ভারতীয় অপতথ্য ইন্ডাস্ট্রি

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০১:৫০ এএম

ইন্টারনেটের যুগে অপতথ্য ভয়াবহ একটি সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। অপতথ্য এমন এক অস্ত্র, যা জাতিগত সংঘাত, হিংসা, অশান্তি তৈরি করে। কোনো কোনো গবেষক মনে করেন বর্তমান দুনিয়ায় অপতথ্যের ভয়াবহতা পরিবেশ দূষণের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। অপতথ্য সমাজকে অস্থিতিশীল এবং কাঠামোগতভাবে একে ক্ষয় করে। আর ইন্টারনেট প্রযুক্তির সুবাদে, তা কেবল নির্দিষ্ট এলাকা বা দেশ নয়, এমনকি দেশের সীমানা পেরিয়ে অপতথ্য এখন আন্তঃদেশীয় হয়ে উঠেছে।

এককালে অপতথ্য বলতে কেবল বোঝানো হতো ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত তথ্য ছড়ানো। কিন্তু অপতথ্য রাজনৈতিক, সামাজিক হাতিয়ার হিসেবে এতটাই কার্যকরী হয়ে উঠেছে যে, অপতথ্য উৎপাদনের ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠছে আজকাল। কোল্ড ওয়ারের সময় মার্কিনিরা কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে হাজারে হাজারে অপতথ্য উৎপাদন করে ছড়ায়। সোভিয়েতরাও খুব একটা পিছিয়ে ছিল না। আর সম্প্রতি ভারত রীতিমতো অপতথ্যের ইন্ডাস্ট্রি বানিয়ে ফেলেছে। এই ইন্ডাস্ট্রি বেশ কয়েক বছর ধরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অপতথ্য উৎপাদন করলেও সম্প্রতি তা ব্যবহার করা হয়েছে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে।

গণআন্দোলনের মুখে বাংলাদেশের দীর্ঘতম মেয়াদের স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতীয় রাষ্ট্র ও হিন্দুত্ববাদী মিডিয়া বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। গণহত্যার আসামি হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া, দীর্ঘ দেড় দশক ধরে হিন্দুত্ববাদী দলের শাসনে থাকা ভারত বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে অপতথ্য ছড়িয়ে জুলাইয়ের আন্দোলন এবং এর পরবর্তী পরিস্থিতিকে সাম্প্রদায়িক চেহারা দিতে তৎপর। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে জানা গেছে, বাংলাদেশকে জড়িয়ে ভারতের কিছু গণমাধ্যম এবং দেশটি থেকে পরিচালিত বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট থেকে ২৭১ ভুয়া তথ্য প্রচারের প্রমাণ পেয়েছে ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানার। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া এসব ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ক্যাটাগরিভিত্তিক ভুল তথ্য শনাক্ত ছাড়াও বিদায়ী মাসে দুটি পরিসংখ্যান এবং একটি ফ্যাক্ট ফাইলও প্রকাশ করা হয়েছে। রিউমার স্ক্যানারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গণনাকৃত এ সংখ্যার মধ্যে রাজনৈতিক বিষয়ে সবচেয়ে বেশি ১১৪টি ভুল তথ্যে ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ মিলেছে, যা মোট ভুল তথ্যের ৪২ শতাংশ। এ ছাড়া জাতীয় বিষয়ে ৬৭টি, আন্তর্জাতিক বিষয়ে ২৯টি, ধর্মীয় বিষয়ে ১৮টি, বিনোদন ও সাহিত্য বিষয়ে ১৫টি, শিক্ষা বিষয়ে নয়টি, প্রতারণা বিষয়ে ছয়টি, খেলাধুলা বিষয়ে পাঁচটি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে অনুসন্ধানে। ফ্যাক্টচেকিং এই প্রতিষ্ঠান আরও জানায়, এসব ঘটনায় তথ্যভিত্তিক ভুলই ছিল ১১৫টি। ছবিকেন্দ্রিক ভুল ছিল ৫৪টি এবং ভিডিওকেন্দ্রিক ভুল ছিল ১০২টি। শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্যগুলোর মধ্যে মিথ্যা হিসেবে ১৭৫টি, বিভ্রান্তিকর হিসেবে ৬৫টি এবং বিকৃত হিসেবে ৩১টি ঘটনাকে সাব্যস্ত করা হয়েছে।

ফ্যাক্টচেকিং সংস্থাটি জানায়, গত বছর থেকে ভারতীয় গণমাধ্যম এবং ভারত থেকে পরিচালিত বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট থেকে বাংলাদেশকে জড়িয়ে ভুয়া তথ্য প্রচারের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। গেল জানুয়ারিতে এ ধারাবাহিকতা দেখেছে রিউমার স্ক্যানার। সংস্থাটি জানায়, সাম্প্রদায়িক অপতথ্য প্রচারের বিষয়টি কয়েক মাস ধরেই আলোচনায় রয়েছে। জানুয়ারিতে এমন ৩২টি সাম্প্রদায়িক অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমার স্ক্যানার। এর মধ্যে ২৫টি ঘটনাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতীয় অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে অপতথ্য প্রচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। অপতথ্যের এ রকম প্রচার দক্ষিণ এশিয়ার মানুষদের মধ্যে অবিশ্বাস ও অনাস্থা বাড়াবে। ইতিমধ্যেই দিল্লির আগ্রাসী নীতির কারণে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোতে ভারতবিদ্বেষ বাড়ছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর কথাতেও এর ইঙ্গিত রয়েছে। ভারতের রাজস্থানের জয়পুরে জয়পুর লিটারেরি ফেস্টিভ্যালে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ : এই দিকে ওই দিকে’ শীর্ষক এক প্যানেল ডিসকাশনে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ দেশেই ভারতবিরোধী মনোভাবের মূল কারণ হলো, দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় দেশ হিসেবে ভারতের ঐতিহাসিক আধিপত্য। তবে অপতথ্য ইন্ডাস্ট্রি একে ধামাচাপা দিয়ে উল্টো ভুল বার্তা দিচ্ছে, যা অঞ্চলটিতে অস্থিতিশীলতা উসকে দেবে বলেই আশঙ্কা করা যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত