ভাষা কেবল শব্দের সমষ্টি নয় বরং এটি আমাদের চিন্তাভাবনার দরজা খুলে দেয়। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, ভাষা যেমন তৈরি হয়, তেমনি বিলুপ্তও হয়। প্রতি দুই সপ্তাহে একটি করে ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে! ভাষার এই জন্ম-মৃত্যুর চক্র, এর বিবর্তন নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব
ঠিক কবে ভাষার জন্ম হয়েছিল, তা নিয়ে গবেষকরা বিতর্ক করেই যাচ্ছেন। ভাবুন তো, আপনি যদি আদিম যুগে ফিরে যান, তখন কি প্রথম মানুষ ‘হ্যালো!’ বলেই আলাপ শুরু করেছিল? নাকি তারা একে অপরকে ‘উগা-বুগা’ জাতীয় কোনো শব্দে ডাকত? ভাষার উৎপত্তি ঠিক কীভাবে হয়েছিল, তা আজও রহস্য। কেউ বলে, মানুষ প্রকৃতির আওয়াজ নকল করে ভাষা তৈরি করেছে, কেউ বলে, ইশারাই ছিল প্রথম যোগাযোগের মাধ্যম।
ভাষার উৎপত্তি
ভাষার উৎপত্তি নিয়ে অনেক তত্ত্ব আছে, কিন্তু সমস্যা একটাই এটা কোনো ফসিলের মতো মাটির নিচে লুকিয়ে নেই, যা খনন করে বের করা যাবে। তাহলে মানুষ প্রথম কীভাবে কথা বলতে শিখল? ভাষার উৎপত্তি গভীর রহস্য, যা নিয়ে বিজ্ঞানী, ভাষাবিদ, দার্শনিক এবং নৃতাত্ত্বিকরা শতাব্দী ধরে গবেষণা করে চলেছেন।
প্রাচীন মানুষ চারপাশের প্রকৃতির শব্দ শুনে ভাষা শিখেছিল এমনটাই বলে এই তত্ত্ব। ধরেন, আদিম মানব একটা কুকুরের ঘেউ ঘেউ শুনে ভাবল, ‘এটা তো ভালো শব্দ। আমি এটা ব্যবহার করব।’ বা হয়তো তারা নদীর ‘ঝরঝর’ শব্দ নকল করল। কিন্তু সমস্যা হলো, এই তত্ত্ব দিয়ে বোঝানো যায় না যে, মানুষ কেবল পশুপাখির ডাক থেকে কীভাবে জটিল বাক্য বানাল। তাই, ‘ঘেউ ঘেউ’ থেকে ‘আমি কি তোমার সঙ্গে সিনেমা দেখতে যেতে পারি?’ হওয়া একটু কঠিন ব্যাখ্যা। প্রাকৃতিক ধ্বনি তত্ত্ব বা Bow-Wow Theory।
অনেক গবেষক মনে করেন, ভাষার শুরু হয়েছিল হাতের ইশারা থেকে। ধরেন, আদিম মানব তার বন্ধুকে দেখিয়ে বলছে, ‘ওইটা দেখো, বিশাল ভাল্লুক আসছে।’ সে সময় হয়তো সবাই কথা না বলে শুধু ইশারায় বোঝাত, কারণ তখন ফালতু কথা বললে শিকারির হাতে ধরা পড়ার ভয় ছিল। কিন্তু একটা সময় মানুষ ভাবল, ‘হাত দিয়ে ইশারা করা কঠিন, বিশেষ করে যখন দুই হাতে ফল আর শিকার ধরে আছি।’ তখন তারা মুখ দিয়ে শব্দ তৈরি করা শুরু করল, যা পরে ভাষায় রূপ নিল। এটিকে তারা বলছেন অঙ্গভঙ্গি তত্ত্ব বা গেশ্চার থিওরি।
সামাজিক সংহতি তত্ত্ব (Social Cohesion Theory) বা ‘দলবদ্ধ থাকলেই শক্তি’ তত্ত্বটি মজার। প্রাচীন মানুষ যখন একসঙ্গে শিকার করত, তখন তাদের একটা কার্যকর যোগাযোগের পদ্ধতি দরকার ছিল। ধরেন এক বন্ধু অন্যজনকে বলল, ‘দেখো, ওই গাছের পেছনে একটা হরিণ আছে।’ যদি সে শুধু হাত নেড়ে বোঝাতে যেত, হরিণ পালিয়ে যেত। তাই ভাষা একসময় দলবদ্ধ থাকার আর একে অপরের সঙ্গে সংযোগ রাখার জন্য অপরিহার্য হয়ে ওঠে। আর ধীরে ধীরে যেন পূর্ণমাত্রায় কথোপকথন শুরু হয়ে গেল। এর সঙ্গে জেনেটিক বা জৈবিক তত্ত্বের একটি সম্পর্ক পাওয়া যায়। নোয়াম চমস্কি নামে এক দারুণ ভাষাবিদ বললেন, ‘ভাষা মানুষের মস্তিষ্কে বিল্ট-ইন।’ তার মতে, মানুষ জন্ম থেকেই ভাষা শেখার ক্ষমতা নিয়ে আসে। তাই তো ছোট শিশুরা এমনিতেই কথা বলতে শিখে যায়। এটা শুনলে মনে হয়, মানুষের মস্তিষ্ক একধরনের ভাষা মেশিন, যা ভাষা আয়ত্ত করতে সাহায্য করে। আর এ কারণেই পৃথিবীর যেকোনো শিশু যে ভাষার পরিবেশেই জন্ম নিক না কেন, সেটাই দ্রুত শিখে নেয়।
তাহলে কোন তত্ত্ব ঠিক? সত্যি বলতে, ভাষার উৎপত্তি নিয়ে কোনো নিশ্চিত উত্তর নেই। হতে পারে সব তত্ত্ব মিলিয়েই ভাষার সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু একটাই কথা নিশ্চিত ভাষা ছাড়া আমাদের জীবন কল্পনাই করা যায় না।
গবেষণা বলে প্রায় ৩ লাখ বছর আগে, নিয়ান্ডারথাল মানুষ প্রথম মুখ খুলে কিছু বলেছিল। কিন্তু ঠিক কী বলেছিল, তা আজও রহস্য। হতে পারে, সে বলেছিল ‘খিদে পেয়েছে।’ বা ‘ওই পাহাড়ে দারুণ সব গুহা আছে।’ কিংবা, হয়তো প্রথম কথাটাই ছিল ‘উফ। এত ঠান্ডা।’ কিন্তু যা-ই হোক, এটাই হয়তো ছিল ভাষার শুরু। ধীরে ধীরে, মানুষের ভাব প্রকাশের ক্ষমতা বাড়তে থাকল, সমাজ গড়ে উঠল, আর আমরা চলে এলাম আধুনিক ভাষার যুগে।
ভাষার পরিবর্তন ও বিলুপ্তি
ভাষার পরিবর্তন হয় ধীরগতির। ভাষা এমনভাবে বদলায়, যা আমাদের চোখে ধরা পড়ে না। আজকের ভাষা ৫০০ বছর পর পুরোপুরি অন্যরকম লাগবে। ঠিক যেমন ভাষার বিকাশ হয়, তেমনি কিছু ভাষা হারিয়ে যায় চিরতরে। ইউনেস্কোর মতে, এখন ৬,৭০০ ভাষা টিকে আছে, কিন্তু এই শতকের শেষে এর অর্ধেকই হারিয়ে যেতে পারে। এ রকম বহু উদাহরণ আছে যেখানে ভাষা বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
ভাষাতত্ত্ববিদরা বলছেন, ১ লাখের কম লোক যদি কোনো ভাষায় কথা বলে, তাহলে সেটির ভবিষ্যৎ খুবই অন্ধকার। এখন পৃথিবীতে ৬ হাজারের বেশি ভাষা টিকে আছে, কিন্তু ৩ হাজার ভাষায় মাত্র ১০ হাজার লোক কথা বলে। আর ১৫০০ ভাষার বক্তা মাত্র ১ হাজার বা তারও কম। বর্তমানে শুধুমাত্র ২০টি ভাষা আছে, যেখানে ১০ কোটি বা তার বেশি মানুষ কথা বলে। এই ভাষাগুলো শক্তিশালী বটে, কিন্তু বাকিদের কী হবে?
ভাষা মরে যাওয়া নতুন কিছু নয়। ভাষার জন্ম-মৃত্যু চলছেই। কেউ বলে ৩০ হাজার ভাষা, কেউ বলে ৫ লাখ ভাষা ইতিমধ্যে হারিয়ে গেছে। মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি ভাষাই ২ হাজার বছরের বেশি টিকে থাকতে পেরেছে, যেমন বাস্ক, মিসরীয়, চীনা, গ্রিক, হিব্রু, লাতিন, ফার্সি, সংস্কৃত ও তামিল। ভাষা ধ্বংসের পেছনে কাদের হাত থাকে?
একটা হাত হলো ঔপনিবেশিক আগ্রাসন : ইউরোপিয়ান উপনিবেশবাদীরা এসেই অনেক ভাষা ধ্বংস করেছে। ১৫৩০ সালে ব্রাজিলে ৭৫ শতাংশ ভাষা ধ্বংস হয়ে গেছে। অস্ট্রেলিয়ার ২৫০ ভাষার মধ্যে বেঁচে আছে মাত্র ২০টি। আরও থাকে রাষ্ট্রভাষা নীতি : যখন এমন হয় যে কোনো দেশ একটা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা বানিয়ে বাকি সংখ্যালঘুদের ভাষাকে অবহেলা করেছে।
শিল্পায়ন ও বিজ্ঞান : দ্রুত যোগাযোগের প্রয়োজনে এক ভাষাকে কেন্দ্রীয় ভাষা বানানো হয়েছে, বাকি ভাষাগুলোকে বলা হয়েছে ‘কাজের না’। যদি পৃথিবীতে মানুষ অন্যান্য ভাষা না শিখে শুধু মাত্র নিজ মাতৃভাষাতেই কথা বলে তাহলে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি সবাই মাত্র একটা ভাষায় কথা বলে, তাহলে মস্তিষ্কের ভাষাগত সৃজনশীলতা কমে যাবে। ভাষার মধ্যে যে বিশেষ জ্ঞান থাকে (লোকগল্প, কৃষ্টি, পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য) সেটাও হারিয়ে যাবে। একটা ভাষা মারা গেলে, সেই ভাষার সঙ্গে এক টুকরো ইতিহাসও চিরতরে হারিয়ে যায়।
ভাষার মৃত্যু মানে শুধু ভাষার মৃত্যু নয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, যেখানে জীববৈচিত্র্য বেশি, সেখানে ভাষার বৈচিত্র্যও বেশি। বিপন্ন প্রাণী আর বিপন্ন ভাষার মধ্যে একটা অদ্ভুত সম্পর্ক আছে।
আপনার চারপাশের অনেক দুর্লভ উদ্ভিদ ও প্রাণীর নাম শুধুমাত্র সংখ্যালঘু ভাষাগুলোর মানুষরাই জানেন। তারা মারা গেলে, সেই জ্ঞানও কবরস্থ হবে চিরতরে। একটা ভাষা হারানো মানে বহু কিছু। একটা গোটা জাতির ইতিহাস মুছে যাওয়া। তাদের গান, গল্প, রীতিনীতি হারিয়ে যাওয়া। এমনকি, এমন শব্দও হারিয়ে যাবে, যা অন্য কোনো ভাষায় নেই। পৃথিবী এবং মানুষের অমূল্য সম্পদ হারিয়ে যাওয়া যেন।
ভাষাতাত্ত্বিকরা বলছেন, নতুন প্রজন্ম মাতৃভাষা ভুলে যাচ্ছে। যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে অনেকেই নিজেদের পুরনো ভাষা ত্যাগ করছে। ফলাফল? একটা ভাষার একমাত্র বক্তা যখন মারা যান, তখন সেই ভাষাও চিরতরে বিদায় নেয়।
ভারতের আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে বোয়া সিনিয়র নামে এক নারীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ৬৫,০০০ বছর পুরনো ‘বো’ ভাষা চিরতরে হারিয়ে গেছে। কল্পনা করা যায়? আপনি একটা ভাষার শেষ বক্তা। আলাস্কার ম্যারি স্মিথ জোনস মারা যাওয়ার পর ‘ইয়াক’ ভাষা পৃথিবী থেকে মুছে গেছে। ভাষা হারানো মানে শুধু শব্দ হারানো নয়। ফরাসি ভাষাবিদ ক্লদ হেগেগ বলেন, ‘ভাষা শুধু কিছু শব্দের সমষ্টি নয়, এটি একটি সমাজের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।’ যুক্তরাষ্ট্রের ভাষাতত্ত্ব অধ্যাপক কে ডেভিড হ্যারিসন আরও কষ্টের কথা বলেন, ‘একটি ভাষা মারা গেলে, তার সঙ্গে সেই সমাজের সংস্কৃতি, গল্প, বিশ্বাস সব হারিয়ে যায়।’ ভাষা শুধু কথা বলার মাধ্যম নয়, এটা দৃষ্টিভঙ্গি, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও জীবনধারার বহিঃপ্রকাশ।
বিশ্বের অর্ধেকের বেশি ভাষার কোনো লিখিত রূপই নেই। তাই যখন একটি ভাষা হারিয়ে যায়, তখন অনেক অমূল্য ঐতিহ্যও হারিয়ে যায় চিরতরে।
ভাষার মজা
ভাষার বিলুপ্তি নিয়ে ভাবতে গেলে মন খারাপ হবে এমনতাই স্বাভাবিক। তবে ভাষা বিষয়টি সুবিশাল এবং বিস্তৃত। ভাষা নিয়ে মজার মজার তথ্য দিয়ে আপনার মন কিছুটা ভালো করে দেওয়া যেতেই পার। প্রথমেই কথা বলা যাক এখন পৃথিবীতে ভাষার সংখ্যা সেটি নিয়ে। সংখ্যাটি ৭ হাজারের বেশি। বিশ্বে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি মানুষ কথা বলে ইংরেজিতে, প্রায় ১১ কোটি ৩২ লাখ মানুষ এই ভাষায় যোগাযোগ করে। ম্যান্ডারিন চীনা ভাষা ব্যবহার করেন ১১ কোটি ১৭ লাখ মানুষ। হিন্দিতে বক্তার সংখ্যা ৬ কোটি ১৫ লাখ এবং বাংলা হলো ২ কোটি ৬৫ লাখ মানুষের ভাষা হিসেবে। চীনা ভাষায় অক্ষরের সংখ্যা অবিশ্বাস্যভাবে পঞ্চাশ হাজারের বেশি। তবে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। চীনা খবরের কাগজ পড়তে হলে মাত্র দুই হাজার অক্ষর জানলেই চলবে। ভাষার বিলুপ্তি বর্তমান বিশ্বে একটি বড় সমস্যা। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি দুই সপ্তাহে একটি ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ২৩১টি ভাষা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং আরও ২৪০০ ভাষা রয়েছে সংকটের মুখে। এটি শুধু ভাষার নয়, সংস্কৃতিরও অপূরণীয় ক্ষতি।
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বর্ণমালার ভাষা হলো কম্বোডিয়ার খেমার, যার বর্ণমালা ৭৪টি। অন্যদিকে, সবচেয়ে কম বর্ণমালার ভাষা হলো নিউ গিনির রোটোকাটস, যার বর্ণমালা মাত্র ১২টি। শব্দের দিক থেকে ইংরেজি ভাষা এগিয়ে, কারণ এতে আড়াই লাখের বেশি শব্দ রয়েছে। তবে সব শেখার দরকার নেই, কারণ আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য অনেক কম শব্দই যথেষ্ট।
ভাষার বৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে দক্ষিণ আফ্রিকা সবচেয়ে এগিয়ে। এই দেশেই রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অফিশিয়াল ভাষা ১১টি। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভাষায় অনূদিত বই হলো বাইবেল। এটি পুরোপুরি ৫৫৪টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে, আর আংশিকভাবে অনূদিত হয়েছে ২৯০০টিরও বেশি ভাষায়।
কৃত্রিম ভাষার দুনিয়াও বেশ বিস্ময়কর। এখন পর্যন্ত ২০০টিরও বেশি কৃত্রিম ভাষা তৈরি হয়েছে। জনপ্রিয় কিছু কৃত্রিম ভাষার মধ্যে রয়েছে স্টার ট্রেকের ‘ক্লিংয়ন’ ভাষা, গেম অব থ্রোনসের ‘ডথরাকি’ ভাষা, এমনকি দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্র বাহুবলির জন্যও একটি নতুন ভাষা তৈরি করা হয়েছিল।
