ব্যাংক খাতের বেহাল দশা! 

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:৫৭ এএম

রাজনীতির মারপ্যাঁচে অর্থনীতি ভীষণভাবে প্রভাবিত হয়। বাংলাদেশে বিগত দেড় দশকে অন্ধ দলতন্ত্র এবং নির্বিচার লুটপাটে অর্থনীতি সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্যাংক খাতের মেরুদ- ভেঙে গেছে। গণআন্দোলনের মাধ্যমে করায়ত্তকামী কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন ঘটলে স্বৈরাচারমুক্ত দেশে নানা খাতের পাশাপাশি ব্যাংকেরও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এক আলোচনায় বলেছেন কিছু ব্যাংকের অবস্থা এতটাই নাজুক যে, সেগুলো বাঁচানো সম্ভব হবে না। গত শতকের আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে, বাছবিচারহীন তৎপরতায় ব্যাংক স্থাপনের অনুমতি এবং একের পর এক সরকার লালিত ব্যক্তি খাতে ব্যাঙের ছাতার মতো ব্যাংক গজিয়ে ওঠার কুফল এখন সুস্পষ্ট দৃশ্যমান। ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় ঘোষিত নীতিকাঠামো প্রায় ক্ষেত্রে লঙ্ঘন করে স্থাপিত এসব ব্যাংকের এখন বেহাল দশা। আমানতকারীরা এসব ব্যাংকে গচ্ছিত টাকার বিষয়ে নিয়ত অস্বস্তি ও দুর্ভাবনার শিকার। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গভর্নর উচ্চারিত শঙ্কা যথার্থই বাস্তবতার নিদারুণ প্রতিফলন। তারপরও যখন একটি বেসরকারি ব্যাংকের স্বত্বাধিকারী, যিনি একটি রাজনৈতিক দলের উচ্চপদে সমাসীন, তিনি বলেন এক দিনে ব্যাংক ঠিক করা সম্ভব নয়, তখন প্রশ্ন ওঠে তাহলে কতদিন লাগবে?

ব্যাংক খাতের নাজুক অবস্থার কথা বলতে গিয়ে গভর্নর বলেছেন কয়েকটা ব্যাংকের এনপিএল (খেলাপি ঋণ) ৮৭ শতাংশ হয়ে গেছে। অর্থাৎ ৮৭ ভাগ ঋণই একটি গ্রুপের হাতে দেওয়া হয়েছে। গভর্নর বলেন, ‘এই খাতকে উদ্ধার করার জন্য আমাদের যে উপায়ে ব্যাংক রেগুলেশন অ্যাক্ট হচ্ছে, সরকারি-বেসরকারি সব ব্যাংকের জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের বেশ কিছু সরকারি ব্যাংকও সমস্যায় আছে। বেশ কিছু ব্যাংক আমাদের সরাসরি তদারকিতে আছে। কোন ব্যাংককে আমরা কীভাবে রেগুলেশনের দিকে নিয়ে যাব, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। কিছুদিন পরপর আমরা বোর্ড এবং ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করছি। আমরা শিগগিরই একটা সিদ্ধান্তে আসব।’

তবে মঙ্গলবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস বিষয়ে টাস্কফোর্সের সুপারিশ’ শীর্ষক দুদিনের সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে ‘ম্যাক্রো-ইকোনমিক পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স ইন দ্য ব্যাংকিং সেক্টর’ শীর্ষক অধিবেশনে আব্দুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘বর্তমান গভর্নর আহসান এইচ মনসুর অনেক গুণী মানুষ। কিন্তু তিনি নিজে যদি বলেন, ভালো ব্যাংক, খারাপ ব্যাংক, সবল ব্যাংক, দুর্বল ব্যাংক, দুটি ব্যাংক ঘুরে দাঁড়িয়েছে এসব কথা বলা বন্ধ না করলে কোনো দিন ব্যাংক খাত ভালো হবে না। আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশি কথা বলে।’ একই সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে গভর্নর মন্তব্য করার পর সাবেক ব্যবসায়ী নেতা মিন্টু এই মন্তব্য করেন।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, টাস্কফোর্সে অর্থনীতিকে রাজনীতি থেকে আলাদা করে ফেলা হয়েছে। মনে হয়েছে, দেশে কোনো রাজনৈতিক অবস্থা নেই। সবাই বাণিজ্যিক ব্যাংককে দুষছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকের অবদান টাস্কফোর্সে অস্বীকার করা হয়েছে। ব্যাংকগুলো শর্ট টার্ম সঞ্চয়ের বিপরীতে লং টার্ম লোন দিচ্ছে। টাস্কফোর্সের রিপোর্টে এসব লেখা হয়নি। এসব কথা কাকে বলবেন, যাদের বলবেন তারা লুণ্ঠনে ব্যস্ত। টাস্কফোর্স বই দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ সংস্কার দরকার রাজনীতিতে। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কার না হলে কোনো সমাধান হবে না। সুদ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমানো যাবে না বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশের অন্যান্য খাতের মতো ব্যাংক খাতেও বাস্তবভিত্তিক, টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার দরকার। এর জন্য যেমন পুঁথিগত কৌশল ব্যবহার করতে হবে, একই সঙ্গে লাগবে বাস্তব রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। দীর্ঘ অপশাসনে দেশের যে বিপুল ক্ষতি হয়েছে তা সহজে ও দ্রুত মেরামত করা যাবে না, তবে এর জন্য সমন্বিত ও উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত