অ্যান্ড দ্য অস্কার গোজ টু

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০২৫, ০৭:৪৮ এএম

অস্কার পুরস্কার, আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচিত ‘অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস’ হলো বিশ্ব চলচ্চিত্র শিল্পের সর্বোচ্চ ও মর্যাদাপূর্ণ সম্মান। ১৯২৯ সাল থেকে শুরু হওয়া এই পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানটি বর্তমানে শুধু সিনেমা নয়, পুরো বিনোদনজগতে অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। এ বিষয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব

বছর বছর হলিউডে অস্কার নামে যে পুরস্কার দেওয়া হয় তার কথা কমবেশি সবাই জানে। পুরস্কারটির নাম কিন্তু ‘অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড অব মেরিট’। যে পদকটি দেওয়া হয় সেটা হলো ‘অস্কার’। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরস্কার ও পদক দুটোই পরিচিত এখন অস্কার নামে। এ বছর ৯৭তম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠিত হবে ২ মার্চ লস অ্যাঞ্জেলেসের ডলবি থিয়েটারে।

অস্কার নামটি কোথা থেকে যে এলো তা নিয়ে কেউ সঠিকভাবে বলতে পারে না।

একবার নাকি অ্যাকাডেমি লাইব্রেরিয়ান মার্গারেট হারিক এই পুরস্কার দেখে বলেছিলেন এই পদকের মানুষটি দেখতে তার চাচা অস্কারের মতো, সেই থেকে এই নামকরণ। ১৯৩৯ সাল থেকে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড অব মেরিটকে অস্কার নামে ডাকা শুরু হয়ে যায়।

অস্কারের শুরু

অস্কারের যাত্রা শুরু হয়েছিল এক ডিনার টেবিলে। এমজিএম স্টুডিওর প্রধান লুই বি. মেয়ার তার বাড়ির ডিনার টেবিলে বসে এক সন্ধ্যায় আলোচনা শুরু করেন অতিথি অভিনেতা কনরাড ন্যাগেল, পরিচালক ফ্রেড নিবলো এবং প্রযোজক ফ্রেড বিটসনের সঙ্গে। চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য একটি অনন্য প্ল্যাটফর্ম তৈরির ভাবনা তখনই জন্ম নেয়। এই আলোচনা থেকেই সিদ্ধান্ত হয়, সিনেমার প্রতিটি সৃজনশীল শাখার প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি বড় সভা ডাকা হবে।

১৯২৭ সালের ২১ জানুয়ারি লস অ্যাঞ্জেলেসের অ্যাম্বাসেডর হোটেলে সিনেমা জগতের ৩৬ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি একত্রিত হন। সেখানে তারা ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস’ নামে একটি অলাভজনক সংস্থা গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। কাজ শুরু হয় দ্রুতগতিতে এবং এক সপ্তাহের মধ্যেই সংস্থাটি সরকারি অনুমোদন লাভ করে। সেই উদযাপনে আয়োজন করা হয় এক বৃহৎ ভোজসভা, যেখানে ৩০০ জন আমন্ত্রিত অতিথির মধ্যে ২৩০ জন সদস্যপদ নেন, জনপ্রতি ১০০ ডলার চাঁদা দিয়ে। সংস্থার প্রথম অনারারি সদস্য হন থমাস এডিসন আর প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ডগলাস ফেয়ারব্যাঙ্কস।

সংস্থার প্রথম অফিস ছিল ৬৯১২ হলিউড বুলেভার্ডে। পরে হলিউড বুলেভার্ডের বিভিন্ন স্থানে অফিসটি স্থানান্তর করা হয়। সেই ডিনার টেবিলের স্বপ্ন আজ বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত চলচ্চিত্র পুরস্কার অনুষ্ঠানের ভিত্তি তৈরি করেছে।

প্রথম অস্কার আসর বসেছিল ১৯২৯ সালের ১৬ মে, রুজভেল্ট হোটেলের এক জমকালো পরিবেশে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ২৭০ জন নামিদামি অতিথি। সেই সময়ে অনুষ্ঠানটি নিয়ে আজকের মতো তেমন কোনো উত্তেজনা বা জল্পনা ছিল না। টিকিটের মূল্য ছিল মাত্র ৫ ডলার। এটি একটি ব্যক্তিগত ডিনারের মাধ্যমে আয়োজিত হয়েছিল। সেই সময় পুরস্কারজয়ীদের নাম আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল এবং পুরো অনুষ্ঠান মাত্র ১৫ মিনিট স্থায়ী ছিল। প্রথম সেরা ছবির পুরস্কার পেয়েছিল ‘উইংস’, যা ছিল একটি নির্বাক চলচ্চিত্র। প্রথম বছরটা ছিল অদ্ভুত; পুরস্কারপ্রাপ্তদের নাম তিন মাস আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরের বছর অ্যাকাডেমি বুঝতে পারল, চমক ছাড়া এই পুরস্কারের মানে কোথায়? প্রথম অস্কার অনুষ্ঠানে কোনো চমক ছিল না। তবে দ্বিতীয় আসর থেকে নিয়মে বদল আনা হয়। বিজয়ীদের নাম পত্রিকাগুলোর কাছে মুখবন্ধ খামে জমা দেওয়া হতো, যা তারা পুরস্কার বিতরণীর ঠিক পরেই প্রকাশ করতে পারত। এই নিয়ম টিকেছিল ১৯৪০ সাল পর্যন্ত। কিন্তু ১৯৪০ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসের বিকেলের সংস্করণে আগেভাগেই প্রকাশ হয়ে গেল পুরস্কারপ্রাপ্তদের নাম! সে এক বিশাল বিতর্ক তৈরি করে। অ্যাকাডেমি এরপর থেকে কঠোর সিদ্ধান্ত নিল। ১৯৪১ সাল থেকে ঠিক করা হলো, পুরস্কারপ্রাপ্তদের নাম জানা যাবে একমাত্র তখনই, যখন মঞ্চে খামের মোড়ক খুলে পড়া হবে। আজ অবধি সেই খাম খোলার মুহূর্তের রোমাঞ্চ রয়ে গেছে কোটি দর্শকের হৃদয়।

১৯২৯ সালে প্রথম অস্কার পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল মোট ১৫টি ক্যাটাগরিতে। সেরা অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছিলেন জার্মান অভিনেতা এমিল জ্যানিংস। তবে এক মজার ঘটনাÑ জ্যানিংসকে দেশে ফিরে যেতে হয়েছিল পুরস্কার অনুষ্ঠানের আগেই। তাই তার পুরস্কারটি অনুষ্ঠানের আগেই বিশেষ বিবেচনায় নির্মাণ করে তাকে দিয়ে দেওয়া হয়। ফলে ইতিহাসের প্রথম অস্কার পদক বিশেষভাবে তৈরি হয়েছিল এমিল জ্যানিংসের জন্য। প্রথম পুরস্কার অনুষ্ঠানটি তেমন কোনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল না। কিন্তু দ্বিতীয় বছর থেকেই এটি ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হতে শুরু করে। পত্রিকা আর বেতারকেন্দ্রগুলো একে রঙিন গল্পে ভরিয়ে তুলল। লস অ্যাঞ্জেলেস রেডিও দ্বিতীয়বারের অনুষ্ঠানটি এক ঘণ্টার লাইভ সম্প্রচারে নিয়ে আসে। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত থেকেই অস্কারের সরাসরি সম্প্রচার শুরু হয়। ১৯৫৩ সালে অস্কারের যাত্রা পৌঁছে টেলিভিশনের পর্দায়। একটি ছোট্ট রেডিও সম্প্রচার থেকে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠান এখন বিশ্বের শতাধিক দেশের টিভি পর্দায় সরাসরি সম্প্রচারিত হয়। বহু বছর পেরিয়ে এটি হয়ে উঠেছে বিশ্ব জুড়ে কোটি দর্শকের জন্য এক অনবদ্য রাত্রির আবেগময় উদযাপন। প্রথম আসর তেমন আলোচনার জন্ম না দিলেও ধীরে ধীরে এর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। লস অ্যাঞ্জেলেস রেডিও স্টেশন এগিয়ে আসে অনুষ্ঠানটির সরাসরি সম্প্রচারের উদ্যোগ নিয়ে। ১৯৫৩ সালে প্রথমবার অস্কার সরাসরি টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয় (সাদা-কালোতে)। এরপর ১৯৬৬ সালে দর্শকরা প্রথমবারের মতো অস্কার অনুষ্ঠান রঙিন টেলিভিশনে দেখতে পান। বর্তমানে এটি বিশ্বের ২০০টিরও বেশি দেশে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়। বর্তমানে অস্কার সম্প্রচারের একচেটিয়া স্বত্বাধিকার রয়েছে এবিসি টিভি নেটওয়ার্কের হাতে।

অস্কারের খুঁটিনাটি

২০১০ সাল থেকে অস্কার মঞ্চে বিজয়ীদের আবেগপ্রবণ বক্তৃতায় লাগাম টানার জন্য এক অভিনব নিয়ম চালু করা হয়। বিজয়ীদের অনুভূতি প্রকাশের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয় মাত্র ৪৫ সেকেন্ড। সময় পেরিয়ে গেলেই অর্কেস্ট্রা সুর তুলে সংকেত দিতে থাকেÑ ‘সময় শেষ!’ যদি এই সংকেতেও কেউ থামতে না চান, তবে টেলিপ্রম্পটারে সতর্ক বার্তা ভেসে ওঠে। তাতেও যদি বক্তা অনমনীয় থাকেন, তবে প্রযোজকদের শেষ অস্ত্র হলো মাইক্রোফোনের সংযোগ কেটে দেওয়া।

অস্কারের ৮০ বছরের ইতিহাসে মাত্র তিনবার আসর বাতিল করা হয়েছেÑ তিনটি ঘটনাই ছিল অনাকাক্সিক্ষত এবং দুঃখজনক।

প্রথমবার বাতিল হয় ১৯৩৮ সালে, যখন লস অ্যাঞ্জেলেসের ওপর দিয়ে ভয়াবহ বন্যা বয়ে যায়। পুরো শহর কার্যত থমকে গিয়েছিল, জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অস্কার অনুষ্ঠান স্থগিত করতে বাধ্য হয় কমিটি।

দ্বিতীয়বার বাতিল হয় ১৯৬৮ সালে। ৮ এপ্রিল থেকে অনুষ্ঠানের সময়সূচি পিছিয়ে ১০ এপ্রিল করা হয়। কারণ ঠিক তার আগে ড. মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। ৯ এপ্রিল ছিল তার শেষকৃত্য। তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে অস্কার আয়োজন স্থগিত করা হয়।

তৃতীয়বার ১৯৮১ সালে, যখন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের ওপর আততায়ীর হামলার চেষ্টা হয়। নিরাপত্তাজনিত কারণে অনুষ্ঠান ২৪ ঘণ্টার জন্য পিছিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের সময় অনেক দেশের মিডিয়া মার্কিনিদের হামলার প্রতিবাদে অস্কার অনুষ্ঠান বয়কট করে। যদিও অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হয়নি, তবুও এটি ছিল এক ব্যতিক্রমী বছর, যখন বিশ্বব্যাপী অস্কারের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ পায়। এই ঘটনাগুলো অস্কারের ইতিহাসে যেমন দুঃখজনক, তেমনি সময়ের প্রতিচ্ছবি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।

অস্কার স্ট্যাচু হলো চলচ্চিত্র জগতের সম্মানের প্রতীক। এর উচ্চতা সাড়ে ১৩ ইঞ্চি এবং এটি তৈরি করা হয়েছে সোনার প্রলেপযুক্ত ব্রিটানিয়াম দিয়ে। স্ট্যাচুটি সোজা ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে, যা চলচ্চিত্র শিল্পের দৃঢ়তা ও সৃজনশীলতাকে প্রকাশ করে।

১৯৮৯ সালের অস্কার থেকে ঐতিহ্যবাহী বাক্য ‘অ্যান্ড দ্য উইনার ইজ...’ পরিবর্তন করে বলা শুরু হয় ‘অ্যান্ড দ্য অস্কার গোস টু...’। এই পরিবর্তন প্রতিযোগিতার চেয়ে উদযাপনের বার্তা দিতেই আনা হয়। চলচ্চিত্র জগতের কিংবদন্তি ওয়াল্ট ডিজনি জীবদ্দশায় অসাধারণ এক রেকর্ড গড়েন। তিনি অস্কারে সর্বাধিক ৫৯ বার মনোনীত হন এবং ৩২ বার পুরস্কার জেতেন। এই রেকর্ড আজও ভাঙা সম্ভব হয়নি। ১৯৫০ সালের পর থেকে একটি বিশেষ চুক্তি অনুযায়ী অস্কার বিজয়ীরা তাদের প্রাপ্ত মূর্তি বিক্রি করতে পারেন না। এই চুক্তি অনুযায়ী, যদি কেউ মূর্তি বিক্রি করতে চান, তবে তা ১ মার্কিন ডলারে অ্যাকাডেমির কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। তবে এই শর্ত ১৯৫০ সালের আগে বিজয়ীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এরই সুযোগ নিয়ে ১৯৯২ সালে হ্যারল্ড রাসেল, যিনি সেরা পার্শ্ব অভিনেতার জন্য অস্কার জিতেছিলেন, তার মূর্তিটি ৬০,৫০০ মার্কিন ডলারে বিক্রি করেছিলেন স্ত্রীর চিকিৎসার খরচ মেটাতে।

২০২০ সালে, দক্ষিণ কোরিয়ার সিনেমা ‘প্যারাসাইট’ ছিল প্রথম ইংরেজি ব্যতীত অন্য  ভাষার সিনেমা, যা সেরা ছবির অস্কার জিতেছিল।

ক্যাথরিন হেপবার্ন হলেন সর্বাধিক সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পাওয়া ব্যক্তিত্ব। তিনি মোট চারবার এই পুরস্কার জিতেছেন। ১৯৯৭ সালের ‘টাইটানিক’ সিনেমাটি ১১টি অস্কার জিতেছিল। এটি সর্বাধিক অস্কারজয়ী সিনেমাগুলোর মধ্যে অন্যতম। ‘লালা ল্যান্ড’, ‘ইভা অল অ্যাবাউট’ এবং ‘টাইটানিক’ এরা প্রত্যেকেই ১৪টি মনোনয়ন পেয়েছে।

অস্কার প্রত্যাখ্যান

এখন পর্যন্ত তিনজন বিজয়ী অস্কার পুরস্কার গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

ডুডলি নিকোলস (১৯৩৫) : ‘দ্য ইনফরমার’ ছবির জন্য সেরা চিত্রনাট্যকারের পুরস্কার পেলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি। অ্যাকাডেমি এবং রাইটার্স গিল্ডের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে তিনি অনুষ্ঠান বর্জন করেছিলেন।

জর্জ সি. স্কট (১৯৭০) : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জেনারেল জর্জ এস. প্যাটনের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেতার পুরস্কার জেতার পরও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ তিনি প্যাটনের চরিত্রকে ঘৃণা করতেন এবং বিশ্বাস করতেন পুরস্কার অনুষ্ঠান একটি ‘মাংসের প্রদর্শনী’।

মার্লন ব্রান্ডো (১৯৭২) : ‘দ্য গডফাদার’ ছবির জন্য সেরা অভিনেতার পুরস্কার জিতেও তা গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি নেটিভ আমেরিকানদের প্রতি হলিউডের বৈষম্যের প্রতিবাদ জানান। তার পক্ষে নেটিভ আমেরিকান কর্মী স্যাচিন লিটলফিদার মঞ্চে এসে তার অস্বীকৃতির বক্তব্য দেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত