মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একের পর এক শুল্ক আরোপের ঘোষণায় টালমাটাল বিশ্ব অর্থনীতি। বিশাল বাণিজ্য ভারসাম্যের কারণে এ অবস্থা থেকে কেউই রেহাই পাচ্ছে না। এদিকে নতুন করে আরও শুল্ক আরোপের ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ট্রাম্পের এমন কর্মকাণ্ড বিশ্বকে মন্দার দিকে ধাবিত করতে পারে। যদি এই পরিস্থিতি ভালোভাবে না সামলানো হয় তবে মন্দার চেয়েও খারাপ কিছু হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
রবিবার ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি আগামী সপ্তাহের মধ্যে আমদানি করা সেমিকন্ডাক্টরের ওপর শুল্ক হার ঘোষণা করবেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই প্রতিশ্রুতির অর্থ হলো— চীন থেকে আমদানি করা স্মার্টফোন ও কম্পিউটারের ওপর দেওয়া শুল্ক ছাড় আর বেশি দিন থাকছে না। ট্রাম্প মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেমিকন্ডাক্টর খাতকে আরও শক্তিশালী করতে চাচ্ছেন।
ওয়েস্ট পাম বিচ থেকে ওয়াশিংটনে ফেরার পথে এয়ার ফোর্স ওয়ানে চড়ে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এটি জটিল করতে চেয়েছিলাম। কারণ আমরা আমাদের চিপ, সেমিকন্ডাক্টর এবং অন্যান্য জিনিস আমাদের দেশেই তৈরি করতে চাই।’
স্মার্টফোনের মতো কিছু পণ্যকে ছাড় দেওয়া হবে কিনা তা বলতে অস্বীকার করে ট্রাম্প বলেন, ‘আপনাকে একটি নির্দিষ্ট নমনীয়তা দেখাতে হবে। কারও এত কঠোর হওয়া উচিত নয়।’
এর আগে ট্রাম্প সেমিকন্ডাক্টর খাত নিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা বাণিজ্য তদন্তের ঘোষণা দেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘আসন্ন ন্যাশনাল সিকিউরিটি ট্যারিফ ইনভেস্টিগেশনে আমরা সেমিকন্ডাক্টর এবং পুরো ইলেকট্রনিক্স সাপ্লাই চেইনের দিকে নজর রাখছি।’
তবে রবিবার ট্রাম্পের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক বলেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে চীন থেকে আসা গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিপণ্য ও সেমিকন্ডাক্টরের ওপর নতুন শুল্ক বসানো হবে।
লুটনিক বলেন, ট্রাম্প সেমিকন্ডাক্টর ও ফার্মাসিউটিক্যালসকে লক্ষ্য করে খাতভিত্তিক শুল্কের পাশাপাশি এক বা দুই মাসের মধ্যে স্মার্টফোন, কম্পিউটার এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক্স পণ্যগুলোতে ‘বিশেষ ধরণের শুল্ক’ কার্যকর করবেন।
তিনি বলেন, নতুন শুল্কগুলো ট্রাম্পের তথাকথিত পারস্পরিক শুল্কের বাইরে পড়বে, যার অধীনে গত সপ্তাহে চীনা আমদানির উপর শুল্ক ১২৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল।
অস্ট্রেলিয়ার গণমাধ্যম এবিসির ‘দিস উইক’ নামক অনুষ্ঠানে লুটনিক বলেন, এক থেকে দুই মাসের মধ্যে ট্রাম্প স্মার্টফোন, কম্পিউটার ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক পণ্যে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে শুল্ক আরোপ করবেন। এর সঙ্গে সেমিকন্ডাক্টর ও ওষুধশিল্প খাতে শুল্ক আরোপ করা হবে। তার মতে, এই শুল্কনীতির ফলে যুক্তরাষ্ট্রে এসব পণ্যের উৎপাদন বাড়বে।
নীতি বদলায় প্রতিদিন
গত সপ্তাহে ট্রাম্পের শুল্ক নিয়ে দোদুল্যমান অবস্থানের কারণে ওয়াল স্ট্রিটে ২০২০ সালের কোভিড মহামারির পর সবচেয়ে বড় অস্থিরতা দেখা দেয়। ট্রাম্পের ২০ জানুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওরস ৫০০’ সূচক ১০ শতাংশের বেশি নিচে নেমে গেছে।
নর্থম্যান ট্রেডারের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান বাজার বিশ্লেষক স্বেন হেনরিচ রবিবার এই শুল্কনীতির কঠোর সমালোচনা করেন। সামাজিক মাধ্যমে এক্সে তিনি লেখেন, ‘প্রশাসন কী বলতে চায়, তা আগে ঠিক করুক—প্রতিদিনই সিদ্ধান্ত পাল্টাচ্ছে। মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এই অনিশ্চয়তার মধ্যে বিনিয়োগ করতে পারছে না।’
সংবাদমাধ্যম এবিসির ‘দিস উইক’ অনুষ্ঠানে মার্কিন সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন ট্রাম্পের শুল্ক পরিকল্পনার সর্বশেষ সংশোধনীর সমালোচনা করে বলেন, ‘অর্থনীতিবিদরা বারবার বলছেন— এ ধরনের শুল্কনীতির কারণে প্রবৃদ্ধি ব্যাহত এবং মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে। তিনি আরও বলেন, এখানে শুল্কনীতি নেই; আছে কেবল বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি।
শুক্রবার রাতে আমদানিকারকদের কাছে পাঠানো এক নোটিশে মার্কিন কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রটেকশন বিভাগ শুল্কমুক্ত পণ্যের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। এতে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ডিস্ক ড্রাইভ, সেমিকন্ডাক্টর ডিভাইস, মেমরি চিপ এবং ফ্ল্যাট প্যানেল ডিসপ্লেসহ ২০ ক্যাটাগরির পণ্য রয়েছে।
এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে হোয়াইট হাউসের বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারো বলেন, চীনের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব এখনো উন্মুক্ত। তবে চীনের সঙ্গে ফেন্টানিল আমদানি নিয়ে যা হয়েছে, তার তীব্র সমালোচনা করেন তিনি।
অপরদিকে বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রেয়ার সিবিএসের ‘ফেস দ্য নেশন’ অনুষ্ঠানে বলেন, শুল্ক নিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের কথা বলার কোনো পরিকল্পনা এখনো নেই। তবে তিনি চীনের বাইরে কয়েকটি দেশের সঙ্গে চুক্তির আশা প্রকাশ করেছেন।
‘আমাদের লক্ষ্য ৯০ দিনের আগে অর্থবহ চুক্তি করা, এবং আমি মনে করি— আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কিছু দেশের সঙ্গে সেটি হবে,’ গ্রেয়ার বলেন।
বিলিয়নিয়ার রে ডালিও এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে বলেন, শুল্কের ফলে যুক্তরাষ্ট্র মন্দার দিকে ধাবিত হবে বা আরও খারাপ হবে। রবিবার ডালিও বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি পর্যায়ে রয়েছি এবং মন্দার খুব কাছাকাছি রয়েছি।’ যদি এই পরিস্থিতি ভালোভাবে না সামলানো হয় তবে মন্দার চেয়েও খারাপ কিছু হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
