২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে প্রতিদিন গ্যাসের গড় উৎপাদন ছিল অন্তত ২৬০ কোটি ঘনফুট। পরের বছর প্রায় ২২ কোটি ঘনফুট কমে যায়। এভাবে ধারাবাহিকভাবে গ্যাসের উৎপাদন কমতে থাকায় বর্তমানে এটি ২০০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমেছে। নতুন করে গ্যাস না পেলে উৎপাদন আরও কমবে।
এর বিপরীতে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ অন্যান্য খাতে গ্যাসের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে দিনে গড়ে সরবরাহ করা হয় ২৬০-২৭০ কোটি ঘনফুট। যার মধ্যে আমদানিকৃত এলএনজি থেকে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে ৭৮ কোটি ঘনফুটের মতো। ফলে গ্যাস সংকট ক্রমেই প্রকট হচ্ছে।
অবশ্য কিছু কূপ সংস্কার ও খনন করে গ্যাসের যে উৎপাদন বেড়েছে, তা খুবই সামান্য। রমজান মাসে এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে এটি ২৮০ থেকে ২৮৫ কোটি ঘনফুট করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। চলমান গ্যাস সংকটের এমন পরিস্থিতির জন্য বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে অবহেলা এবং জ্বালানি বিভাগের অদক্ষতাকেই দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দেড় দশক আগে গ্যাস সংকটের এমন আভাস পাওয়া গেলেও তৎকালীন সরকার উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানিতে মনোযোগী বেশি ছিল। কারণ এ আমদানির সঙ্গে অনেকেরই কমিশনবাণিজ্যের সম্পর্ক ছিল। সেজন্যই দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়েনি। ফলে ঘাটতি পূরণে চড়া দামে বিদেশ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে হয়। এতে বৈদেশিক মুদ্রা ডলারের রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ছে। উৎপাদন কমতে থাকলে আমদানি আরও বাড়তে থাকবে। দেশে উৎপাদিত গ্যাসের গড় দর পড়ছে ৬.০৭ টাকার মতো। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এক-চতুর্থাংশ গ্যাস আমদানি করায় গড় মূল্য ২৪.৩৮ টাকায় পৌঁছে গেছে। কারিগরি পরিকল্পনা ও দক্ষ প্রযুক্তির অভাবে মজুদ থাকার পরও উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না। অথচ কম মজুদের বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র থেকে কয়েকগুণ উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে।
দেশে গ্যাসের মজুদ নিয়ে ২০১০ সালে সমীক্ষা চালায় আন্তর্জাতিক একটি কোম্পানি। সে তথ্যই এখনো ব্যবহার করছে জ্বালানি বিভাগের অধীন প্রতিষ্ঠান হাইড্রোকার্বন ইউনিট। এতে কয়েকটি গ্যাসক্ষেত্রের মজুদের তথ্য নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। প্রকাশিত গ্যাস মজুদের তথ্য অনুসারে বিবিয়ানা ও জালালাবাদ গ্যাসক্ষেত্রের উত্তোলনযোগ্য মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ২০২৩ সালে। দুটি গ্যাসক্ষেত্র থেকেই এখনো উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে। যদিও উৎপাদন কমছে।
সরকারি তথ্যমতে, বছরে ১ টিসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা হলে দেশে গ্যাসের যে মজুদ আছে, তা দিয়ে ১০-১১ বছর চলবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে সরল অঙ্কে গ্যাসের মজুদ হিসাব করা কঠিন। কারণ গ্যাসের মজুদ কমতে থাকায় একই হারে উৎপাদন অব্যাহত রাখা যাবে না। এটি প্রতি বছর কমতে পারে।
উৎপাদনের শীর্ষে থাকা গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানার উৎপাদন কমেছে। তাদের মজুদও শেষের দিকে। দুই বছর আগে এটি থেকে দিনে ১৩০ কোটি ঘনফুট উৎপাদন করা হয়েছে। এখন এটি নেমে এসেছে ৯৫ কোটি ঘনফুটে। অন্য বড় গ্যাসক্ষেত্র থেকেও সক্ষমতা অনুসারে উৎপাদন হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞর বলছেন, মজুদ থাকার পরও কারিগরি পরিকল্পনা ও দক্ষ প্রযুক্তির অভাবে উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না।
এদিকে সমুদ্রসীমা বিজয়ের এক যুগ পরও সেখানে গ্যাস অনুসন্ধান শুরুই হয়নি এখনো। অথচ ভারত এবং মিয়ানমার তাদের অংশে বিপুল পরিমাণ গ্যাস উত্তোলন করছে। গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে অন্তর্র্বর্তী সরকার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছে। তবে শিগগির উৎপাদন বাড়বে না। গত ২২ জানুয়ারি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ কূপ খনন নিয়ে একটি সভা করে। কূপ খননে গুরুত্ব দিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, দেশে গ্যাসের মজুদ ক্রমে কমছে, অন্যদিকে গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। বিদেশ থেকে জ্বালানি আমদানি করতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়।
সভায় বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন জ্বালানি উপদেষ্টা। দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে নতুন প্রকল্পের ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রকল্প নিয়ে গুচ্ছ আকারে সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে। যেখানে গ্যাসের বড় মজুদ পাওয়ার সম্ভাবনা আছে, সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। বাপেক্সের বিদ্যমান রিগ ব্যবহার করে দেশে গ্যাসের বড় মজুদ অনুসন্ধান, গভীর কূপ খননের মাধ্যমে মজুদ বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।
জ্বালানি বিভাগ সূত্র বলছে, অনুসন্ধান, সংস্কার ও উন্নয়ন কূপ মিলিয়ে ১০০টি কূপের প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। যার মধ্যে অগ্রাধিকার বিবেচনায় ৩১টি কূপ সংস্কারে জোর দেওয়া হচ্ছে।
আগের পরিকল্পনা অনুসারে, ২০২৫ সালে ৫০টি কূপ খনন করা গেলে জাতীয় গ্রিডে দিনে প্রায় ৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হবে। ইতিমধ্যে দিনে ১ কোটি ৮৪ লাখ ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব হয়েছে, যার মধ্যে ৭২ লাখ ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলা সূত্রমতে, ইতিমধ্যে ১৬টি কূপ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৭টি কূপের কাজ শেষে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। সবকটি শেষ হলে উৎপাদন আরও বাড়বে।
