শৈশব ছিনিয়ে নিয়েছে যুদ্ধ, জানার জীবনে কেবল সংগ্রাম আর ক্ষুধা

আপডেট : ২১ মে ২০২৫, ০৯:০৫ এএম

ধ্বংসস্তূপে পরিণত গাজা শহরের পথে এক হাতে বড় প্লাস্টিকের বালতি নিয়ে এগিয়ে চলেছে ১২ বছরের জানা মোহাম্মদ খলিল মুসলেহ আল-স্কেইফি। তার গায়ে সিন্দারেলা-মুদ্রিত উজ্জ্বল গোলাপি জামা, কিন্তু সেটি যেন তার কাঁধে ভার হয়ে ঝুলে আছে। প্রতিদিনের বাস্তবতা—খাদ্য আর পানির সন্ধানে বের হওয়া—এই যুদ্ধে জর্জরিত শহরে এখন তার জন্য নিয়মিত কাজ।

বড় ভাই ইসরায়েলি স্নাইপারের গুলিতে নিহত হওয়ার পর থেকেই জানার কাঁধে এসেছে পরিবারের দায়িত্ব। হৃদরোগে আক্রান্ত বাবা আর অসুস্থ মাকে নিয়ে দুর্বল এই পরিবারে এখন সেই সবচেয়ে বড় ভরসা।

“আমি চাই না বাবা কষ্ট পান,” জানায় জানা, “তাই আমি শক্ত হতে চাই, যেন বাবার কষ্ট না হয়।”

তীব্র সংকটের মধ্যে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানি সংগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় তাকে। সুশৃঙ্খল কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বহুদিন খালি হাতেই ফিরতে হয়। ভারী বালতিটি টানতে টানতে তার আঙুলগুলো সাদা হয়ে যায়, পানি ছিটকে পড়ে কাপড় ভিজে যায়।

জানার পরিবার এখন গাজার শহরে একটি ভাঙাচোরা বাড়িতে থাকে। আগের বাড়ি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর তারা এখানে আশ্রয় নিয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ও মিত্রদের হামলার পর থেকে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হয়। এর পর অবরোধে ঘেরা এই অঞ্চলে খাদ্য ও পানি সংকট ভয়াবহ রূপ নেয়। প্রায় ১১ সপ্তাহ আগে আরোপিত পূর্ণ অবরোধ পরিস্থিতিকে আরও করুণ করে তুলেছে।

জাতিসংঘ-সমর্থিত এক বিশ্লেষণ বলছে, গাজার প্রতি পাঁচজনের একজন আজ ক্ষুধায় মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছে। ২১ লাখ মানুষের এই উপত্যকা এখন মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে।

ইসরায়েল দাবি করে, এই অবরোধ ও সামরিক অভিযানের উদ্দেশ্য হামাসের হাতে বন্দি থাকা জিম্মিদের মুক্ত করতে চাপ প্রয়োগ করা। তবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, ইসরায়েল যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ক্ষুধাকে ব্যবহার করছে।

স্বচ্ছ পানির সংকট বহুদিনের, যার সমাধানে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির প্রবেশেও বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ইসরায়েল। তাদের দাবি, পানিশোধন ও লবণাক্ত পানি মিষ্টিকরণ যন্ত্রপাতি অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হতে পারে।

মানবিক সহায়তা সংস্থা ‘ডাক্তারস উইদাউট বর্ডারস’ জানিয়েছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত গাজায় সরবরাহের জন্য তারা যে ১ হাজার ৭০০টি পানি ও স্যানিটেশন পণ্য চেয়েছিল, তার দুই-তৃতীয়াংশই অনুমোদন দেয়নি ইসরায়েল।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলমান যুদ্ধে অপুষ্টিতে অন্তত ৫৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জানা জানায়, তার ভাতিজি জানাতও ছিল সেই শিশুদের একজন।

জানার বোন আয়ার সন্তান জানাত জন্ম নেয় ২.৬ কেজি ওজন নিয়ে। কিছুদিনের মধ্যেই তার ওজন বেড়ে দাঁড়ায় ৪ কেজিতে। সব সময় হাসিমুখে থাকা শিশুটি আচমকা অসুস্থ হয়ে পড়ে। ২ মার্চ গাজায় পূর্ণ অবরোধ ঘোষণার পর খাদ্য সংকট শুরু হয়, আয়ার বুকের দুধ কমে আসে, জানাত ওজন হারায়, ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে শোচনীয় পানিশূন্যতায় ভোগে।

২০ মে ২০২৫, গাজার এক শরণার্থী শিবিরে অনেক মানুষ পানি পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করছে।

“হাসপাতাল থেকে বলা হয়েছিল বিশেষ এক ধরনের দুধ প্রয়োজন, যা ওজন বাড়াবে আর ডায়রিয়া বন্ধ করবে,” জানায় আয়া। “পুরো গাজা ঘুরে বেরিয়েছি, কোথাও সেটা পাইনি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সেই দুধ নেই।”

জানাতের অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছিল না, রক্তে চিনি কমে যায়, অক্সিজেন মাত্রাও নেমে আসে। অপুষ্টির কারণে তার কিডনি ও লিভার বিকল হতে শুরু করে, রক্তে জমে যায় অ্যাসিড।

জানাতের মা বলেন, “আমি সারা পৃথিবীর কাছে কাঁদতে কাঁদতে অনুরোধ করেছিলাম—শুধু এই দুধটা কেউ যদি দিয়ে দিত, বাঁচত আমার মেয়ে। কেউ এগিয়ে আসেনি, সবাই শুধু তাকিয়ে ছিল।”

হাসপাতাল থেকে বিদেশে চিকিৎসার অনুমোদনও মিলেছিল। কিন্তু ৪ মে, মাত্র চার মাস বয়সে জানাত মারা যায়। মৃত্যুর সময় তার ওজন ছিল মাত্র ২.৮ কেজি—জন্মের চেয়েও সামান্য বেশি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, গাজায় প্রায় ১২ হাজার রোগীর চিকিৎসার জন্য সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন, অথচ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মাত্র ১২৩ জনকে স্থানান্তর করা গেছে।

পরদিন জানাতের ছবি দেখতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে জানা। বলে, “ওকে বলা হয়েছিল বিদেশে গেলে বাঁচানো যাবে। আমরা অপেক্ষা করছিলাম, বারবার বলা হচ্ছিল ‘শনিবার’ বা ‘রবিবার’। আমরা অপেক্ষা করছিলাম, আর সে মরে গেল।”

ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে জানা বলে, “আমার আর কেউ নেই। আমার মনে হয় আমি বেঁচে নেই। আমি ভিতর থেকে পুরোপুরি ফাঁকা হয়ে গেছি।”

১২ এপ্রিল জানা তার ছোট ভাতিজি জানাতের সঙ্গে খেলছে। এই ভিডিও তোলার তিন সপ্তাহ পর অপুষ্টিতে জানাতের মৃত্যু হয়।

যুদ্ধ জানার পরিবারকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। বড় ভাই, দুলাভাই, এক চাচাতো ভাই ও ভাতিজিকে হারিয়েছে সে। তার মা থাইরয়েড ক্যানসারে ভুগছেন—যার কোনো চিকিৎসাই গাজায় নেই।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, গত ১৮ মাসে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন ৫৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি—যা গাজার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ শতাংশ। অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর আগের গাজাবাসীদের মধ্যে প্রতি ৪০ জনে একজন এখন মৃত।

তবে যারা এখনও বেঁচে আছেন, তাদের শোক করার সময় নেই। প্রতিদিনের টিকে থাকার সংগ্রামই এখানে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।

১২ মে জানা ৫০০ গ্রাম পাস্তা কিনতে পেরেছে ৫০ শেকেল বা প্রায় ১৫ ডলারে। সেই পাস্তা গুঁড়ো করে আটা বানিয়ে রুটি বানায় তারা।

পরদিন পাশের একটি কমিউনিটি কিচেনে খাবার বিতরণ শুরু হতেই আশেপাশের ক্ষুধার্ত শিশুরা হাহাকার করতে করতে ভিড় করে। কান্নার মধ্যে পাত্র বাড়িয়ে দেয় সবাই।

সপ্তাহান্তে ইসরায়েল গাজায় ভয়াবহ নতুন স্থল অভিযান শুরু করেছে।

জানা ভাগ্যবান—তার পাত্রে পড়ে জলময় টমেটো সসে ভেজানো দুই স্কুপ পাস্তা। ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত হলেও মুখে ফুটে ওঠে ক্ষীণ এক হাসি। সে বাড়ি না পৌঁছানো পর্যন্ত খাবারে হাত দেয় না—তখন কেবল সবার সঙ্গে ভাগ করে খেতে বসে।

একসময় স্কুলে যেত জানা, নাচত মঞ্চে, বন্ধুদের সঙ্গে মিলে জামা পরে পারফর্ম করত। এখন তার ঘর ধ্বংসপ্রায়, নেই বিদ্যুৎ, নেই নিরাপদ পানি, নেই খাদ্য। তার শৈশব এখন শুধুই বেঁচে থাকার সংগ্রামে বন্দি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত