রাজনীতিকদের অভিমত

সেনাপ্রধান যথার্থ বলেছেন, সতর্ক না হলে বিপদ

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৬:৫৮ এএম

গত কয়েকদিনে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। ঘটছে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও ধর্ষণের  মতো অপরাধ।  পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট সবখানে এখন ছিনতাই আতঙ্ক। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চলছে টানাপড়েন। বাড়ছে সন্দেহ-অবিশ্বাস। এর জেরে দেওয়া হচ্ছে পাল্টাপাল্টি বক্তৃতা-বিবৃতি। সব মিলিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।  দেশের এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলসহ সবাইকে একসঙ্গে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তিনি সতর্ক করে বলেন, অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ করতে হবে। না হলে দেশের স্বাধীনতা- সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হতে পারে।

সেনাপ্রধান গত মঙ্গলবার তার এক বক্তৃতায় বলেন, ‘আমাদের মধ্যে মতের বিরোধ থাকতে পারে, চিন্তা-চেতনার বিরোধ থাকতে পারে। কিন্তু দিন শেষে দেশ ও জাতির দিকে খেয়াল করে আমরা সবাই যেন এক থাকতে পারি। তাহলেই এ দেশটা উন্নত হবে, দেশটা সঠিক পথে পরিচালিত হবে। না হলে আমরা আরও সমস্যার মধ্যে পড়ে যাব। বিশ্বাস করেন, ডোন্ট ওয়ান্ট টু হেড, ওই দিকে আমরা যেতে চাই না।’

দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার জন্য বেশ কয়েকটি কারণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার পেছনে  প্রথম কারণ হচ্ছে নিজেদের মধ্যে হানাহানি। একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে বিষোদগারে ব্যস্ত। এটা একটা চমৎকার সুযোগ অপরাধীদের জন্য। যেহেতু আমরা একটা অরাজক পরিস্থিতির মধ্যে বিরাজ করছি, তারা খুব ভালোভাবেই জানে যে এ সময়ে যদি এ সমস্ত অপরাধ করা যায়, তাহলে এখান থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। সে কারণে এই অপরাধগুলো হচ্ছে। আমরা যদি সংগঠিত থাকি, একত্র থাকি, তাহলে অবশ্যই এটা সম্মিলিতভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।

আইনশৃঙ্খলা ও সাম্প্রতিক অস্থিরতার পাশাপশি সেনাপ্রধান তার বক্তব্যে পিলখানা হত্যাযজ্ঞ, সেনাবাহিনীর অবস্থান, মব ভায়োলেন্স, এমনকি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের বিষয়টিও উঠে এসেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তার বক্তব্য নিয়ে নানা মতভেদ থাকলেও দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে তার বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত বলে মনে করা হচ্ছে। 

 সেনাপ্রধানের বক্তব্যের পর বিকেলে এক অনুষ্ঠানে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ করে, তর্ক বন্ধ করে সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকুন, যেন ঐক্যবদ্ধ থাকার মধ্য দিয়ে আমরা একটা গণতান্ত্রিক জায়গায় পৌঁছাতে পারি। আজ আমাদের বাংলাদেশে যে পরিবর্তন হয়েছে, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং নতুন একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তুলবার।’

তিনি বলেন, ‘সেই সুযোগকে আজ আবার ধ্বংস করে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে। শেখ হাসিনা আশ্রয় নিয়েছেন দিল্লিতে। সেখান থেকে তিনি চক্রান্ত করছেন, পরিকল্পনা করছেন কী করে এ গণঅভ্যুত্থানের বিজয়ের সব ফলকে নস্যাৎ করে দেওয়া যায়। সেখান থেকে চক্রান্ত করছেন বাংলাদেশে কী করে আবার নৈরাজ্য সৃষ্টি করা যায়, একটা অস্থিতিশীল অবস্থা সৃষ্টি করা যায়।’

সেনাপ্রধানের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সেনাপ্রধানের বক্তব্যের সঙ্গে আমরা একমত পোষণ করি। এ জন্য আমাদের দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বারবার ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। আমরা ঐক্যবদ্ধ না থাকলে লাভবান হবে দেশবিরোধী শক্তি। সেটা নিশ্চয়ই কেউ আমরা চাই না।’

নির্বাচনের বিষয়ে সেনাপ্রধান যে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন সে বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন চেয়েছি। যতদূর জানি নির্বাচন কমিশন ডিসেম্বরে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। নির্বাচনের আগে আমরা ন্যূনতম সংস্কার চাই। অন্তর্র্বর্তী সরকার সংস্কারকাজ শুরু করবে আর নির্বাচিত সরকার এসে তা অব্যাহত রাখবে।’ 

গত মঙ্গলবার সেনাপ্রধানের বক্তব্যের পর বিকেলে এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও সাবেক সাংসদ ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের দলমত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এ জন্য বিএনপিসহ সব দলকে পাঁচ বিষয়ে একমত হয়ে জাতির সামনে শপথ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

 তিনি বলেন, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নো কম্প্রোমাইজ (কোনো আপস নয়), দুর্নীতি-চাঁদাবাজি-সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, জাতীয় স্বার্থে  এক ও অভিন্ন, দেশের উন্নয়নে জন্য দলের চেয়ে দেশ বড় নীতি অবলম্বন এ পাঁচ বিষয়ে একমত হয়ে জাতির সামনে শপথ গ্রহণ করতে না পারলে তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ারও আহ্বান জানান। জামায়াতের নায়েবে আমির বলেন, ভিন্ন মত ও দল থাকবে, থাকতে পারে। কিন্তু দেশ ও জাতির স্বার্থে এই পাঁচ বিষয়ে একমত হতে পারলে পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ হবে একটি শক্তিশালী জাতি ও রাষ্ট্র।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স  বলেন, ‘আমরা তার পুরো বক্তব্যের মূল্যায়ন করিনি। আমরা একটা সংকটজনক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছি। সেক্ষেত্রে গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য, ভোটের জন্য সেনাবাহিনী বা সেনাপ্রধানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি একটা ভালো ভোটের কথা বলেছেন। সেটাকে আমরা পজেটিভ হিসেবে নিচ্ছি। রাজনৈতিক দলগুলো সম্পর্কে যে বক্তব্য আমার মনে হয় সাধারণ মানুষের তা দেওয়া ভালো। সাধারণ মানুষ কোনো মন্তব্য করে থাকলে উনিও করতে পারেন। আমরা যেহেতু গণতান্ত্রিক উত্তরণের বিষয়টিকে প্রধান বিবেচনা করেই আমাদের আগানো দরকার।’

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুছ আহমদ বলেছেন, দেশের বাস্তবতার নিরিখে সেনাপ্রধান বেশ কিছু বাস্তবসম্মত কথা বলেছেন।  যেভাবে সারা দেশে নৈরাজ্য, সহিংসতা এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতির মতো ঘটনা ঘটছে সেনাপ্রধান হিসেবে তিনি এটা বলতেই পারেন। তিনি বলেন, সেনাপ্রধান যেন ইনসাফভিত্তিক কথা বলেন। কোনো একটা পক্ষে যেন না চলে যান। আমরা এটাই আশা করি।

 সেনাপ্রধানের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহি আকবর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সেনাপ্রধান সময় উপযোগী বক্তব্য রেখেছেন। রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ না হলে জনগণের আশা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন হবে না। বিষয়টি রাজনৈতিক দলগুলোর উপলব্ধি করতে হবে। পরস্পরের বিরুদ্ধে কাদা ছোড়াছুড়ি না করে বৃহত্তর স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এগিয়ে যেতে হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত