দেশে বছরে দুর্যোগজনিত ক্ষতি ৩ বিলিয়ন ডলার, আক্রান্ত ৬৩ লাখ মানুষ

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৫:৪৪ পিএম

চরম বন্যা, খরা, ঝড় ও তাপপ্রবাহের ফলে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। পাশাপাশি এসব দুর্যোগে প্রতি বছর ৬৩ লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়।

পরিবেশ বিষয়ক সংস্থা জার্মানওয়াচের "ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স ২০২৫" শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে, যা ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয়েছে। এতে দেখা যায়, গত ৩০ বছরে বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলীয় দেশগুলো চরম আবহাওয়া সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ভোগ করেছে।

প্রতিবেদন অনুসারে, ১৯৯৩ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ৯,৪০০টির বেশি চরম আবহাওয়া-সংক্রান্ত দুর্যোগে প্রায় ৮ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ৪.২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ১৯৯৩ সাল থেকে ডোমিনিকা, চীন ও হন্ডুরাস বন্যা, ঝড় ও তাপপ্রবাহের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ ৩১তম অবস্থানে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত একটি তীব্র তাপপ্রবাহ পাকিস্তানের নবাবশাহ শহরে ৪৯.৫°C তাপমাত্রায় পৌঁছেছিল, যা ভয়াবহ বন্যার আগে ঘটেছিল। চরম তাপপ্রবাহ ভারত ও বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে তিন দেশে ৯০ জনের বেশি মানুষ মারা যায়।

বিশ্ব আবহাওয়া অ্যাট্রিবিউশন প্রকল্পের এক গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন এই ধরনের তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা ৩০ গুণ বৃদ্ধি করেছে। এই ফলাফল চরম আবহাওয়ার যৌথ প্রভাব বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরে।

জার্মানওয়াচের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ কার্যকর অভিযোজন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দুর্যোগজনিত মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করেছে। এটি বৈশ্বিকভাবে একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে। কার্যকর ঝুঁকি প্রতিরোধ ও অভিযোজনের ফলে, বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়জনিত মৃত্যুহার গত ৪০ বছরে ১০০ গুণের বেশি হ্রাস পেয়েছে— ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে যেখানে ৫ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল, ২০০৭ সালে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৪,২৩৪-তে।

জলবায়ু অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা

জার্মানওয়াচের আন্তর্জাতিক জলবায়ু নীতির প্রধান লরা শেফার সতর্ক করেছেন, জলবায়ু সংকট একটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে, যা বহুপাক্ষিক পদক্ষেপের মাধ্যমে মোকাবিলা করা প্রয়োজন।

ডেভিড একস্টাইন, জার্মানওয়াচের জলবায়ু অর্থায়ন ও বিনিয়োগ বিষয়ক সিনিয়র উপদেষ্টা, উল্লেখ করেছেন, গত ৩০ বছরে ৪.২ ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি জার্মানির মোট জিডিপির সমান এবং জলবায়ু কর্মসূচিতে দেরি করলে আরও বড় অর্থনৈতিক ও মানবিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে।

ব্রাজিলে আসন্ন জলবায়ু সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য অতিরিক্ত জলবায়ু অর্থায়নের অভাব নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত বলে মনে করেন লিনা আদিল, তিনি জার্মানওয়াচের অভিযোজন ও ক্ষয়ক্ষতি বিষয়ক নীতি উপদেষ্টা।

ভেরা কুনজেল, জার্মানওয়াচের অভিযোজন ও মানবাধিকার বিষয়ক সিনিয়র উপদেষ্টা বলেন, চরম আবহাওয়ার কারণে কিছু দেশে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ তাদের মোট জিডিপির চেয়েও বেশি। তিনি জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানান, যাতে মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি কমানো যায়।

২০০৬ সাল থেকে ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স চরম আবহাওয়া-সম্পর্কিত দুর্যোগের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ বিশ্লেষণ করে আসছে।

জার্মানওয়াচ এই বছর থেকে ইনডেক্সের পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা করেছে এবং এখন এটি আন্তর্জাতিক দুর্যোগ ডাটাবেস (EM-DAT) থেকে চরম আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্য এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) সামাজিক-অর্থনৈতিক তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হচ্ছে। যদিও অর্থনৈতিক ক্ষতি ও প্রাণহানির বিশ্লেষণ থেকে সরাসরি বলা সম্ভব নয় যে এর কত শতাংশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হয়েছে, তবে এটি একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে যে কোন দেশ কতটা প্রভাবিত হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত