ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ মূলনীতি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির খুঁটিনাটি তো পরিবর্তন করবেই, পাশাপাশি এর ফলে আমেরিকার সীমানার বাইরে বসবাস করা কোটি মানুষের জীবনও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হবে। প্রধান প্রধান আন্তর্জাতিক ইস্যুর ক্ষেত্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হতে পারে? নির্বাচনী প্রচারণার সময় বিভিন্ন বক্তব্যে ট্রাম্প বারবার বলেছেন যে, তিনি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ একদিনের মধ্যে শেষ করতে পারবেন। যদিও সেটি ঠিক কীভাবে করবেন সে বিষয়ে বিস্তারিত কখনোই খোলাসা করেননি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে যে কোটি কোটি ডলার অনুদান দিয়েছে, ট্রাম্প সবসময়ই তার কড়া সমালোচক ছিলেন। সম্প্রতি বলেছেন যে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন তার সঙ্গে দেখা করতে চান এবং ট্রাম্পের সহযোগীরা ঐ বৈঠকের প্রস্তুতি সম্পন্ন করছেন।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানিসহ ৩২টি দেশের সামরিক জোট নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন বা ন্যাটো বহুদিন ধরেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের চক্ষুশূল। তিনি প্রথম দফায় প্রেসিডেন্ট থাকাকালে হুমকি দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটো থেকে প্রত্যাহার করে নেবেন, যদি ন্যাটো সদস্যরা তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নিজ নিজ দেশের জিডিপির দুই শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় না করে। সে সময় তিনি এও বলেছিলেন, কোনো দেশ যদি প্রতিরক্ষা খাতে তাদের প্রতিশ্রুত অর্থ ব্যয় না করে, তাহলে তারা আক্রমণের শিকার হলেও যুক্তরাষ্ট্র তাদের সহায়তা করবে না। মিশেল ওবামা নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠান কেন বর্জন করেছেন, তা নিয়ে খুব বেশি ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না। স্পষ্টতই এই সাবেক ফার্স্ট লেডি ট্রাম্পকে পছন্দ করেন না। কারণ, ট্রাম্প একজন বর্ণবাদী ও নারীবিদ্বেষী। ইউরোপের অনেক মার্কিন মিত্রদেশও যদি পারত, তাহলে ট্রাম্পকে বর্জন করত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আগামী চার বছর ট্রাম্পকে নিয়েই চলতে হবে। ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর জরিপে দেখা গেছে, চীন, ভারত, রাশিয়া, সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলে ট্রাম্পের ফিরে আসাকে স্বাগত জানানো মানুষের সংখ্যা তাকে প্রত্যাখ্যানকারীদের চেয়ে বেশি।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চার্লস কাপচান মনে করেন, ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি কোনো নির্দিষ্ট নীতি বা আদর্শের ধার ধারে না। ফলে তার পররাষ্ট্রনীতি ভালো বা খারাপ, যেকোনো দিকেই যেতে পারে। এ অবস্থায় ট্রাম্পকে সঠিক পথে চালিত করা, তার সঙ্গে কৌশলে কাজ করা এবং তার খারাপ সিদ্ধান্তগুলোর প্রভাব কমানোটাই বিদেশি নেতাদের আসল কাজ হবে। ট্রাম্প ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। বলেছেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ইউক্রেনকে কেন ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা দেন, তা তিনি বোঝেন। ট্রাম্প দাবি করে আসছেন, তিনি ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ থামিয়ে দিতে পারেন; তবে এর জন্য ইউক্রেনকে হয়তো কিছু অঞ্চল রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দিতে হবে এবং রাশিয়াকেও তার আগ্রাসনের পুরস্কার হিসেবে সেটি মেনে নিতে হবে। অনেকে বলছেন, ট্রাম্প হয়তো ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়া বন্ধ করার বদলে আরও বাড়িয়ে দিতে পারেন, যাতে কিয়েভ ভবিষ্যৎ আলোচনায় শক্ত অবস্থানে থাকতে পারে। আসলে এ মুহূর্তে ইউরোপের নেতারা ও ট্রাম্পবিরোধীরা শুধু দর্শকের ভূমিকায় আছেন। যদি সবকিছু খারাপের দিকে যায়, তাহলে ট্রাম্প বিজয়ী হবেন। আর তা হলে তিনি হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে থাকবেন, পুরনো মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন, দেশে-বিদেশে গণতন্ত্রকে অবহেলা করবেন এবং স্বৈরশাসকদের প্রশ্রয় দেবেন। যদি তাই হয়, তাহলে কে তাকে সামলাবে?
ইরানের বিরুদ্ধে তৎকালীন ট্রাম্প প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিয়েছিল। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু চুক্তি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়, ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা বাড়ায় ও ইরানের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী সামরিক কমান্ডার জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করে। সমালোচকদের অনেকের মতে, ট্রাম্পের নীতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি কিছুটা অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে ও এর ফলে ফিলিস্তিনিরা কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। গাজায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করার পর ট্রাম্প বলেন, তিনি আব্রাহাম অ্যাকর্ডের ভিত্তিতে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তিপ্রয়োগ করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করবেন। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এর অর্থ সৌদি আরব আর ইসরায়েলের মধ্যে সমঝোতা স্থাপন করার চেষ্টা করবেন তিনি। ট্রাম্প প্রথম দফায় ক্ষমতায় থাকাকালে চীনের সঙ্গে একপ্রকার বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। এই দফায়ও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে চীনা পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কর আরোপ করবেন। ট্রাম্প জলবায়ু পরিবর্তনের ধারণার বিরোধী হিসেবে পরিচিত। গ্রিন এনার্জি বা পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ধারণাকে এর আগে জালিয়াতি হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হওয়া বৈশ্বিক জলবায়ু কার্যক্রমের জন্য হুমকি স্বরূপ।
যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নিলেই যে মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়া সম্ভব অর্থাৎ জন্মসূত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বের বিধান সেই নীতিও পরিবর্তন করার লক্ষ্য আছে নতুন প্রেসিডেন্টের। অন্যদিকে, পণ্য ও মালামাল পরিবহনের পথ পানামা খাল অতিরিক্ত ব্যয়বহুল এবং এই পথ দিয়ে পণ্য পরিবহনের খরচ না কমলে যুক্তরাষ্ট্র পানামা খালের দখল নিয়ে নেবে বলেও মন্তব্য করেছিলেন ট্রাম্প। যদিও যুক্তরাষ্ট্র হয়তো এই দুই অঞ্চলের একটিরও নিয়ন্ত্রণ নেবে না, তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য আর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ মূলনীতির অর্থ হলো- যুক্তরাষ্ট্র তাদের সীমানার বাইরে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন চালিয়ে যাবে।
লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক