অন্য এক ভারতের আখ্যান

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০২৫, ০৭:১৬ এএম

ভোর থেকে মাইকে বাজতে থাকে দেশাত্মবোধক গান। আগের রাত থেকেই বাজারে বিক্রি হতে থাকে জাতীয় পতাকা। দিল্লি, কলকাতা, মুম্বাই সব বড় শহরের রাস্তায় বাচ্চা ছেলেমেয়েরা দামি গাড়ি দেখলেই ছুটতে শুরু করেন পতাকা নিয়ে। ১৫ আগস্ট বা ২৬ জানুয়ারি এলেই আমাদের দেশপ্রেম জেগে ওঠে। ১৫ আগস্ট, ১৯৪৭ সালে ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে উপমহাদেশের মানচিত্র আলাদা হয়েছিল। আর ২৬ জানুয়ারি, ১৯৫০ সালে ভারতের সংবিধান জন্ম নিয়েছিল। এই সংবিধানের রূপরেখা তৈরির নেতৃত্বে ছিলেন বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর।

যত দিন যাচ্ছে ততই কেন জানি না, মনের মধ্যে অনেক প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে। ভারতের যে সংবিধান ঘোষিত করেছিল বর্ণ, ধর্ম, জাত নির্বিশেষে সব মানুষের ঐক্য, সাম্য, মৈত্রী ও সমানাধিকারের কথা, আজ এত বছর বাদে বাবাসাহেবের কল্পনার দেশ কতটা পুরনো অঙ্গীকার বজায় রাখতে পেরেছে বা পারেনি, তাই নিয়েই ইদানীং বড় ধন্দের মধ্যে পড়ি। কয়েক বছর ধরে, ভারতের চিরাচরিত ফেডারেল কাঠামোর ওপর যেভাবে আঘাত আসছে তাতে সন্দেহ হয় আগামী দিনে এই দেশ পুরোপুরি কেন্দ্রশাসিত হয়ে যাবে কি না! দেশ বলতেই কি শুধু কোনো দেশের সরকার, সরকারি নীতি, জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবতীয় সিদ্ধান্ত অথবা দেশের বিপুল জনগণ, তাদের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাক্সক্ষা আর বেঁচে থাকার অদম্য স্পৃহা? এসব হাজারো প্রশ্ন ইদানীং মনের মধ্যে ঘুরেফিরে আসে। ঐতিহাসিক ব্যাশমের অসাধারণ একটি বই আছে ‘ওয়ান্ডার দ্যাট ওয়াজ ইন্ডিয়া’। সময় পেলেই তা মুগ্ধ হয়ে পড়ি। ব্যাশম বলেছেন অদ্ভুত এক চমৎকার, বর্ণময় দেশ হলো ইন্ডিয়া। প্রতি পাঁচ কিলোমিটার অন্তর এ দেশের ভাষা, পোশাক, গাত্রবর্ণ সব বদলে বদলে যায়। তবুও বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য ভারতের স্বাভাবিক প্রবণতা। সব দেশের মতো, ভারতকে চিনতেও আপনাকে শুধু সরকারের কার্যকলাপ দেখে সিদ্ধান্ত নিলে হতাশ হতে হবে।আমি ভারতের গ্রামেগঞ্জে ঘুরতে ঘুরতে, মফস্বল, শহরের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে দেশটাকে আবিষ্কারের চেষ্টা করি। বর্ষায় থৈ থৈ মুম্বাই বা বস্তারের গ্রাম যে কী অসাধারণ, তা যারা দেখেননি, তাদের পক্ষে অনুভব করা কঠিন। বিহারের অজস্র ছোট ছোট জনপদ, একোয়ারি, নারহি, নানৌর, হাইবাসপুর, ডুমরাও... । প্রথমবারের বিহার দেখা কখনো ভুলব না। সোজা কলকাতা থেকে গাড়ি নিয়ে বিহার চলেছি। আসানসোল, ধানবাদ পেরোতেই সবুজ মাঠের রঙ ধূসর। বক্তিয়ারপুর হয়ে পাটনা। আমরা যাব পাটনার গ্রাম জলপুরা হয়ে হাইবাসপুর। যেখানে আগের রাতে দশজন দলিতকে গুলি করে খুন করা হয়েছে। বিহার তখন অগ্নিগর্ভ। গরিবস্য গরিবেরা উচ্চবর্গের হাতে মার খেতে খেতে পাল্টা মার দিতে শুরু করেছেন। হাতে তুলে নিয়েছেন নকশালবাড়ী রাজনীতির লাল পতাকা। শ্বেত ও লাল সন্ত্রাসের দ্বন্দ্বে সারা বিহার তখন উত্তাল। ক্যামেরা হাতে সেই প্রথম অন্য এক অচেনা ভারতের পাঠ নেওয়ার শুরু।

ভারতের সামন্ত সংস্কৃতি জানতে হলে বিহার, উত্তর প্রদেশের গ্রামগঞ্জে ঘোরা অবশ্য কর্তব্য। বিহার না দেখলে জানতেও পারতাম না যে, কী ভয়ংকর জাত ব্যবস্থা এদেশে আজও রয়ে গেছে। ব্রাহ্মণ, ভূমিহার, রাজপুত, ক্ষত্রিয়, মিশ্র একদিকে, অপরদিকে পিছড়ে ও অতি পিছড়ে বর্গ অধ্যুষিত বিহারের জমির মালিকানা, পুরোপুরি উচ্চবর্গের হাতে। প্রান্তিক কৃষক, ক্ষেতমজুর, বর্গাদার সব নিম্নবর্গের।  যে সময়ের কথা, তখন জমি থেকে তুচ্ছ কারণে কৃষক উচ্ছেদ নিত্যদিনের ঘটনা। নিম্নবর্গের ছায়া মারানো ছিল উচ্চবর্গের কাছে  ‘অপরাধ’। অথচ তাদের মেয়েদের যথেচ্ছ ভোগদখল ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। ‘ডোলি উঠানা’ রেওয়াজ ছিল বর্বরতম। নিয়ম, নিম্নবর্গের মেয়ে বিয়ের পরে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার আগে পালকি বা ডোলি নিয়ে প্রথমে যাবে গ্রামের মুখিয়া, উচ্চবর্গের সামন্ত ডেরায়। সেই সামন্ত ইচ্ছামতো কনেকে ভোগদখলের পর কনেকে অনুমতি দেবে শ্বশুরের ভিটেয় যাওয়ার। এ রকম কত কত কুৎসিত কাস্টম আজও রয়ে গেছে ভারতের গ্রাম-মফস্বলে। হাইবাসপুর যেতে যেতে শুনছিলাম, বিহারের গ্রামে হোলির আগের রাতে হোলিকা দহনের নামে দলিতদের বাসায় আগুন দেওয়া উচ্চবর্গের এক পুরনো রেওয়াজ। দলিতদের কান্না, আর্তনাদ আর উচ্চবর্গের কুৎসিত অট্টহাসি মিলেমিশে এক হয়ে যায়। হাইবাসপুর পৌঁছে দেখি, গ্রামের অনেক দূরের এক কুয়োর গায়ে দলিতদের রক্তে লেখা রয়েছে স্রেফ নীচু জাতের কারণে গুলি করে মারা হয়েছে দশ-দশজন হতভাগ্য দলিতকে।

ওড়িশার ছোট্ট গ্রাম মুচকুন্দের ঠিক ওপারে অন্ধ্র। জঙ্গলের পথে চমৎকার নেকড়ে দম্পতির দেখা মিলেছিল। আসল ভারত কখনো প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে পাবেন না। তাকে চিনতে গেলে গ্রাম ভারতকে দেখতে হবে। বিহার, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিসগড়, পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র। বস্তারের গ্রামে গ্রামে কেন্দ্রের বিজেপির নেতৃত্বাধীন সরকার মাওবাদী দমনের নামে প্রায় রোজ নিরীহ আদিবাসী খুন করছে আকাশ থেকে ড্রোনের সাহায্যে অস্ত্র দিয়ে। এছাড়া ফেক এনকাউন্টার তো লেগেই আছে। গণতান্ত্রিক ভারত দ্রুত স্বৈরাচারী পথে চলা শুরু করেছে। যাবতীয় বিরোধী কণ্ঠ স্তব্ধ করার কাজ পুরোদমে চলছে। বাক ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হয়ে পড়ছে আভিধানিক শব্দ মাত্র। অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছে। বাড়ছে সাম্প্রদায়িক প্রবণতা, জাতপাতের দ্বন্দ্ব। বিজেপির থিঙ্কট্যাঙ্ক আরএসএসের শতবর্ষ সামনেই। আরএসএসের এজেন্ডা ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র ঘোষণা। বহুত্ববাদী দেশকে এককেন্দ্রিক করা। ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ নামে আসলে এ দেশকে করা হবে ‘মনুবাদী’। যেখানে বিপরীত ধর্ম বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলমানের কোনো গুরুত্ব নেই। এমনকি বহুত্ববাদী হিন্দু ধর্মের দলিত বা বহুজনের কোনো অস্তিত্ব সেভাবে থাকবে না। শুধুই ‘হিন্দু হিন্দি হিন্দুস্তান’ গর্জনে ক্ষীণ হতে থাকবে বহুত্ববাদী ভারতের আওয়াজ। দিল্লির দাঙ্গা দেখেছি। গুজরাটের গণহত্যার সাক্ষী হয়েছি। কত কালো সময় দেখতে দেখতে বিষাদগ্রস্ত হয়েছি। আবার ম্যাকলাস্কিগঞ্জের ছোট্ট স্টেশনের রাতে মুগ্ধ হয়েছি। পালামুঁর ভোর খুব সুন্দর। কুয়াশা ঢাকা ছিপাদহরের সৌন্দর্য তুলনাহীন। কালোর পাশেই থাকে আলো। ইন্ডিয়া আর ভারতের ফারাক অনেক। ইন্ডিয়া প্রোজেক্টেট হয়। ভারত, বিবর্ণ হয়ে মুখ লুকোয়। উন্নয়ন আর জিডিপি গ্রোথে দেশকে চেনা যায় না। এক্সপ্রেসওয়ে, বহুতল, শপিং মল,  প্রযুক্তির পাশাপাশি লুকিয়ে থাকে দুর্ভিক্ষ, অনাবৃষ্টি, কৃষকের আত্মহত্যা, দাঙ্গাবিধ্বস্ত মানুষজনের অজস্র কাহিনি।

ছাব্বিশে জানুয়ারি রাজপথে বের হয় দাম্ভিক ভারতের মহাসমারোহ। অস্ত্রের ঝনঝনানি, সুসজ্জিত ট্যাবলো। গরমের ভোরে মাইলের পর মাইল হেঁটে ওড়িশা, বিহারের কৃষক রমণী সামান্য জলের জন্য মাটি খুঁড়ে জল বের করতে থাকেন। মহারাষ্ট্রের গাঁয়ে আম্বেদকরাইট বধূ আনমনে প্রতিদিনের মতো বাবাসাহেবের ছবিতে মালা দেন। ছত্তিশগড় রাজ্যের নদী বিক্রি হয় পুঁজির কাছে। উচ্চবর্গের কুয়ো থেকে জল নেওয়ার দায়ে খুন হতে হয় দলিত কিশোরকে। সীমান্তের কাঁটাতারে ঝুলতে থাকে অশান্ত সময়। আপনাকেই ঠিক করতে হবে, কোন ভারত আপনার আপনজন? রাষ্ট্র অথবা জনগণ! নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজারের এক জায়গায় লেখা আছে যে, সব পথে কাঁটা বিছোতে নেই। তাহলে তোমার পায়েও কাঁটা বিঁধে যাবে। ভারতের সমাজ, সংস্কৃতি একমাত্রিক নয়। অনেক সভ্যতার মিলেমিশে জন্ম নিয়েছে আধুনিক ভারত। একটা মসজিদ বা মাজার ভেঙে তুমি দিতেই পারো, কিন্তু ভারতের বহু প্রাচীন সভ্যতা অত ঠুনকো নয় যে, শাসকের মর্জিতে তা ভেঙে যাবে। শঙ্খ ঘোষ একবার কথায় কথায় বলেছিলেন, নদীর জলে যদি চাঁদের ছায়া দেখে তোমার মন নেচে ওঠে, ওটিই কবিতা। তুমি নিশ্চিত কবি। স্বদেশ প্রেমের গাঁথা লিখতে বসে প্রবল জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া কোয়েল নদী বড় আকুল করে। নদী সবসময় হাতছানি দিয়ে ডাকে। জীবনে কম নদী তো দেখা হলো না। গঙ্গা, যমুনা, কীর্তনখোলা, ধরলা, লৌহজং বা তিস্তা, কোয়েল। বস্তারের শঙ্খিনী, সুন্দরবনের গোমরের জলে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে দেশ দেখি। বন্যায় ভেসে যাওয়া মানুষের ছিন্নবিচ্ছিন্ন বসত দেখি। পদ্মাপাড়ের ভাঙন আর মুর্শিদাবাদের ভাঙন একইভাবে কান্নার কাহিনি শোনায়। পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার ধু-ধু খরা না দেখলে জীবন বৃথা।

সরকারের বদল হয়। মানুষের জীবনবৃত্তান্তে খুব কম বদল ঘটে। সব মানুষের মধ্যে একজন ‘যাযাবর’ লুকিয়ে থাকে। যে ‘যাযাবর’ একই সঙ্গে পাঁচতারা হোটেল ও ফুটপাতের জীবন দেখে। কলকাতায় ছাব্বিশ জানুয়ারি লকার মাঠ ও ধাপার জঞ্জালের ডেরায় মানুষ স্বাধীনতা খোঁজে। টিভিতে দিল্লির প্রজাতন্ত্র দিবসে প্রধানমন্ত্রী  সৈন্য বাহিনীর অভিবাদন নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ক্লাবে ক্লাবে সন্ধ্যা আসর জমজমাট হয়। রাত বাড়ে। শীতের হাল্কা কুয়াশা ঢেকে দিতে থাকে শহর কলকাতাকে। একদা ব্রিটিশ কলোনি স্মৃতিচারণ করতে থাকে। কবরের ফুল আরও শুকিয়ে যায়। মধু কবি নীরবে শায়িত থাকেন পার্ক স্ট্রিট সিমেট্রিতে। সেন্ট জর্জ চার্চের ঘণ্টা বাজতে থাকে। চিৎপুরে নাখোদা মসজিদের ইমাম ফুটপাত ধরে হাঁটতে থাকেন হনহনিয়ে। শিয়ালদহ কোলে মার্কেটের সবজি ব্যবসায়ীদের ট্রেন ধরার তাড়া নজর কাড়ে। বাবু ও বেবুশ্যে ভোররাতে ঘুমোতে গেলেন। পতাকা সগর্বে উড়তে থাকে। শব্দ করে চলে যায় ঘোড়ার খুরের পদধ্বনি। ছাব্বিশ জানুয়ারি দেশের মতো শহর কলকাতাও ভাগ হয়ে যায়। এলিট কলকাতা ব্যস্ত থাকে খানাপিনা, মচ্ছব ও হাসি-হুল্লোড়ে। দরিদ্র ছুটতে থাকে জীবিকার পেছনে। ট্যুরিস্ট স্পটে ভিড় থিকথিকে। চিড়িয়াখানা, জাদুঘর, সায়েন্স সিটিতে উপচে ওঠে মানুষ। অদৃশ্য হয়ে যায় রিপন স্ট্রিটের আবুল হাশেমের বাসা। মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে কাওয়ালি বসবে সন্ধ্যাবেলায়। পাশের রাস্তার সাদামাটা ভাড়া বাসায় কাজী নজরুল ইসলাম ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লিখে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে  গিয়েছিলেন। আপনার ছাব্বিশ জানুয়ারি আর আমজনতার ছাব্বিশ জানুয়রির মধ্যে তফাত অনেক। আপনারটা ভাবগম্ভীর, আমজনতার স্বতঃস্ফূর্ত। আর আমার কাছে ‘দেশ’ বলতে নির্দিষ্ট কোনো ভূগোল নয়। নদী, পাহাড়, অরণ্য, মরুভূমি জনপদ আর অসংখ্য সাধারণ জনতা। তারাই ইতিহাসের আসল চালিকাশক্তি।

লেখক: ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

 [email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত