‘প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে গেলে অনিয়ম হতেই পারে’

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৫, ০২:০৬ পিএম

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সমসপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নুর আলমের বিরুদ্ধে তথ্য গোপন করে স্কুল সরকারিকরণ, নিয়োগ বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি ও ভুয়া কাগজপত্র তৈরিসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এসব বিষয় নিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠার শর্তে প্রতিষ্ঠানের নামে রেজিস্ট্রিকৃত অখণ্ড ৩০ শতাংশ জমি থাকতে হয়। তাছাড়া পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী তো থাকতেই হয়। কিন্তু এসব তথ্য গোপন করে সমসপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুর আলম স্কুল সরকারিকরণ, নিয়োগ বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি ও ভুয়া কাগজপত্র তৈরিসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির পরিবারিক প্রতিষ্ঠা গড়ে তুলেছেন। 

১৯৯৬-১৯৯৭ সালে উপজেলার তালুককানুপুর ইউনিয়নের সমসপাড়া গ্রামে নিজস্ব ১৬ শতাংশ জমিতে (রেজিঃ বে-সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠা করেন। ২টি টিনসেড ঘর নির্মাণ করে শিক্ষাকার্য চালান প্রধান শিক্ষক দাবি করা মো. নুর আলম। পরবর্তীতে একই গ্রামের ফজলুর রহমানের কাছে তার পরিবারের দুজনকে ওই প্রতিষ্ঠায় শিক্ষক নিয়োগের শর্তে ৩৩ শতাংশ জমিতে চুক্তিবদ্ধ হন নুর আলম। সেখানেও প্রতিষ্ঠানের নামে দুখণ্ড জমি লিখে দেওয়া হয়। সে সময় ওই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ছিলেন নুর আলম ও জমিদাতা ফজলুর রহমানের স্ত্রী রাশিদা বেগম। কিন্তু ফজলুর রহমানের পরিবারের একজন সদস্য নিয়োগ দেওয়ায় প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। 

এদিকে প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট জায়গায় নির্মাণ না করে ২০০১ সালে নুর আলমের লিখিত ৮ শতাংশ জমিতে স্কুলের একতলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণ হয়। পরে অন্তত ৫০০ গজ দুরে ফজুলর রহমানের মৌখিক দেওয়া ৮ শতাংশ জমিতে আরেকটি একতলা ভবন নির্মাণ হয়। এভাবে চলতে থাকে তাদের প্রশাসনিক ও একাডেমিক শিক্ষাকার্যক্রম। ২০০১ ও ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠানে দুজন শিক্ষিকা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। কিন্তু নানা জটিলতায় নিয়োগ আটকে যায়। 

তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার শাসনামলে সকল তথ্য গোপন করে ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি স্কুলটি জাতীয়করণ করা হয়। স্কুলটি জাতীয়করণ হওয়ার পর প্রধান শিক্ষক কাগজপত্র জাল জালিয়াতী করে তার স্ত্রী আমেনা বেগম ও উম্মে ছালমা নামের দুজনকে পূর্ববর্তী কাগজপত্রাদি দেখিয়ে নিয়োগ চূড়ান্ত করেন। 

অপরদিকে ওই প্রতিষ্ঠানের পৃথক দুইস্থান ব্যতিরেখে চুক্তিবদ্ধ হওয়া দুখণ্ড লিখে দেওয়া জমিতে চারতলা বিশিষ্ট ভবন অনুমোদন নেয় প্রধান শিক্ষক নুর আলম। সেখানেও সৃষ্টি হয়েছে নানা জটিলতা। জমিদাতা ফজলুর রহমান জমি দুখণ্ড লিখে দিলেও প্রধান শিক্ষকের দাবি একখণ্ডই। এরই মধ্যে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ভবন নির্মাণ করতে গেলে নানা বাধার সৃষ্টি হয়। বাধা উপেক্ষা করে ভবন নির্মাণের চেষ্টা করা হলে আদালতে মামলা দেন জমিদাতা ফজলুর রহমান। ইতোমধ্যেই ওই জমিতে ভবন নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন আদালত। 

অপরদিকে পূর্বের বিল্ডিংয়ের ওপর দ্বিতল ভবন নির্মাণের জন্য ১৬ লক্ষাধিক টাকাও বরাদ্দ হয়েছে বলে স্থানীয় সরকার বিভাগ (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে। 

সে সময়ে চাকরি প্রত্যাশী একই ইউনিয়নের বাসিন্দা মোছা মাকসুদা বেগম প্রধান শিক্ষক নুর আলমের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগ তুলে বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেন। কিন্তু কোনো প্রতিকার মেলেনি।

এ ব্যাপারে প্রধান শিক্ষর মো. নুর আলম বলেন, যেভাবে যা হয়েছে হোক। প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখতে গেলে কিছু অনিয়ম হতেই পারে। তিনি আরও বলেন, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কিছু লিখতে যাইয়েন না। অনেক বাচ্চারা এখানে লেখাপড়া করে।

জানতে চাইলে ওই ক্লাস্টারের দায়িত্বে থাকা উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার আব্দুর রউফ বলেন, এসব বিষয়ে তার কিছু বলার নেই। ওসব নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।

এ বিষয়ে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. মাসুদ রানা বলেন, তিনি যোগদানের আগের এসব ঘটনা। তবে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠান তো আর ফেরত যাবে না। কিন্তু অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে  জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনা যাবে। আর উনি তো প্রধান শিক্ষকও নন, একটি রীট পিটিশনের প্রেক্ষিতে তাদের প্রধান শিক্ষক পদ স্থগিত করেছেন উচ্চ আদালত। তারা পদ ব্যবহার করলেও সম্মানী পান সহকারী শিক্ষকের। সেইসঙ্গে ভবন নির্মাণে কোন নিষেধাজ্ঞা থাকলে তা বাস্তবায়নের কোন সুযোগ নেই। 

গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দা ইয়াসমিন সুলতানার সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত