‘বাংলাদেশ যেন কোনো পরাশক্তির ছায়াযুদ্ধে পরিণত না হয়’

আপডেট : ২২ মে ২০২৫, ০২:১০ পিএম

বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১২টায় রাজধানীর বিজয়নগরে দলীয় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘চট্টগ্রাম বন্দর ও মানবিক করিডোর’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এ আহ্বান জানান দলের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশ যেন কোনো পরাশক্তির ছায়াযুদ্ধে পরিণত না হয়, সে বিষয়টি সবাইকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।” একইসঙ্গে তিনি বলেন, প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিরাপত্তা ও সম্মানের সঙ্গে তাদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঐকমত্য গড়ে তোলা জরুরি।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন এবি পার্টির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক প্রফেসর ডা. মেজর (অব.) আব্দুল ওহাব মিনার, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার সাদাত টুটুল ও আলতাফ হোসাইন, সাংগঠনিক সম্পাদক সাঈদ নোমান এবং ছাত্রপক্ষের আহ্বায়ক মোহাম্মদ প্রিন্স।

চট্টগ্রাম বন্দর ও মানবিক করিডোর প্রসঙ্গে দলের অবস্থান তুলে ধরে ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, “বিদেশি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান মানেই জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে—এমন নেতিবাচক ও ষড়যন্ত্রমূলক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণযোগ্য নয়। সঠিক চুক্তি, স্পষ্ট জবাবদিহিতা, কার্যকর তদারকি এবং জাতীয় স্বার্থের নিশ্চয়তা থাকলে এমন ব্যবস্থাপনা বরং উন্নয়নের গতি বাড়ায়।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই চট্টগ্রাম বন্দর দক্ষ ব্যবস্থাপনার ছোঁয়ায় একটি আন্তর্জাতিক লজিস্টিক হাবে পরিণত হোক—যেখানে থাকবে সময়ের মূল্যায়ন, পরিবেশ ও প্রযুক্তির ব্যবহার, স্বচ্ছতা ও সর্বোপরি জবাবদিহিতা।”

তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, “বাংলাদেশের অনেক আন্তর্জাতিক মানের হোটেল যেমন Radisson, InterContinental, Marriott, Le Méridien ইত্যাদি আন্তর্জাতিক হোটেল চেইনের ব্যবস্থাপনায় চলছে। কিন্তু এতে কি আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে? মোটেও নয়। বরং বিশ্বমানের ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমাদের পর্যটন খাত, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে।”

এবি পার্টি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (বিডা) চারটি বিষয়ে জাতির কাছে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে:

১. বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির আগে তাদের অতীত রেকর্ড, পরিচালন-দক্ষতা এবং চুক্তির শর্তাবলি, যতটা সম্ভব দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার ভিত্তিতে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।

২. চুক্তির মাধ্যমে যেন দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা কোনোভাবেই আপসের শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

৩. স্থানীয় জনশক্তি, শ্রমিকের স্বার্থ এবং দেশের অর্থনৈতিক লাভের দিকগুলো চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।

৪. পুরো প্রক্রিয়াকে করতে হবে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং জাতীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য।

এবি পার্টি মনে করে, চট্টগ্রাম বন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার এ উদ্যোগ যদি দূরদর্শী, স্বচ্ছ ও দেশপ্রেমের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তবে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ নতুন অর্থনৈতিক উচ্চতায় পৌঁছাবে। 

ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, “পেছনের দরজার চুক্তি নয়, জনস্বার্থ ও তথ্য-উন্মুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হলে এই বন্দর হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার পরবর্তী সিঙ্গাপুরের ভিত্তিপ্রস্তর।”

এ সময় তথাকথিত ‘মানবিক করিডোর’ প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন তিনি। বলেন, “বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১৩ লাখ (বাস্তবে ১৭ থেকে ২০ লাখ) রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে দীর্ঘদিন ধরে মানবেতর জীবনযাপন করছে। এই বাস্তবতায় ‘মানবিক করিডোর’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবকে জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক ভারসাম্যের দৃষ্টিকোণ থেকে গভীরভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।”

এবি পার্টি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানের গতকাল বুধবার বিকেলের বক্তব্য ও ব্যাখ্যাকে স্বাগত জানায় এবং অভ্যন্তরীণ সরকারের অবস্থান, বিলম্বে হলেও পরিষ্কার করায় প্রশংসা করে।

দলের মতে, আরাকান এখনো রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ নয়। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার মতে, রাখাইন রাজ্যে এখনো রোহিঙ্গারা সহিংসতা, বৈষম্য ও নাগরিক অধিকারহীনতার শিকার। এমন পরিস্থিতিতে যদি “মানবিক করিডোর” গড়ে তোলা হয়, তবে বাংলাদেশ অনিচ্ছাকৃতভাবে এক ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে, যা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না।

ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, “রোহিঙ্গা সংকট বা মানবিক করিডোর—এটি কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। তাই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে এ বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য গঠন জরুরি। নিরাপদ, টেকসই ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনই রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র গ্রহণযোগ্য সমাধান। এটিই হওয়া উচিত বাংলাদেশের আলোচনার কেন্দ্রে।”

তিনি জোর দিয়ে বলেন, “বাংলাদেশের ভূখণ্ড, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা ও আত্মমর্যাদার প্রশ্নে কোনো বিদেশি চাপ, আন্তঃরাষ্ট্রীয় খেলা বা কৌশলগত চালচিত্র বরদাশত করা হবে না। রোহিঙ্গা সংকটে আমরা মানবিক হতে চাই, তবে সাহসী ও বাস্তবভিত্তিক সমাধান চাই। সেই সমাধান হতে হবে বাংলাদেশের নেতৃত্বে, দেশের স্বার্থ সুরক্ষার ভিত্তিতে।”

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন এবি পার্টির ঢাকা মহানগর উত্তরের সাধারণ সম্পাদক সেলিম খান, আন্তর্জাতিক বিভাগের সদস্য হাজরা মাহজাবিন, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এনামুল হক, আমেনা বেগম, রাশেদা আক্তার মিতু, কেন্দ্রীয় সহকারী অর্থ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক, সহকারী দপ্তর সম্পাদক মশিউর রহমান মিলু, অ্যাডভোকেট শরণ চৌধুরী, ঢাকা মহানগর উত্তরের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রব জামিলসহ কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের নেতারা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত