশিম খাচ্ছে। গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনো তৈরি হয়নি। অনেকে ক্ষতিপূরণ পেয়ে গেলেও সব শহীদের পরিবার এখনো তা পায়নি। আহতদের অনেকের সুচিকিৎসা না পাওয়া নিয়ে মাঝেমধ্যেই অভিযোগ উঠছে। এসব ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য উপদেষ্টার ভূমিকা ইতিমধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ।
অভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবার ও আহতদের সহায়তার লক্ষ্যে গঠিত জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন সারজিস আলম। তিনি জানান, ‘প্রয়োজনীয় সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, তাই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।’ তবে সারজিসের ঘনিষ্ঠজনরা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জটিলতার কারণে দ্রুততার সঙ্গে কাজগুলো সম্পন্ন করতে পারছিলেন না তিনি। ধীরগতির কারণে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হচ্ছেন, তাই দায়িত্ব ছেড়েছেন।’ প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস ইতিমধ্যে বলেছেন, ‘আগামী নির্বাচন হবে ইতিহাসের সেরা নির্বাচন।’ বিদ্যমান প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে শান্তিতে নোবেলজয়ী প্রফেসর ইউনূস কীভাবে জাতিকে ‘ইতিহাসের সেরা নির্বাচন’ উপহার দেন সেটাই এখন দেখার বিষয়।
লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক
[email protected]
