অভ্র ছাড়া চলে না

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৫:২৬ এএম

অভ্র আর মেহেদী হাসান খানের গল্পটা সিনেমার মতো। একদিকে মেডিকেলের পড়াশোনা, অন্যদিকে বাংলা ভাষার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা এই দুইয়ের মিশেলে জন্ম   নেয় বিপ্লবী সফটওয়্যার : অভ্র। বিজ্ঞাপনের বাজার, অর্থের লোভ, বাণিজ্যের শর্ত এসবের বিপরীতে দাঁড়িয়ে অভ্র আজও উন্মুক্ত, সবার জন্য। লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব

মেহেদীর কথা

বাংলা টাইপিং জগতে একটা সময় ছিল, যখন বাংলা লিখতে গেলে মনে হতো এ যেন কোনো গুপ্তবিদ্যা। বিভিন্ন কীবোর্ড লে-আউট মুখস্থ করতে হবে, ফন্ট মিলিয়ে চলতে হবে, কী-বোর্ড শর্টকাট মনে রাখতে হবে। কেউ ভুল করলে মাথা নাড়তে হতো, ‘উফ। বাংলা লেখা এত কঠিন কেন।’ তারপর এলেন এক তরুণ, হাতে এক কম্পিউটার, মাথায় একঝাঁক স্বপ্ন, আর কোডিংয়ের জাদুকাঠি। মেহেদী হাসান খান নামের সেই মানুষ বাংলা টাইপিংকে সহজ করে দিলেন অভ্র তৈরি করে। কী-বোর্ড লে-আউট মুখস্থ করার দিন শেষ। অভ্রের ফনেটিক কীবোর্ড লে-আউট এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল। ‘অসর নযধঃ শযধর’ লিখলেই কম্পিউটার নিজে থেকেই বুঝে গেল’ ‘আমি ভাত খাই।’ কী মজা। বাংলা টাইপিং এত সহজ হলো যে, মানুষ হুমড়ি খেয়ে অভ্র ব্যবহার শুরু করল। কারও চাকরির দরখাস্ত, কারও প্রেমপত্র, কারও গবেষণাপত্র সবই অভ্র দিয়ে লেখা হতে লাগল। বাংলা ভাষার ডিজিটাল জগতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটিয়ে যিনি আমাদের সামনে নিয়ে এসেছেন একটি সহজ ও সহজলভ্য সমাধান, তার নাম মেহেদী হাসান খান। তার তৈরি সফটওয়্যার অভ্র শুধু বাংলা টাইপিংকে সহজ করেনি, বরং আমাদের বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা আরও গভীর করে দিয়েছে। কিন্তু এই সফটওয়্যারটির স্রষ্টা, মেহেদী হাসান খান, কখনো বড় কোনো পুরস্কারের জন্য কিংবা পেশাদার স্বীকৃতির জন্য কাজ করেননি। তার উদ্দেশ্য ছিল বাংলা ভাষাকে সহজলভ্য এবং সহজবোদ্ধ করে তোলা। এই সফটওয়্যারটি আমাদের উপহার দিয়েছেন, একেবারে বিনামূল্যে। সরকারের দপ্তর থেকে শুরু করে সাধারণ ব্যবহারকারীর কম্পিউটার সবখানে অভ্র ছিল এবং আজও আছে। তবে এত কিছুর পরও, মেহেদী হাসান খান কখনোই প্রচারের আলোয় আসতে চাননি। তার জীবন ছিল অন্তরালে, প্রোগ্রামিং ছিল তার নেশা। কিন্তু দেশের মানুষের কাছে বাংলা ভাষার প্রতি তার অবদান অস্বীকারযোগ্য। আর এ জন্যই তার প্রতি একুশে পদকের দাবি উঠতে শুরু করেছিল এবং অবশেষে ২০২৫ সালে, সেই দাবির মূল্যায়ন করা হলো। মেহেদী হাসান খানকে দেওয়া হলো একুশে পদক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের জন্য। এটি শুধু মেহেদী হাসান খানের জন্যই নয়, বরং আমাদের সবার জন্য গর্বের বিষয়। এক তরুণের অবদান, যিনি শুধু নিজের স্বপ্নের পেছনে ছুটে গেছেন, কিন্তু তার সফটওয়্যার আজ লাখো মানুষের জীবনে ছড়িয়ে পড়েছে। পুরস্কারটি শুধু তার স্বীকৃতি নয়, সবার জন্যই এক মূল্যবান সংযোজন, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

অভ্রের শুরুর কথা

মেহেদী হাসান খানের বয়স তখন মাত্র ১৮, হাতে কোনো বড় প্রতিষ্ঠান নেই, নেই কোনো প্রযুক্তি বিশারদদের দল। শুধু আছে অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর বাংলা ভাষার প্রতি প্রেম। ভাবলেন, রোমান হরফ তথা ‘ইংরেজি অক্ষর দিয়ে যদি বাংলা লেখা যায়, তাহলে কেমন হয়?’ব্যস। শুরু হলো রাতজাগা পরিশ্রম। মেডিকেলের বই এক পাশে, কোডিংয়ের স্ক্রিন আরেক পাশে।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের এক হোস্টেলের দরজার ওপাশে রাতভর আলো জ্বলছিল। দরজা বন্ধ, কেবল মাঝে মাঝে শব্দ ভেসে আসছে ক্লিক ক্লিক, টিক টিক, ব্যাকস্পেস, ডিলিট, আবার টাইপ। বন্ধুরা ভেবেছিল, ছেলেটা হয়তো পড়াশোনায় মনোযোগ দিয়েছে। পরীক্ষার আগে এমন ঘরবন্দি হওয়া মেডিকেলের ছাত্রদের জন্য খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু এই ছেলেটার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু অন্যরকম ছিল। বন্ধুরা যখন বই নিয়ে ব্যস্ত, তখন সে কি-বোর্ড আর কোড নিয়ে মগ্ন। একদিন সিনিয়র এক ভাই ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলে ফেললেন। কী করছিস? বাংলা কি-বোর্ড বানাচ্ছি। ওহ। তাহলে এটা বিক্রি করবি, কততে? ছেলেটা অবাক হয়ে তাকাল। বিক্রি? না তো। এটা তো ফ্রি। সিনিয়র এবার চশমা খুলে একবার কপালে রেখে আবার চোখে দিলেন। বলিস কী। ফ্রি দিবি? হ্যাঁ। ভাষার জন্য টাকা নেব কেন?  সেদিন অনেকেই বুঝতে পারেনি, এই ছেলেটা আসলে কী করতে চলেছে।

স্বপ্নের শুরু

২০০৩ সাল, একুশে বইমেলা। কিছু তরুণ ‘বাংলা লিনাক্স’ নামে একটা নতুন জিনিস নিয়ে এসেছে। পুরোপুরি বাংলায় লোকালাইজড অপারেটিং সিস্টেম। মেনু, ফাইলের নাম, সবকিছু বাংলা। এমনকি ওদের ওয়েবসাইটটাও পুরোপুরি বাংলায়। মেহেদী হাসান খান তখন নটর ডেম কলেজের ছাত্র। কম্পিউটার নিয়ে তার প্রচণ্ড আগ্রহ, বিশেষ করে প্রোগ্রামিংয়ের প্রতি। ছোটবেলা থেকেই যা পেতেন, তা-ই পড়ে ফেলতেন। বিজ্ঞান বই, কম্পিউটার ম্যাগাজিন, সফটওয়্যার ডকুমেন্টেশন কিছুই বাদ যেত না। বইমেলায় এসে তিনি যখন ‘বাংলা লিনাক্স’ দেখলেন, তখন বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলেন। বাংলা ভাষা যে এতটা প্রযুক্তির ভেতরে প্রবেশ করতে পারে, তা যেন ভাবতেই পারেননি। এই বাংলা লিনাক্সে ‘ইউনিবাংলা’ নামে একটা ফন্ট ছিল, যা ইউনিকোড সমর্থিত। মেহেদী সেটি উইন্ডোজে ইনস্টল করলেন এবং খেয়াল করলেন, এতে যুক্তাক্ষর বানানো অনেক সহজ। কিন্তু সমস্যা একটাই একটি একটি করে অক্ষর ইনসার্ট করতে হয়, যা খুবই বিরক্তিকর। তখন মাথায় এলো, যদি একটা কি-বোর্ড লে-আউট বানিয়ে ফেলা যায়, তাহলে তো মুশকিল আসান। তিনি ভাবলেন, হয়তো কেউ না কেউ এটা আগেই বানিয়ে ফেলেছে। ইন্টারনেট চষে ফেললেন, কিন্তু পেলেন না কিছুই। তখন বুঝলেন, এ কাজটা তাকেই করতে হবে।

অভ্রর জন্ম

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে গেছেন। মেডিকেলের চাপে যখন মানুষের দিন-রাত এক হয়ে যায়, তখন তিনি ঘরে দরজা বন্ধ করে কম্পিউটারে বসে থাকেন। ক্লাস, প্র্যাকটিক্যাল, পরীক্ষা সবকিছুর মাঝেই চলতে থাকে তার নতুন মিশন। রাতের পর রাত ঘুমহীন কাটে, চোখের নিচে কালি পড়ে, তবু থেমে থাকেন না। কীভাবে ইউনিকোডে বাংলা লিখতে পারা যাবে, সেটাই তার একমাত্র ভাবনা। প্রথম ভার্সন দাঁড় করালেন, নাম দিলেন ‘ইউনিবিজয়’। কিন্তু কাজ ঠিকঠাক এগোচ্ছে না। সফটওয়্যার মাঝে মাঝে ক্র্যাশ করছে, আরও উন্নত করতে হবে। এক ভারতীয় ফন্ট প্রতিযোগিতায় নিজের বানানো কি-বোর্ড লে-আউট পাঠালেন। ওরা জানাল, এটা বেশ ভালো, তবে বারবার ক্র্যাশ করে। এবার নতুন সংকল্প নিলেন। ডটনেট ফ্রেমওয়ার্ক বাদ দিয়ে ক্লাসিক ভিজুয়াল বেসিকে নতুন করে কোড লেখা শুরু করলেন। এভাবে কয়েক মাস রাত-দিন এক করে অভ্রর জন্ম হলো।

প্রথমে নাম ছিল ‘ইউনিবিজয়’, কারণ এটি ছিল ইউনিকোডে কাজ করার জন্য তৈরি এবং বিজয়ের অনুপ্রেরণায় বানানো। কিন্তু কিছুদিন পর মনে হলো, এ নামটা ঠিক মানাচ্ছে না। অভিধান ঘেঁটে পেলেন, ‘অভ্র’ শব্দের অর্থ ‘আকাশ’।

এটাই উপযুক্ত নাম। কারণ অভ্র হবে উন্মুক্ত, বিস্তৃত, মুক্ত আকাশের মতো। তাই সেøাগানও ঠিক হলো ‘ভাষা হোক উন্মুক্ত’।

ফ্রি মানে কিন্তু সত্যিই ফ্রি। কেউ কেউ নিশ্চয়ই ভাবলেন, ‘হুঁহ। এখন ফ্রি দিচ্ছে, পরে নিশ্চয়ই টাকা নেবে।’ কিন্তু মেহেদী জানতেন, অভ্র কখনোই বাণিজ্যিক হবে না।

সফলতার গল্প

কাজ শেষ। এবার লাগবে একটা ওয়েবসাইট, যেন সবাই সহজেই সফটওয়্যারটি পায়। ওয়েবসাইট তৈরি হলো, সঙ্গে থাকল ফোরাম। ব্যবহারকারীরা সেখানে মতামত দিতে পারতেন, পরামর্শ দিতেন, অভ্রকে আরও উন্নত করার জন্য নানা মতামত জানাতেন। এই পাগলামির ফলে একসময় অভ্র এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠল যে, সবাই ভাবতে শুরু করল, এটি বুঝি কোনো বিদেশি সফটওয়্যার কোম্পানির কাজ। মেহেদী বলেছিলেন, ‘আমি চাইনি কেউ মনে করুক এটা শখের প্রজেক্ট। তাই নিয়মিত রিলিজ লগ লিখতাম, ভার্সন নম্বর দিতাম, বিশাল বিশাল ইউজার ম্যানুয়াল লিখতাম। যেন সবাই ভাবে এটা একটা পেশাদার সফটওয়্যার কোম্পানির কাজ।’ তার প্রচেষ্টা সফল হলো। অভ্র বানাতে বানাতে মেডিকেলের পড়াশোনায় বেশ ধাক্কা খেয়েছিলেন মেহেদী। শিক্ষকরা ভাবলেন, ‘এই ছেলে মনে হয় ডাক্তারি পড়ার জন্য জন্মায়নি।’ তাকে নানান পরামর্শ দেওয়া হলো, মেডিকেল ছেড়ে অন্য কিছু করার জন্য চাপ দেওয়া হলো। কিন্তু মেহেদী নিজের কাজ চালিয়ে গেলেন। শেষ পর্যন্ত সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি মেডিকেলের পাঠও শেষ করলেন। একদিন জনপ্রিয় কম্পিউটার ম্যাগাজিন ‘কম্পিউটার টুমোরো’ অভ্র নিয়ে একটি ফিচার ছাপাল। শুধু ফিচারই না, ম্যাগাজিনের সঙ্গে অভ্রর একটি সিডিও বিনামূল্যে দেওয়া হলো। মেহেদী বলেছিলেন, ‘সেই মাসে নিউ মার্কেটের দোকানে দোকানে সিডিসহ ম্যাগাজিন, কী যে দারুণ অনুভূতি। ইচ্ছা করছিল রাস্তার সবাইকে ডেকে দেখাই দেখো, এটা আমার বানানো।’

মেহেদী হাসান খান

মেহেদী হাসান খান নাম শুনলে সাধারণত দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। কেউ হয়তো ভাববে, ‘ওহ, অভ্রের নির্মাতা।’ আবার কেউ বলবে, ‘কে মেহেদী?’ কারণ, তিনি প্রচারের আলো থেকে নিজেকে দূরে রাখেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একজন দায়িত্ববান স্বামী এবং স্নেহপ্রবণ পিতা। তার ছেলের নাম অর্ক হাসান খান। শুধু প্রোগ্রামিং নয়, মেহেদী আরেকটি বিষয়ে দারুণ পারদর্শী ফটোগ্রাফি। ফ্লিকার ওয়েবসাইটে তার দুর্দান্ত সব ছবি একসময় ছিল, কিন্তু হুট করে তিনি সব আড়ালে সরিয়ে ফেলেছেন। কেউ জানে না কেন। হতে পারে, তিনি ক্যামেরার ফ্ল্যাশের মতো হুট করে আলো ছড়িয়ে আবার অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে পছন্দ করেন।

যদিও মেডিকেল কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করেছেন, তার নামের আগে কখনো ‘ডা.’ বসাননি। কারণ তিনি চিকিৎসার বদলে কোডিংয়ের অপারেশন থিয়েটারে বেশি স্বচ্ছন্দ। বর্তমানে তিনি কাজ করছেন ‘ব্যাকপ্যাক’-এ, তবে তার আসল পরিচয় একটাই প্রোগ্রামার। জাভাস্ক্রিপ্ট তার হাতে যেন দড়ির মতো, যেভাবে ইচ্ছা বাঁকিয়ে ফেলতে পারেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত