সিঙ্গাপুরে মুসলমানদের সোনালি ঐতিহ্য

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৬:৪৭ এএম

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমৃদ্ধশালী নগররাষ্ট্র সিঙ্গাপুর, যা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতির জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত। এই আধুনিক নগররাষ্ট্রের রয়েছে গৌরবময় ইসলামি ইতিহাস এবং মুসলিম সংস্কৃতি। সিঙ্গাপুরের মুসলিম সম্প্রদায়ের ইতিহাস, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আজও দেশটির সমাজে গভীর প্রভাব ফেলছে।

সিঙ্গাপুরে ইসলামের আগমন ঘটে চৌদ্দশ শতাব্দীতে, যখন অঞ্চলটি মালয় শাসনের অধীনে ছিল। ১৫০০ সালের দিকে দেশটিতে শারিয়া আইন বাস্তবায়ন হয়। পরবর্তী সময় জোহোর শাসনামলেও তা অব্যাহত থাকে। এ সময় সিঙ্গাপুরে ইসলামের প্রসার ঘটে। ১৮২৪ সালে সিঙ্গাপুর ব্রিটিশদের অধীনে চলে যায়। তখন শরিয়া আইন বন্ধ হয়ে যায়। তবে মুসলমানরা ব্যক্তিগত জীবনে শরিয়া আইনই অনুসরণের চেষ্টা করত।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে ইসলামি বিষয়গুলোর প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানের জন্য ১৯১৫ সালে ‘মুহাম্মাদান এডভাইজরি বোর্ড’ গঠিত হয়। এই বোর্ডটি মুসলিমদের ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয়ে ঔপনিবেশিক সরকারকে পরামর্শ দিত।

২০২০ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, সিঙ্গাপুরে মুসলমানের সংখ্যা প্রায় আট লাখ, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৬ শতাংশ। এই মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ৮০ শতাংশ মালয় এবং ১৩ শতাংশ ভারতীয় বংশোদ্ভূত। বাকিরা বিদেশি অভিবাসী।

সিঙ্গাপুরের মুসলিম সম্প্রদায় প্রধানত সুন্নি মুসলিম, যারা শাফেয়ি ও হানাফি মাজহাবের অনুসারী। শাফেয়ি মাজহাব প্রধানত মালয় সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত। আর ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের মুসলিমরা হানাফি মাজহাব অনুসরণ করে। সিঙ্গাপুরে মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয়গুলোর তত্ত্বাবধানে রয়েছে একটি সুসংগঠিত প্রশাসনিক কাঠামো। মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয়, সামাজিক ও শিক্ষামূলক বিষয়গুলোর তত্ত্বাবধান করে ‘মজলিসে উলামায়ে ইসলাম সিঙ্গাপুর’ (এমইউআইএস) নামক এক প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটি মুসলিমদের ধর্মীয় শিক্ষার মান উন্নয়ন, মসজিদ পরিচালনা এবং হালাল সার্টিফিকেশন ইত্যাদি বিষয়ে কাজ করে। সিঙ্গাপুরে ১৯৫৮ সালে গঠিত হয় শরিয়া কোর্ট। এর মাধ্যমে মুসলিম বিবাহ, তালাক এবং পারিবারিক আইনসংক্রান্ত বিষয়ে বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব মুসলিম ল অ্যাক্ট’ (এএমএলএ), যা মুসলিম আইন এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম নির্ধারণ করে। সিঙ্গাপুরে ৭২টি মসজিদ রয়েছে। এই মসজিদগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ। ১৮২৪ সালে নির্মাণ করা হয় সুলতান মসজিদ। এই মসজিদটি সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং দর্শনীয় মসজিদ। এটি ১৯৭৩ সালে জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে মনোনীত হয়। মসজিদটির বিশাল স্বর্ণখচিত গম্বুজ এবং মসজিদের দেয়ালে সূক্ষ্ম কারুকাজ সিঙ্গাপুরের ইসলামি স্থাপত্যের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ১৮৪৬ সালে নির্মাণ করা হাজ্জাহ ফাতেমা মসজিদ। এতে রয়েছে মালয় ও ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীর মিশ্রণ। এটি সিঙ্গাপুরের বিশাল স্থাপত্য বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে। সিঙ্গাপুরের আরেকটি বিখ্যাত মসজিদ হলো, আবদুল গাফুর মসজিদ। এই মসজিদের নকশায় দক্ষিণ ভারতীয় স্থাপত্যশৈলীর প্রভাব স্পষ্ট। মসজিদের জ্যামিতিক নকশা এবং রঙিন কাচের কাজ অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন।

সিঙ্গাপুরে ছয়টি মাদ্রাসা রয়েছে। মাদ্রাসাগুলো ‘মজলিসে উলামায়ে ইসলাম সিঙ্গাপুর’ (এমইউআইএস)-এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। সিঙ্গাপুরের অন্যতম প্রাচীন ও খ্যাতনামা একটি ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো মাদ্রাসা আল-জুনাইদ আল-ইসলামিয়া, যা ইসলামি জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত