শুরু হয়েছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০২৫। বইপ্রেমীদের জন্য মাসব্যাপী এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে পাঠক, লেখক ও প্রকাশকরা সারা বছর ধরে অপেক্ষা করেন। এ বিষয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব
প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দক্ষিণ প্রান্তে বইমেলার প্রাণবন্ত আবহ ছড়িয়ে পড়ে। এটি শুধু বই কেনাবেচার স্থান নয়; বরং লেখক, পাঠক, প্রকাশক, ক্রেতা ও বিক্রেতার এক মিলনমেলা।
আমাদের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠা এই মেলাকে ভালোবাসায় সবাই ‘প্রাণের মেলা’ বলে অভিহিত করেন। যা কেবল একটি আয়োজন নয়, বরং বাঙালির ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসার প্রতিচিত্র।
একুশে গ্রন্থমেলা ২০২৫
বইমেলায় এ বছরের থিম ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান : নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ’। এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে অমর একুশে বইমেলা ২০২৫ শুরু হয়েছে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে। মেলা বসেছে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। বাংলাদেশের সাহিত্য এবং সাহিত্য বাণিজ্যের জন্য এই বইমেলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিশেষ। গত বছরের তুলনায় এবার মেলায় আরও বেশি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে। মেলায় বাড়ানো হয়েছে স্টলের সংখ্যা। অংশ নিচ্ছে ৭০৮টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৬৩৫। স্টল বরাদ্দের জন্য লটারি ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে বড় বড় প্যাভিলিয়ন থেকে শুরু করে শিশুদের জন্য আলাদা ইউনিটও রাখা হয়েছে। বইমেলায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৯৯টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৬০৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে। মোট ৩৭টি প্যাভিলিয়নের মধ্যে ৩৬টি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে, আর ১টি থাকবে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। বইমেলা ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলবে। তবে রাত ৮টা ৩০ মিনিটের পর নতুন দর্শনার্থীদের প্রবেশ বন্ধ থাকবে। ছুটির দিনে মেলা বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। ২১ ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে মেলা সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলবে।
বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে থাকবে আলোচনাসভা, কবিতা পাঠের আসর ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
বইমেলায় প্রকাশনা ও বিন্যাস
এবারের বইমেলার বিন্যাস আগের মতোই রাখা হয়েছে, তবে কিছু আঙ্গিকগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ করে মেট্রোরেল স্টেশনের কারণে মেলার বের হওয়ার পথ পরিবর্তন করে মন্দির গেটের কাছাকাছি সরিয়ে আনা হয়েছে। মেলায় চারটি প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ থাকছে। টিএসসি, দোয়েল চত্বর, এমআরটি বেসিং প্ল্যান্ট এবং ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন। খাবারের স্টলগুলো ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সীমানা ঘেঁষে সাজানো হয়েছে এবং এবার এগুলো আরও সুন্দরভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে। মেলায় নামাজের স্থান, ওয়াশরুমসহ অন্যান্য পরিষেবাও আগের মতো বহাল থাকবে, যাতে দর্শনার্থীরা স্বাচ্ছন্দ্যে মেলায় অংশ নিতে পারেন। মেলায় প্রতি বছরই কিছু বিশেষ পুরস্কার দেওয়ার চল রয়েছে। চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার দেওয়া হয় সেরা বই প্রকাশককে। সরদার জয়েনউদদীন স্মৃতি পুরস্কার স্টল ও অঙ্গ সজ্জায় সেরা অংশগ্রহণকারীদের জন্য। পলান সরকার পুরস্কার সর্বাধিক বই কেনা বইপ্রেমীদের জন্য।
বইমেলার শুরুর গল্প
বাংলাদেশে বইমেলার ধারণাটি প্রথম আসে প্রয়াত কথাসাহিত্যিক সরদার জয়েনউদদীনের মাথায়। তিনি এক সময় বাংলা একাডেমিতে চাকরি করতেন এবং পরে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক হন।
প্রথম বইমেলা : ষাটের দশকের শুরুর দিকে, সরদার জয়েনউদদীন ইউনেসকোর শিশু-কিশোর গ্রন্থমালা উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করছিলেন। প্রকল্পটি শেষ হওয়ার পর, তিনি তৎকালীন কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি) নিচতলায় প্রথম শিশু গ্রন্থমেলা আয়োজন করেন। এটি ছিল বাংলাদেশের প্রথম বইমেলা, যা অনুষ্ঠিত হয় ১৯৬৫ সালে।
নারায়ণগঞ্জ গ্রন্থমেলা : এরপর ১৯৭০ সালে, নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সহযোগিতায় তিনি নারায়ণগঞ্জে আরেকটি বইমেলার আয়োজন করেন। এই মেলায় শুধু বই বিক্রিই নয়, ছিল আলোচনা সভার আয়োজনও। বক্তাদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের তৎকালীন প্রধান অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুল হাই, শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী এবং দার্শনিক ও লেখক সরদার ফজলুল করিম।
মুক্তিযুদ্ধ থেকে একুশে গ্রন্থমেলা
১৯৭২ সালে বইমেলার শুরু। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, প্রথম ফেব্রুয়ারি মাসকে স্মরণীয় করতে চিত্তরঞ্জন সাহা একটু ভিন্ন আয়োজনের পরিকল্পনা করেন। ৮ ফেব্রুয়ারি তিনি বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউজের সামনে, বটগাছের নিচে চটের ওপর সাজিয়ে রাখেন ৩২টি বই। এগুলো ছিল স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশিত বই। এভাবেই অফিসিয়াল ঘোষণা ছাড়াই, একেবারে অনানুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় অমর একুশে বইমেলা! ১৯৭৫ সালে বাংলা একাডেমি প্রথমবার প্রকাশকদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা নির্ধারণ করে। চুনের দাগ দিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে প্রকাশকরা নিজেদের স্টল বানিয়ে বই বিক্রি শুরু করেন। ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত ছিল স্বীকৃতির অভাব। বাংলা একাডেমি বইমেলাকে তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। সংবাদপত্রেও বইমেলার কোনো উল্লেখ ছিল না। এমনকি, বাংলা একাডেমির আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানসূচিতেও বইমেলার নাম ছিল অনুপস্থিত! ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমির নতুন মহাপরিচালক আশরাফ সিদ্দিকী বইমেলার গুরুত্ব বুঝতে পারেন। তার উদ্যোগে বাংলা একাডেমি প্রথমবারের মতো বইমেলার সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়। তখন থেকেই শুরু হয় বইমেলার একটি নতুন অধ্যায়। ১৯৭৯ সালে চিত্তরঞ্জন সাহার প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি বইমেলার সঙ্গে যুক্ত হয়। বাংলা একাডেমি সিদ্ধান্ত নেয়, ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বইমেলা চলবে। বইমেলার আনুষ্ঠানিক নামকরণ করা হয় ‘ একুশে গ্রন্থমেলা’।
১৯৭৯-১৯৮০ সাল অর্থাৎ এই দুবছর ধরে একই নিয়মে ২১ দিনের বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি হঠাৎ করেই ২১ দিনের পরিবর্তে ১৪ দিন মেয়াদ নির্ধারণ করে।
প্রকাশকরা এ সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। ১৯৮২ সাল থেকে আবার ২১ দিন। প্রকাশকদের দাবির মুখে বইমেলার সময়সীমা পুনরায় ২১ দিন করা হয়। মেলার প্রধান উদ্যোক্তা হয় বাংলা একাডেমি। সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে যুক্ত হয় জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ও বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি। বাংলা একাডেমির নতুন মহাপরিচালক কাজী মনজুরে মওলা কিছু পরিবর্তন আনেন ১৯৮৩ সালে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রকে সহযোগী প্রতিষ্ঠান থেকে বাদ দেওয়া হয়। কারণ জানানো হয়নি, তবে বলা হয়েছিল বইমেলাকে নতুনভাবে সাজানোর জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ বছরই বইমেলার নাম বদলে রাখা হয় ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’।
১৯৮৩ সালে বইমেলা বন্ধ হয়ে যায়। তখন চলছিল স্বৈরশাসক এরশাদের শাসনকাল। শিক্ষা ভবনের সামনে ছাত্রদের বিক্ষোভে ট্রাক তুলে দিলে দুজন ছাত্র নিহত হন। সেই বেদনাদায়ক ঘটনার পর বইমেলা স্থগিত হয়ে যায়। ১৯৮৪ সালে বইমেলা নতুন করে রূপ পায়। বাংলা একাডেমি আবার ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’র আয়োজন করে। ১৯৮৩ সালে নতুন নামকরণ করা হলেও ১৯৮৪ সালে তা আনুষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয়। ভাষাশহীদদের প্রতি আরও গভীর শ্রদ্ধা জানাতে মেলার পরিসর আরও বড় করা হয়। প্রকাশকদের সংখ্যা বাড়ায় স্টল সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। পত্রপত্রিকায় ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ নিয়ে নানা প্রতিবেদন প্রকাশিত হতে থাকে। ২০১৪ সালে মেলার পরিসর বড় হয়। প্রকাশকদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় স্টলের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। বাংলা একাডেমি সিদ্ধান্ত নেয়, বইমেলার একটি অংশ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্থানান্তরিত করবে। এর ফলে মেলা আরও বড় ও সুবিন্যস্ত হয়, পাঠক ও প্রকাশকদের জন্য জায়গা বাড়ে।
বইমেলা চলাকালীন প্রতিদিন বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা সভা, কবিতা পাঠের আসর, লেখক আড্ডা এবং নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন করে বাংলা একাডেমি। এ ছাড়া লেখক কুঞ্জে পাঠকদের জন্য লেখকদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ থাকে। এখানে পাঠকরা লেখকদের বই নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করেন এবং মতামত ভাগ করে নেন, যা লেখক-পাঠক সম্পর্ক আরও গভীর করে। বইমেলার তথ্যকেন্দ্র থেকে প্রতিদিন নতুন প্রকাশিত বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের খবর, লেখক ও প্রকাশকের নাম প্রকাশ করা হয়। পাশাপাশি, বিভিন্ন রেডিও ও টেলিভিশন চ্যানেল মেলার মিডিয়া স্পন্সর হিসেবে তাৎক্ষণিক খবর প্রচার করে। বইমেলায় আসা দর্শনার্থীদের অনেক সময় স্টল খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়তে হয়। তবে প্রযুক্তির সহায়তায় এটি এখন সহজেই সমাধানযোগ্য। বাংলা একাডেমির www.ba21bookfair.com ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যে কেউ মোবাইল ব্যবহার করে সহজেই কাক্সিক্ষত স্টলের অবস্থান জানতে পারেন।
এ ছাড়া মেলার প্রতিটি গেটের কাছেই রয়েছে মিডিয়া সেন্টার, যেখানে গিয়ে স্টলের সঠিক অবস্থান জেনে নেওয়া সম্ভব। ফলে ভিড়ের মাঝেও নির্দিষ্ট স্টল খুঁজে না পাওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। প্রতিদিন বিকেল ৪টায় বইমেলার মূল মঞ্চে সেমিনার এবং সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। ৮ ও ১৫ ফেব্রুয়ারি বাদে, প্রতি শুক্রবার ও শনিবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত থাকবে ‘শিশুপ্রহর’।
অমর একুশ উদযাপনের অংশ হিসেবে আয়োজন করা হয়েছে শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগিতা। এ ছাড়া উদ্যানে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের ব্যবস্থাও থাকবে।
জুলাই চত্বর
ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ধারণ করে শুরু হওয়া এবারের বইমেলায় ভাষাশহীদ, ভাষাসংগ্রামী, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে, পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনে আহত ও শহীদদের স্মরণ করা হয়েছে।
আয়োজকদের মতে, এবারের মেলার মূল রঙ নির্ধারণ করা হয়েছে লাল, কালো ও সাদা। লাল বিপ্লবের প্রতীক, কালো শোকের প্রতীক, আর সাদা আশার প্রতীক।
