অতিরিক্ত সম্পদের লোভ মানুষকে অন্ধ বানিয়ে ফেলে। তখন মানুষ ভালো-মন্দের বিচার করতে পারে না। অনেক সময় সম্পদ অর্জনের নেশায় অবৈধ পথে পা বাড়ায়। মানুষের আরও একটি বড় লোভ হলো, পদমর্যাদার লোভ। এই দুটি লোভ সম্পর্কে হাদিসে বর্ণনা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুটি ক্ষুধার্ত বাঘকে যদি বকরির পালের মধ্যে মুক্তভাবে ছেড়ে দেওয়া হয় তারা যেভাবে বকরির পালের বিনাশ করবে, এর চেয়ে একজন মুসলিমের দ্বীনের বেশি বিনাশ করবে তার দুটি খারাপ চরিত্র।
তা হলো সম্পদের লোভ ও পদমর্যাদার লালসা।’ (তিরমিজি)
বাঘ স্বভাবগতভাবেই সুযোগ পেলে বকরির পাল খেয়ে বিনাশ করবে। তার ওপর যদি বাঘ ক্ষুধার্ত হয় এবং উন্মুক্তভাবে ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে বকরির পালের কী সর্বনাশই না করবে। তদ্রƒপ রাসুলুল্লাহ (সা.) এ উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েছেন, সম্পদ ও পদমর্যাদার লোভ হলো ক্ষুধার্ত বাঘের মতো। ক্ষুধার্ত বাঘগুলো যেভাবে বকরির পালের বিনাশ করে ছাড়বে, তেমনি এই দুই চরিত্রও একজন মুসলিমের দ্বীন ও ইমানের সর্বনাশ করে ছাড়ে।
আত্মমর্যাদাবোধ ও অহংকার এক নয়। তবে একটি কথা বুঝতে হবে, হাদিসে ‘হুব্বে জাহ’- এর অর্থ বলা হয়েছে ‘সম্মান ও পদমর্যাদার লোভ।’ আর লোভ কাকে বলা হয়? তা হচ্ছে পদমর্যাদা অর্জনের প্রতি সীমাতিরিক্ত লালসা। তবে কিছু অবস্থা ও প্রেক্ষাপট এ বিধান থেকে ব্যতিক্রম। হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘কেয়ামত কখন সংঘটিত হবে?’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘যখন আমানত হারিয়ে যাবে, তখন তুমি কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার অপেক্ষা করো।’ সাহাবি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমানত কীভাবে হারিয়ে যাবে?’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘যখন কোনো দায়িত্ব অনুপযুক্ত ব্যক্তিকে ন্যস্ত করা হবে, তখন তুমি কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার অপেক্ষা করো।’ (সহিহ বুখারি)
এখন যদি কোনো এমন দ্বীনি কাজ সামনে আসে, যা আমি সুন্দরভাবে আঞ্জাম দিতে সক্ষম হব এবং সেখানে আর অন্য এমন কেউ নেই, যে তা ভালোভাবে আঞ্জাম দিতে পারে, তখন যদি কেউ আল্লাহর ওপর ভরসা করে ওই দায়িত্ব গ্রহণ করে, তাহলে কোনো অসুবিধা নেই।
যেমন কোনো মসজিদে নামাজের সময় পৌঁছে দেখলেন যে সেখানে নামাজের ইমামতি করার মতো অন্য আলেম বা কারি উপস্থিত নেই, তাহলে এখানে বিনয় অবলম্বনের প্রয়োজন নেই; বরং বলে দিন আপনারা দাঁড়ান, আমি নামাজ পড়িয়ে দিচ্ছি।
কেননা এখানে সবার নামাজের বিশুদ্ধতার বিষয় রয়েছে। এজন্যই ইউসুফ (আ.) মিসরের বাদশাহের সামনে অকপটে বলেছেন, ‘আমাকে ফসলাদি সংরক্ষণ-সংক্রান্ত দায়িত্ব দিন, আমি এ বিষয়ে আমানতদার ও সঠিক জ্ঞান রাখি।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত ৫৫)
এখানে পুরো জাতির অস্তিত্ব সংকট তৈরি হয়েছে। তাই এই প্রয়োজন সামনে রেখে তিনি তার যোগ্যতা প্রকাশ করেছিলেন। এটি তিনি করেছিলেন নিজের পদমর্যাদার লোভে নয়; বরং ওই দেশে অবস্থিত সব প্রাণীকে আগত মসিবত ও সংকট থেকে উত্তরণ ও রক্ষার জন্য। তদ্রুপ সুলাইমান (আ.) আল্লাহর কাছে আবেদন করেছিলেন, ‘হে আমার প্রতিপালক, আমাকে ক্ষমা করো এবং এমন রাজত্ব দান করো যেমনটি আমার পরে আর কারও জন্য সমীচীন নয়।’ (সুরা সোয়াদ, আয়াত ৩৫)
ফলে আল্লাহ তাকে এমনই রাজত্ব দান করেছিলেন, তার রাজত্ব জলে-স্থলে, আকাশে-বাতাসে ও প্রাণিজগৎসহ সব সৃষ্টির রাজত্ব দান করেছিলেন। তাই কোথাও যদি এমন কোনো দ্বীনি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সামনে এসে যায়, যা নিজের প্রবৃত্তি পূরণের নিয়ত না হয় এবং তা গ্রহণ না করার কারণে দ্বীনের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে নিজে তা গ্রহণ করার আবেদন করা যাবে।
