বাংলাদেশ ক্রিকেটের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় মুশফিকুর রহিম। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে অভিষেকের পর থেকে বহু জয়ের সাক্ষী তিনি, অনেক রোমাঞ্চকর মুহূর্তের কারিগর। দলের প্রয়োজনে ব্যাটে রান আদায় করে নিতে পারতেন বলে সাবেক অধিনায়ক মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা তাকে ডাকতেন ‘রান মেশিন’ বলে। ব্যাটিং বিভাগের অন্যতম ভরসা বলেই এক দশক ধরে তিনি ‘মিস্টার ডিপেন্ডেবল’ নামে পরিচিত। তার ব্যাটিং দৃঢ়তা, অভিজ্ঞতা আর নিবেদন নিয়ে প্রশ্ন তোলার জায়গা নেই। তবে একটাই প্রশ্ন থেকেই যায়। বড় মঞ্চে যখন দল সবচেয়ে বেশি ভরসা খোঁজে, তখন কি সত্যিই নির্ভরযোগ্য তিনি?
একজন ব্যাটসম্যানকে ‘ডিপেন্ডেবল’ বলা হয় তখনই, যখন তার ব্যাট দলের জন্য সংকটমোচনকারী হয়ে ওঠে। দ্বিপাক্ষিক সিরিজে সেটা বহুবার দেখিয়েছেন মুশি। কিন্তু আইসিসি ইভেন্টের পরিসংখ্যান ঘাটলে দেখা যায়, মুশফিক পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে। ওয়ানডে বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি কিংবা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ কোনো আসরেই তার ব্যাট থেকে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স আসেনি। রঙিন পোশাকের ক্রিকেটের ১২টি আইসিসি ইভেন্টে অংশ নিয়েও মুশফিক বড় মঞ্চের ত্রাতা হতে পারেননি।
ওয়ানডে বিশ্বকাপে তার ব্যাটিং গড় ৩৪.৮০, যেখানে মাহমুদউল্লাহর গড় ৫২.৪৪, সাকিবের ৪১.৬২ এবং তামিমের ২৪.৭৫। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে তার ব্যাটিং গড় ২৭.৫০, যা সাকিব (৪৫.১৬), মাহমুদউল্লাহ (৪৭.০০) এবং তামিম (৭৩.২৫)-এর তুলনায় অনেকটাই কম।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তার অবস্থা আরও করুণ। এই আসরে যারা ৪০০-এর বেশি রান করেছেন, তাদের মধ্যে সর্বনিম্ন ব্যাটিং গড় তার, মাত্র ১৭.৪৭! শুধু তাই নয়, তার স্ট্রাইক রেটও দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। অথচ এই ফরম্যাটে দ্রুতগতির রান তোলা অপরিহার্য। বিশ্বমঞ্চে ব্যর্থতার এমন ধারা কি সত্যিই একজন ব্যাটসম্যানকে ‘ডিপেন্ডেবল’ তকমা পাওয়ার যোগ্য করে তোলে?
মুশফিকের ক্যারিয়ারে নিঃসন্দেহে অসাধারণ কিছু ইনিংস আছে। কিন্তু সেগুলোর বেশিরভাগই দ্বিপাক্ষিক সিরিজের রঙিন পরিসংখ্যান। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি ভালো ফর্মে ছিলেন, কিন্তু তার বাইরের সময়গুলোয় আইসিসি টুর্নামেন্টে তার অবদান খুবই সীমিত। যার মধ্যে ২০১৫ সালের আসরটা সবচেয়ে ভালো গেছে। তিনটি ফিফটিসহ সেই আসরে তিনি ২৯৮ রান করেছিলেন। গড় ৪৯, সর্বোচ্চ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৮৯। এছাড়া আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৭১ ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ৬০ রান ছিল কার্যকরী। তার তিনটি অর্ধশত রানের ইনিংস বাংলাদেশকে জয় এনে দিয়েছিল। কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছিল বাংলাদেশ।
২০১৯ আসরে আরও দাপুটে ছিলেন তিনি। সেবার ৫২ গড়ে ব্যাট করে ৩৬৭ রান করেছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে করেছিলেন ১০২ রান। যা তার বিশ্বকাপের একমাত্র সেঞ্চুরি। কিন্তু সেই সেঞ্চুরি বাংলাদেশকে জেতাতে পারেনি। শুধুই হারের ব্যবধান কমিয়েছিল। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৮১ ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৭৮ রানের ইনিংস দলকে জেতাতে সাহায্য করেছিল। এই কয়েকটি ইনিংসই বাংলাদেশের জয়ের ক্ষেত্রে তার সরাসরি ভূমিকা রেখেছিল। অথচ একজন সত্যিকারের ‘ডিপেন্ডেবল’ ব্যাটসম্যান বিশ্বমঞ্চে দলকে টেনে তুলবেন বারবার, শিরোনামে আসবেন ম্যাচ উইনার হিসেবে।
দল যখন সবচেয়ে কঠিন সময়ে পড়ে, তখন মুশফিক কতবার পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়েছেন? তামিম ও সাকিবের সমালোচনা হয়, মাহমুদউল্লাহর ফর্ম নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, কিন্তু মুশফিক একরকম রাডারের নিচেই থেকে যান। অথচ তার পরিসংখ্যানই বলে দেয়, বড় ম্যাচে তার ব্যাট নীরব থেকেছে অনেকবার।
২০২৫ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির শুরুর দিকের দুই ম্যাচে তার স্কোর ০ এবং ২। অথচ তিনি এখনও দলে ‘অভিজ্ঞতার’ কারণে অবিচল। তবে প্রশ্নটা থেকেই যায়—অভিজ্ঞতার কী দাম, যদি সেটি বড় মঞ্চে কাজে না লাগে? দ্বিপাক্ষিক সিরিজের পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে একজন ব্যাটসম্যানকে দলে টেনে রাখা কতটা যৌক্তিক? যখন তার পরিসংখ্যানই বলে দেয়, তিনি ‘ডিপেন্ডেবল’ নন।
বাংলাদেশ ক্রিকেটে মুশফিকুর রহিম নিঃসন্দেহে বড় নাম, কিন্তু আইসিসি আসরে তার পারফরম্যান্স কি বড় মঞ্চের উপযোগী? উত্তর খুঁজতে গেলে পরিসংখ্যানই বলে দেবে, নীরব ব্যাট কখনও নির্ভরতার প্রতীক হতে পারে না।
নাহিদের ১৪৯ গতির বলে পরাস্ত উইলিয়ামসন
কার্সের চোটে বিপদে ইংল্যান্ড
চ্যাম্পিয়নস ট্রফির মাঝেই সন্ত্রাসী হামলার হুমকি
বাংলাদেশের ‘৮ রান উন্নতি’