‘লড়াইয়ের শেষটা দেখতে চাই’

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৭:৩২ এএম

জাতীয় দলের ফরোয়ার্ড মাতসুশিমা সুমাইয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে নিজেই জানিয়েছেন এই অভিযোগ। এই হুমকির কারণ তিনি বাকি ১৭ জন নারী ফুটবলারের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ব্রিটিশ কোচ পিটার বাটলারের অপসারণ দাবি করেছেন। কোচের অধীনে অনুশীলন না করার কথা জানিয়ে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি তাবিথ আউয়ালের কাছে দেওয়া ইংরেজি ভাষায় লেখা চিঠিটা লিখেছিলেন তিনি। এটাই কাল হয়েছে তার। চিঠির বিষয়বস্তুর গুরুত্ব নয়, চিঠির লেখককে নিয়েই তোলপাড় শুরু করেছেন কিছু অতি উৎসাহী ফুটবল সমর্থক। ফুটবল ফ্যানের আড়ালে অনেকেই সুমাইয়াকে দিয়েছে ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি। এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে বাফুফের নির্বাহী সদস্য ও নারী ফুটবল কমিটির প্রধান মাহফুজা আক্তার সুমাইয়াকে ক্যাম্পে আসতে এবং সিনিয়র ফুটবলারদের সঙ্গে মিশতে নিষেধ করেছেন! তবে সুমাইয়া কোনো কিছুতেই দমছেন না। মঙ্গলবার রাতে ঠিকই ঢাকার বাসা থেকে ক্যাম্পে যোগ দিয়েছেন।   

আর দশটা নারী ফুটবলারের সঙ্গে সুমাইয়াকে মেলানো যাবে না। শৈশবটা অন্যদের মতো বিপদসঙ্কুল ছিল না। জাপানের মতো আধুনিক দেশে জাপানি মা আর বাংলাদেশি বাবার কাছে বেড়ে উঠেছেন। ফুটবলের হাতেখড়িটাও জাপানেই। এরপর দেশে এসে ফুটবল প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে থিতু হয়েছেন জাতীয় দলে। ২০২৪ সাফজয়ী দলের সদস্য সুমাইয়া পড়ছেন দেশের অন্যতম সেরা একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। আধুনিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা সুমাইয়াও ব্রিটিশ কোচকে বয়কট করেছেন নানা যৌক্তিক কারণে।

ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি বলেন, ‘আমার নাম মাতসুশিমা সুমাইয়া। আমি বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের একজন খেলোয়াড়। আন্তঃস্কুল পর্যায় থেকে শুরু করে মালদ্বীপে লিগ খেলা এবং ২০২৪ সালে বাংলাদেশের হয়ে সাফ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের যাত্রাপথে মিশ্র এক অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমার এই পথ (ফুটবল) বেছে নেওয়ার কারণ হলো যেসব বাবা-মা তাদের সন্তানদের শুধু পড়াশোনায় ডুবিয়ে রাখেন, তাদের ফুটবলে উৎসাহ দেওয়া। আমি দেখাতে চেয়েছিলাম যে আবেগ এবং নিষ্ঠা সমস্ত বাধা অতিক্রম করতে পারে। তবে আজ আমি এখানে অনুশোচনা নিয়েই বলছি আমি আমার শিক্ষা, আমার পরিবার, আমার ঈদ, সবকিছু ত্যাগ করেছি এমন একটি দেশের সেবা করার জন্য, যারা আমাদের সংগ্রামের প্রশংসা করতে জানে না। ফুটবল খেলার জন্য আমি আমার বাবা-মায়ের সঙ্গে লড়াই করেছি এই বিশ্বাসে যে, আমার দেশ আমার পাশে থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। কেউই খেলোয়াড়দের মানসিক স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করছে না। আমি এবং আমার সতীর্থরা যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, সেটা নিয়ে ইংরেজিতে একটি চিঠি লেখার ন্যূনতম যোগ্যতা আমার আছে। গত কয়েকদিন ধরে আমি খুন এবং ধর্ষণের অসংখ্য হুমকি পেয়েছি! এমন সব কথা শুনতে হচ্ছে যা কখনো কল্পনাও করিনি! এতে আমি সম্পূর্ণ রূপে ভেঙে পড়েছি! আমি জানি না এই ধাক্কা থেকে সেরে উঠতে কত সময় লাগবে। আমি মনে করি, কাউকে যেন তাদের স্বপ্ন পূরণের জন্য এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।’

ঢাকায় বাসা থাকলেও সুমাইয়া বেশিরভাগ সময় অন্য সতীর্থদের সঙ্গে বাফুফে ভবনের ক্যাম্পেই থাকেন। সপ্তাহে এক-দুইদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করার জন্য বাসায় থাকেন। এই ক্লাস করার জন্যই বাসায় গিয়েছিলেন সুমাইয়া। মঙ্গলবার এই স্ট্যাটাস দেওয়ার পর তাকে ফোন করেন মাহফুজা আক্তার কিরণ। ফোনে তাকে ক্যাম্পে না ফিরতে এবং সাবিনা খাতুনসহ কোচের বিরুদ্ধে যারা তাদের সঙ্গে মিশতে না করেন। সুমাইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তিনি (কিরণ) আমাকে এবং আমার বাবাকে বলেন যাতে ক্যাম্পে না যাই এবং সিনিয়রদের সঙ্গে না মিশি। সিনিয়ররা নাকি আমার ব্রেন ওয়াশ করেছে! আমি বলেছি, ভালোমন্দ বোঝার বয়স আমার হয়েছে। কেউ আমার ব্রেনওয়াশ কেন করবে। বাবাকে পরে সব বিষয় যখন বুঝিয়ে বলেছি, বাবা বলেছেন আমি যে সিদ্ধান্ত নেব তাতে তার সমর্থন থাকবে।’ ক্যাম্পে ফেরার কথা জানিয়ে সুমাইয়া বলেন, ‘আমি এই লড়াইয়ে শুরু থেকে ছিলাম, আছি, শেষ পর্যন্ত থাকব। আমাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে ফেলা একজন কোচের অধীনে কোনোভাবেই খেলব না।’

ক্যাম্পে ফিরতে এবং সতীর্থদের সঙ্গে মিশতে কিরণ মানা করতে পারেন না দাবি করে সুমাইয়া যোগ করেন, ‘একটা বিশেষ কমিটি পুরো বিষয়টি দেখছে। এই অবস্থায় একজন খেলোয়াড়কে ক্যাম্পে আসতে এবং অন্যদের সঙ্গে মিশতে নিষেধ করার অধিকার কারও আছে বলে আমার মনে হয় না। যে যাই বলুক, আমি কোনো কিছুতেই থামব না। লড়াইয়ের শেষটা দেখতে চাই। দীর্ঘ ১৫ বছর এই মেয়েরা দেশকে অনেক কিছু এনে দিয়েছে। এর জন্য ন্যূনতম সম্মানটা মেয়েরা প্রাপ্য।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত