ক্যানসার চিকিৎসায় উল্টো পথে দেশ, দিন দিন কমছে সক্ষমতা

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৯:০৫ পিএম

এই মুহূর্তে ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসায় ঢাকায় কোনো সরকারি হাসপাতালে রেডিওথেরাপি মেশিন চালু নেই। মাত্র তিনটি হাসপাতালে রেডিওথেরাপি-সংবলিত ক্যানসার সেন্টার থাকলেও সেগুলোর সব মেশিন অকেজো হয়ে পড়ে রয়েছে সর্বনিম্ন পাঁচ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে।

ঢাকার বাইরে মাত্র দুটি সরকারি হাসপাতালে দুটি মেশিন চালু রয়েছে। অর্থাৎ সারা দেশে সরকারি পর্যায়ে বর্তমানে মাত্র দুটি রেডিওথেরাপি মেশিন চালু রয়েছে।

বিশেষ করে দেশের একমাত্র বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালেরও সবগুলো রেডিওথেরাপি মেশিন অকেজো হয়ে পড়ে রয়েছে। এমনকি সারা দেশে সরকারি রেডিওথেরাপি-সংবলিত ক্যানসার সেন্টার রয়েছে মাত্র সাতটি প্রতিষ্ঠানে। এর মধ্যে ঢাকায় তিনটি ও ঢাকার বাইরে চারটি।

এই সুযোগে রেডিওথেরাপি চিকিৎসা এখন পুরোটায় বেসরকারি হাসপাতালের দখলে। বেসরকারি ১২টি হাসপাতালে রেডিওথেরাপি-সংবলিত সেন্টার রয়েছে। এসব সেন্টারে রেডিওথেরাপি মেশিন রয়েছে ২১টি। সরকারি পর্যায়ে রেডিওথেরাপি চিকিৎসার এই চিত্রকে হতাশাজনক বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যানসার বিভাগ (রেডিওথেরাপি বিভাগ) ক্লিনিক্যাল অনকোলজিস্ট ডা. নাজিরুম মুবিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ক্যানসার চিকিৎসায় বাংলাদেশ উল্টো রথের যাত্রী হয়ে গেছে। ২০০৮, ২০০৯, ২০১০ সালে ঢামেক হাসপাতালে লিনাক মেশিন চালু ছিল। থ্রি ডাইমেনশাল রেডিওথেরাপি দেওয়া যেত। ২০২৫ সালে এসে সেই হাসপাতালে কোনো মেশিনই নেই। ফলে সরকারি হাসপাতালগুলোর ক্যানসার চিকিৎসার সক্ষমতা বিগত ১০-১৫ বছরে কমতে কমতে এখন নিঃশেষ হয়ে গেছে। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু সেগুলোতে অন্যান্য রোগের মতো ক্যানসার চিকিৎসাও ব্যয়বহুল। ফলে রোগীরা আসলে চিকিৎসায় পাচ্ছে না। বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে। এটা খুব খারাপ বাস্তবতা।

এই চিকিৎসক বলেন, ‘১০ বছর আগে যে চিকিৎসা দিতে পারতাম, এখন আরও বেশি দেওয়ার কথা। উল্টো আরও কমে গেছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পর্যাপ্ত আছে। আমি ঢামেক হাসপাতালে রোগীদের রেডিওথেরাপি চিকিৎসা দিতে পারছি না। কিন্তু আমার যে রোগীর বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসায় ব্যয় বহন করতে পারে, তাদের বাইরে চিকিৎসা দিচ্ছি।’

এই চিকিৎসক বলেন, ‘অনেকে মনে করে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার লোভে সরকারি মেশিন নষ্ট করে রাখা হয়। এটি সর্বৈব ভুল ধারণা। সরকার আমাকে ঢামেক হাসপাতালে একটি মেশিন দিক, আমি সেখানেও রেডিওথেরাপি দেব। বেসরকারি হাসপাতালগুলো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তি করে। নষ্ট হয়ে গেলে তারা ২৪-৭২ ঘণ্টার মধ্যে ঠিক করে দেয়। কিন্তু সরকারি হাসপাতালে ঠিক হয় না। কারণ চুক্তিপত্র মানা হয় না।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কোনো স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানেই লিনাক মেশিন কেনা হয়নি। কিনেছে কোবাল্ট মেশিন। সেগুলো খুবই নিম্নমানের। এগুলো আমরা ব্যবহার করতাম ১৯৯৩-৯৪ সালে। নতুন মেশিন আমাদের হাতে দেওয়া হয়নি। আবার যেসব কোবাল্ট মেশিন কেনা হয়েছে, সেগুলোও কেনা হয়েছে লিনাক মেশিনের চেয়ে দ্বিগুণ দামে।’

জাতীয় ক্যানসার হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোয়াররফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য একটি ক্যানসার সেন্টার দরকার। সে হিসেবে দেশে ১৮ কোটি মানুষের জন্য সেন্টার লাগবে ১৮০টি। আমাদের সেন্টার আছে ২০-২২টির মতো। এটা খুবই অপ্রতুল।’

এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বাংলাদেশে ১ লাখ ৫৫ হাজারের মতো নতুন ক্যানসার রোগী পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিবছর ১ লাখ ৯ হাজারের মতো রোগী মারা যাচ্ছে। তবে রোগী ও মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

এই চিকিৎসক আরও বলেন, ‘ক্যানসার চিকিৎসার সবকিছুই বাংলাদেশে আছে। মূল চিকিৎসা সার্জারি কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি। এর মধ্যে সার্জারি ও কেমোথেরাপি চিকিৎসা চলছে। কিন্তু মূল সমস্যা রেডিওথেরাপি চিকিৎসায়। একটি রেডিওথেরাপি মেশিনের মেয়াদ ১০ বছর। আমাদের সবগুলো মেশিন পুরনো হয়ে গেছে, অকেজো হয়ে পড়ে রয়েছে। সেগুলো আর মেরামত হয়নি, নতুন কোনো মেশিনও আনা হয়নি। অথচ মোট ক্যানসার রোগীর ৬০ শতাংশেরই জীবনের শেষপর্যায়ে রেডিওথেরাপি চিকিৎসা দরকার হয়।

জাতীয় ক্যানসার হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর কবির বলেন, জাতীয় ক্যানসার হাসপাতালের দুটি নতুন মেশিন এসেছে। একটি দু-এক দিনের মধ্যেই চালু হবে, আরেকটি মার্চে চালু হবে। বাকি যে মেশিনগুলো নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে, সেগুলো এখনো মেরামত করা সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ এখনো এখানে রেডিওথেরাপি চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

এই চিকিৎসক কর্মকর্তা বলেন, সরকার আট বিভাগে আটটি ক্যানসার সেন্টার চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জাতীয় ক্যানসার হাসপাতালে সাতটি মেশিন বসানোর সক্ষমতা আছে। আর বাকি আট বিভাগে তিনটি করে ২৪ মেশিন যদি চালু হয়, তাহলে রোগীদের কষ্ট অনেকটাই লাঘব হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত