৪০তম বিসিএসের ৬৬ জন সহকারী পুলিশ সুপারের (এএসপি) প্রশিক্ষণ শেষ হয়েছে তিন মাস আগে। কিন্তু তাদের কর্মক্ষেত্রে যোগদানের অংশ হিসেবে পাসিং আউট বা সমাপনী কুচকাওয়াজের দিন নির্ধারিত হয়নি আজও। দুই দফায় পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে পাসিং আউটের তারিখ। নতুন তারিখ কবে তা জানা নেই কারও।
ইতিমধ্যে তাদের ২৫ জনকে বিশৃঙ্খলার কারণ (এলোমেলোভাবে হাঁটা, হইচই করা) দেখিয়ে শোকজ করা হয়েছে। চাকরিতে যোগদানের শেষমুহূর্তে আবার তাদের বায়োডাটা নিরীক্ষণ করা হয়েছে। পাসিং আউটের তারিখ ঠিক হলে ৪১ জন তাদের কর্মক্ষেত্রে যাবে; কিন্তু ২৫ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এএসপির কী হবে?
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কারণ দর্শানোর নোটিসপ্রাপ্ত ২৫ জন এএসপির ৪ জনকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। বাকি ২১ জনকে বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা চলছে।
২১ জনের মধ্যে কিছু এএসপির আত্মীয়স্বজন আওয়ামী লীগের মতাদর্শী বা সমর্থক বলে তথ্য পাওয়া গেছে। আবার অনেকের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই; তাদের কেউ ছাত্রজীবনে মিছিল-মিটিংও করেননি অথচ তাদেরও বাদ দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যাদের স্বজনরা আওয়ামী লীগের মতাদর্শী বা সমর্থক তাদের সংখ্যা খুব কম। ওই এএসপিদের স্বজনরা প্যারেডে এলোমেলোভাবে হাঁটা ও হইচই করার মতো ঠুনকো অভিযোগে শোকজ করা হয়েছে উল্লেখ করে বিষয়টিকে মানবিক দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ জানিয়েছেন। গত ৪ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও পুলিশের আইজির কাছে ন্যায়বিচার চেয়ে লিখিত আবেদনও জানিয়েছেন তারা।
আবেদন করার ২০ দিন পরও অগ্রগতি দেখছেন না কারণ দর্শানোর নোটিস পাওয়া প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এএসপিরা। তারা মনে করছেন, এভাবে দিনের পর দিন চলতে থাকলে বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হবে এবং যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কারণ দীর্ঘদিন পরিবার থেকে দূরে থাকার কারণে মানসিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে কারও কারও মধ্যে।
একাধিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এএসপি দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, নির্ধারিত সময়ের চেয়ে তিন মাসের বেশি পেরিয়ে গেলেও পাসিং আউট না হওয়ায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় সময় পার করছেন তারা। কয়েকজন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। স্বজনের মৃত্যু হলেও বাড়ি যেতে পারছেন না তারা। তাদের মধ্যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছে।
৪০তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি হয় ২০১৮ সালে। সব প্রক্রিয়া শেষে ২০২২ সালের ১ নভেম্বর ৪০তম বিসিএসের ১ হাজার ৯২৯ জন কর্মকর্তার নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তারা ওই বছরের ৪ ডিসেম্বর চাকরিতে যোগ দেন। লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (পিএটিসিÑ পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ট্রেনিং সেন্টার) ছয় মাসের প্রশিক্ষণ শেষে পুলিশ বাদে বাকি সব ক্যাডারের কর্মকর্তারা এখন চাকরি করছেন। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের সময় ১ হাজার ৯২৯ জন কর্মকর্তার মধ্যে এএসপি ছাড়া সবাই কর্মক্ষেত্রেই ছিলেন। চাকরিরতদের চাকরি এখন স্থায়ী হওয়ার পথে। কিন্তু অভিযোগ তোলা হচ্ছে শুধু পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
২০২৩ সালের ২০ অক্টোবর এএসপিদের মৌলিক প্রশিক্ষণ শুরু হয় সারদা পুলিশ ট্রেনিং একাডেমিতে। এক বছরের মৌলিক প্রশিক্ষণ শেষে ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর তাদের পাসিং আউট প্যারেড হওয়ার কথা। কিন্তু তিন মাস ধরে কর্মস্থলে যোগ দিতে পারছেন না তারা, আটকা পড়েছেন সারদায়।
পাসিং আউটের বিষয়ে পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপাল ও অতিরিক্ত আইজিপি মাসুদুর রহমান ভূঞা গত ২৭ জানুয়ারি সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পাসিং আউটের সঠিক তারিখ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এএসপিদের পাসিং আউট হতে পারে।’ শোকজ করা ২৫ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এএসপির বিষয়ে জানতে চাইলে একাডেমির প্রিন্সিপাল বলেন, ‘শোকজ খাওয়া এএসপিদের তথ্য আমার জানা নেই। শোকজ করার নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। তাদের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ব্যবস্থা নেবেন।’
শোকজ নোটিস পাওয়া একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের ইতিহাসে প্রথম কোটামুক্ত বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বুনিয়াদি ও বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণসহ চাকরি স্থায়ীকরণের সব শর্ত পূরণ করেও উৎকণ্ঠা আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছি। চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগে আমাদের সব ধরনের পুলিশ ভেরিফিকেশন হলেও প্যারেড স্থগিত করার পর জেলার এসপিদের মাধ্যমে আমাদের ব্যাপারে আবার তদন্ত হয়। তদন্তে কোনো সমস্যা না পেয়ে হাস্যকর কারণ দেখিয়ে আমাদের শোকজ করা হয়। এলোমেলো হাঁটা ও মুভি দেখার সময় হইচই করার জন্য কারণ দর্শানোর নোটিস পেয়েছে কয়েকজন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক এএসপি বলেন, আমরা চরম বিপর্যয়ের মুখে আছি। আমাদের সামাজিকভাবে হেয় করা হচ্ছে। সবাই জানে আমরা এএসপি হয়েছি। প্রশিক্ষণ শেষ হয়েছে আরও তিন মাস আগে, এখন যদি আমাদের বাদ দেওয়া হয়, তাহলে আমরা আর ক্যারিয়ার গড়তে পারব না; তখন মনে হবে এ জীবন রাখার চেয়ে না রাখাই ভালো।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের চাকরিতে নিয়োগের আগে ও পরে দুবার পুলিশ ভেরিফিকেশন হয়েছে। ১৬ ধরনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। শোকজের পর আবার শোকজ করা হয়েছে। তাতে কোনো ত্রুটি না পেয়ে বিলম্ব করা হচ্ছে রহস্যজনকভাবে।’
শোকজের ২৫ জন এএসপির বিরুদ্ধে যদি কোনো গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ না থাকে তাহলে চাকরি থেকে তাদের বাদ দেওয়া বেআইনি হবে মনে করছেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলোজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. ওমর ফারুক। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঠুনকো অভিযোগে বাদ দেওয়া আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। তারা একসময় তাদের চাকরি ফেরত পাবেন। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া বা একতরফাভাবে তাদের বাদ দেওয়া হলে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হবে। বিষয়টি দেশ ও জাতির জন্য দুঃখজনক হবে।’
