যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক নিয়ে টালমাটাল পুরো বিশ্ব। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ বিকল্প বাজারের অনুসন্ধান করতে পারে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বিরোধ হ্রাস পেতে পারে। কিন্তু বিদ্যমান বিশ্ব বাস্তবতায় এফটিএ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রকে বাড়তি শুল্ক সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ অন্য দেশের জন্য যে ধরনের শুল্কনীতি বাস্তবায়ন করে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও সেটিই প্রযোজ্য হবে। কাজেই এ বিষয়ে বাংলাদেশকে বিকল্প নিয়ে ভাবতে হবে।
রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে বৃহস্পতিবার বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সংগঠন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক ও বাংলাদেশ: অভিঘাত ও প্রতিক্রিয়া’ শীর্ষক সংলাপে বক্তারা এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন সংগঠনটির সভাপতি অধ্যাপক রেহমান সোবহান, বাংলাদেশ ট্যারিফ অ্যান্ড ট্রেড কমিশনের সাবেক সদস্য মোস্তফা আবিদ খান, বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক, ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
আলোচনায় অংশ নিয়ে অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে এককভাবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাজার হলেও বর্তমানে এশিয়ার বাজার সবচেয়ে বড়। এখানে সাড়ে তিন বিলিয়ন মানুষের বাজার রয়েছে। এ বাজারের দিকে বাংলাদেশকে মনোনিবেশ করতে হবে।
তিনি বলেন, ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে বাংলাদেশ সরকার ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কিছু চিঠি চালাচালি করেছে। এতে কতটা সুফল পাওয়া যাবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কারণ কোনো নির্দিষ্ট দেশের জন্য মার্কিন নীতির পরিবর্তন হবে না। তারা সব দেশের জন্য একই নীতি বাস্তবায়ন করবে। এ ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো না করে অন্যান্য দেশ কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, সেটি দেখে ধীরেসুস্থে অগ্রসর হওয়ার পরামর্শ দেন এ অর্থনীতিবিদ।
তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বর্তমানে চীনের সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য বিরোধ চলছে। দেশ দুটি ইট মারলে পাটকেল খেতে হবে— এ নীতিতে চলছে। এক দেশ কোনো শুল্ক আরোপ করলে অন্য দেশ পাল্টা আরও বেশি শুল্ক আরোপ করছে। এমন পরিস্থিতিতে চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক পণ্য রপ্তানি কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ চীন থেকে আমদানির ক্ষেত্রে ১২৫ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা কোথা থেকে পোশাক আমদানি করবেন? সে ক্ষেত্রে চীনের রপ্তানি বাজার বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মতো দেশে স্থানান্তরিত হবে। কাজেই যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের বিষয়ে তড়িঘড়ি না করে ধীরেসুস্থে দেনদরবার (নেগোশিয়েশন) চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
পাশাপাশি নিজেদের যে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আছে, তার মধ্য থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে আমাদের বাজার বড় করার চেষ্টা করা উচিত বলে মনে করেন রেহমান সোবহান। সেখানে আরও কয়েক বছর বাংলাদেশের জন্য শুল্কমুক্ত বাজারের সুবিধা আছে। সেই সঙ্গে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের বাজার অনুসন্ধান করতে হবে। এশিয়ার বাজারও আছে; এই মহাদেশ আগামী দিনে বিশ্বের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রবৃদ্ধির মূল কেন্দ্র হবে। আগামী ২৫ বছরের মধ্যে এশিয়া হবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় জায়গা।
রেহমান সোবহান মনে করেন, ‘ট্রাম্পের শুল্কনীতি নিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মোদ্দাকথা হলো, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রপ্তানির একক বৃহত্তম বাজার। সেখানে এত অনিশ্চয়তা থাকলে আমাদের বিকল্প খুঁজতে হবে।’
মূল প্রবন্ধে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানিতে ১৮ কোটি ডলার আমদানি শুল্ক পাওয়া গেছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি পণ্যে ১২৭ কোটি ডলার শুল্ক আদায় করেছে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হওয়া শীর্ষ তিন পণ্যে শুল্ক শূন্য করলে অন্য দেশকে সমান সুবিধা দিতে হবে। এতে বাংলাদেশের মোট শুল্ক লোকসান হবে ১৭ কোটি ডলার। ফলে নিছক শুল্ক হ্রাস করে এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যাবে, বিষয়টি তেমন নয়।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ মার্কিন আমদানিতে গড়ে ৬ দশমিক ২ শতাংশ শুল্ক এবং অন্যান্য শুল্ক আরোপ করে। তবে যখন রিবেট বিবেচনা করা হয়, তখন গড় শুল্ক ২ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসে। এর বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে মার্কিন আমদানিতে গড় শুল্ক ১৫ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
মোস্তাফিজুর রহমান উল্লেখ করেন, ১৯৩০ সালের দিকে একবার যুক্তরাষ্ট্র এমন উদ্যোগ নিয়েছিল। যার ফলে বিশ্বমন্দা দেখা দিয়েছিল। পরে ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য উদারীকরণের দিকে অগ্রসর হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ সালে গ্যাটস এবং ১৯৯৫ সালে ডব্লিউটিও প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব সংগঠন প্রতিষ্ঠা হওয়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রই বেশি লাভবান হয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক বিশ্ব অর্থনীতিকে টালমাটাল করে দেবে। এটি ঘোষণার পর মাত্র চার দিনে যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজার মূলধন হারিয়েছে ৬ ট্রিলিয়ন ডলার। কাজেই ট্রাম্পের এ উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকেই বিপদে ফেলবে।
এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুব উর রহমান বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ মোট যে পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করে তার ৫০ শতাংশ যায় ইউরোপের বাজারে, ২০ শতাংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এবং ১০ শতাংশ যায় যুক্তরাজ্যের বাজারে। বাকি ২০ শতাংশ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে যায়। মার্কিন শুল্কের অভিঘাত মোকাবিলায় অন্য দেশগুলোতে রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে তিনি এশিয়ার বাজারের দিকে নজর দেওয়ার তাগিদ দেন।
তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে এশিয়ার ভোক্তাদের বাজার সবচেয়ে বড়। এখানে সাড়ে তিন বিলিয়ন ভোক্তার অবস্থান। সেই তুলনায় এখানে রপ্তানি কম। এমনকি চীন একটি বড় বাজার হওয়া সত্ত্বেও সেখানে আমাদের রপ্তানি এক বিলিয়ন ডলারের কম। এ ক্ষেত্রে এশিয়ার বাজার হতে পারে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময়।
বাংলাদেশ ট্যারিফ অ্যান্ড ট্রেড কমিশনের সাবেক সদস্য মোস্তফা আবিদ খান বলেন, ‘প্রথমেই বুঝতে হবে এটা পারস্পরিক শুল্ক নয়। ফলে আমরা যতই সাড়া দিই না কেন, লাভ নেই। আমাদের বুঝতে হবে, যুক্তরাষ্ট্র কী চায়। সেজন্য আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।’
ট্রাম্প প্রশাসনকে রোগের সঙ্গে তুলনা করে পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক বলেন, ট্রাম্পের শুল্কনীতি পুরোটা অনিশ্চিত প্রক্রিয়া। তবে মোটা দাগে ধরা যেতে পারে এ শুল্কনীতিতে চীন তাদের মূল টার্গেট।
তিনি আরও বলেন, ‘নির্ধারিত সময় শেষে বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশগুলোর ওপর শুল্ক কিছুটা কমাতে পারে। কিন্তু আমাদের মার্কেটের অবস্থার ওপর ভিত্তি করে বায়ারদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের ৫০ শতাংশ নেগোসিয়েশন করতে হবে। এর জন্য কারখানাগুলোর ব্যাংকের সহায়তা দরকার হবে। তবে এ কাজটা শুধু একটা পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যাওয়া জরুরি, যা আগামী ৯০ দিনের জন্য কার্যকর হবে। তবে আগামীতে আমাদের রপ্তানি কিছুটা কমাতে পারে। এতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। আগামী ৯০ দিন পর পরিস্থিতি যাই হোক, তাতে যেন সরকারের সহযোগিতা থাকে।’
