কড়াইলের ফিনিক্স প্যারিসে

আপডেট : ২৮ মে ২০২৫, ০৩:০০ এএম

প্যারিসের গ্র্যান্ড প্যালেসে রেভেলেশনস বিয়েনালে সুবর্ণা  মোর্শেদার ‘সব বাধা  পেরিয়ে’ প্রদর্শনী ঢাকার কড়াইল বস্তির মানুষের জীবন ও সংগ্রামকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেছে। এই শিল্পযাত্রা নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব

সুবর্ণা মোর্শেদার শিল্পে প্রান্তিকতার গৌরবগাথা: প্যারিসের ঐতিহ্যবাহী গ্র্যান্ড প্যালেস যখন রেভেলেশনস ইন্টারন্যাশনাল ফাইন ক্রাফট অ্যান্ড ক্রিয়েশন বিয়েনালের আলোর সঞ্চারক হয়ে ওঠে, তখন তাতে বাংলাদেশের এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হন শিল্পী ও কিউরেটর সুবর্ণা মোর্শেদা। তার কিউরেট করা ও নির্মিত প্রদর্শনী ‘সব বাধা পেরিয়ে’ ছিল এক সস্নেহ শিল্পপ্রকল্প প্রান্তিক মানুষের জীবনযাপন, সংগ্রাম ও সাহসিকতার এক মানবিক মহাকাব্য। ঢাকা শহরের বুকের ভেতর এক দীর্ঘশ্বাস হয়ে থাকা কড়াইল বস্তির মানুষের গল্প, সুবর্ণা বুনেছেন রঙ, উপকরণ আর প্রতীকের ভাষায়; সেই ভাষা পার করেছে সব ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক সীমানা।

ফিনিক্সের ছায়ায় জাগরণ

প্রদর্শনীর কেন্দ্রীয় আকর্ষণ, ‘দ্য ফিনিক্স অব রিনিউয়াল’, এক অপার্থিব পাখির অবয়ব নিয়ে দর্শকদের হৃদয়ে জাগিয়ে তোলে প্রত্যয়ের আলো। ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের প্যাকেট ও পোশাকের উচ্ছিষ্টাংশ দিয়ে তৈরি এই সুউচ্চ ভাস্কর্য কেবল এক শিল্পবস্তুই নয়, বরং এক সংগ্রামী জনপদের জীবনীশক্তির মূর্তরূপ। ফিনিক্সের প্রতীকে যেন ফিরে ফিরে আসে কড়াইলের নারীরা, যারা প্রতিদিনের ক্লান্তি ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও আবার জেগে ওঠেন, আবার পথচলা শুরু করেন। সুবর্ণার চোখে তারা কেবল সহনশীল নয়, বরং পুনর্নির্মাণের স্থপতি নিজ নিজ জীবনের, পরিবার ও সমাজের পরিধিতে।

কাঁথার সেলাইয়ে বোনা আত্মকথা

‘কুইল্টস অব রেজিলিয়েন্স’ নামে সুবর্ণা তুলে এনেছেন বাংলার নকশিকাঁথা ঐতিহ্যের নতুন পাঠ। কাঁথার চেনা সেলাইয়ে তিনি সঁপে দিয়েছেন অচেনা মানুষের জানা কষ্ট, স্বপ্ন, হাসি আর প্রতিবাদ। কড়াইলের দিনমজুর, গৃহকর্মী, ফেরিওয়ালা কিংবা স্কুলবিমুখ শিশুর ছোট ছোট মুহূর্তগুলো কাঁথার মতোই ধৈর্যের সুতোয় বোনা হয়েছে এই শিল্পে। এখানে কাঁথা কেবল নারীদের গৃহজীবনের স্মারক নয়, বরং এক সম্মিলিত স্মৃতির বুনন প্রান্তিকতার মধ্যেও বন্ধনের, ভালোবাসার ও আশার ঐক্যবন্ধনের।

স্বপ্নযাত্রার ঘণ্টাধ্বনি : সবচেয়ে কোমল ও কাব্যিক প্রক্ষেপণ আসে ‘থ্রেডস অব হোপ’-এর মধ্য দিয়ে যা যেন এক স্বপ্ন-ক্যাচার, ধরা না পড়া আকাক্সক্ষার শিল্পিত ফাঁদ। নানা রঙের সুতোয় গাঁথা ছোট ছোট বার্তা যেখানে লেখা আছে ‘আমি ডাক্তার হতে চাই’, ‘আমি পড়তে চাই’, বা ‘আমার একটা ঘর চাই’। ঘণ্টার মৃদু শব্দে সেই স্বপ্নগুলো যেন কানে কানে বলে ওঠে, ‘আমিও মানুষ, আমিও পারি।’ সুবর্ণা বলেন, ‘শিল্প মানুষের অন্তর্লীন আকাক্সক্ষাকে দৃশ্যমান করে তোলে’ এই একবাক্যেই তিনি নিজ শিল্পভাবনার সারাংশ জানিয়ে দেন।

উপকরণের ভাষা ও প্রতিবাদ : সুবর্ণার কাজের আরেকটি অনন্য মাত্রা টের পাওয়া যায় তার উপকরণ নির্বাচনের রাজনীতি ও কাব্যে। কুড়িয়ে পাওয়া প্লাস্টিকের মোড়ক, ভাঙা ধাতব টুকরো, পরিত্যক্ত কাগজ সবই তার হাতে হয়ে ওঠে কবিতার নন্দন। তিনি দেখান, কেবল মানুষই নয়, বস্তুও প্রান্তিক হয়, কিন্তু প্রত্যেকেরই আছে উড়বার সম্ভাবনা। শিল্পীর কণ্ঠে উচ্চারিত একটি বাক্য, ‘ঠিক কড়াইলের মানুষের মতো সবকিছুরই সম্ভাবনা আছে’, যেন একসঙ্গে আর্তি ও আহ্বান সমাজের প্রান্তঘেঁষা অস্তিত্বগুলোকে নতুন চোখে দেখার।

শেষ কথন : ‘সব বাধা পেরিয়ে’ কেবল একটি শিল্পপ্রদর্শনী নয়, এটি এক নৈতিক বিবৃতি, এক কিউরেটর শিল্পীর পক্ষ থেকে সমাজবিচ্ছিন্ন মানুষদের পক্ষে দৃঢ় স্বর। প্যারিসের মতো দ্যুতিময় আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই প্রদর্শনী যেন কড়াইলের ছোট্ট কুঁড়েঘরের জানালা খুলে দেয় বিশ্বদর্শনের দিকে। সুবর্ণা মোর্শেদার শিল্পে সৃজনশীলতা ও সহানুভূতির সংলাপ ঘটে যেখানে দারিদ্র্য, সম্ভাবনা ও সৌন্দর্য একত্রে বাস করে।ৎ এই প্রদর্শনী শিল্পের ভাষায় মানবতার এমন এক অধ্যায় রচনা করেছে, যা শুধু চোখে দেখা যায় না অনুভবে বাজে, অন্তর্দৃষ্টিতে গেঁথে থাকে। সব বাধা পেরিয়ে, সত্যিই এক নবজন্মের উচ্চারণ।

রেভেলেশনস দ্বিবার্ষিকী

প্যারিসের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড প্যালেসে অনুষ্ঠিত রেভেলেশনস ইন্টারন্যাশনাল ফাইন ক্রাফট অ্যান্ড ক্রিয়েশন দ্বিবার্ষিকী (Révélations International Fine Craft & Creation Biennial) বিশ্বজুড়ে ফাইন ক্রাফট এবং সৃজনশীলতার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রদর্শনী হিসেবে পরিচিত। এই দ্বিবার্ষিকী শুধুমাত্র একটি শিল্প প্রদর্শনী নয়, এটি বিভিন্ন সংস্কৃতি ও কারিগরি ঐতিহ্যের মিলনমেলা, যেখানে সমসাময়িক ডিজাইন এবং ব্যতিক্রমী কারুশিল্পের উদযাপন ঘটে। প্রতি দুই বছর অন্তর আয়োজিত এই অনুষ্ঠানটি শিল্পী, কারিগর, গ্যালারি মালিক, সংগ্রাহক এবং শিল্প সমালোচকদের জন্য একটি অপরিহার্য প্ল্যাটফর্ম। এখানে বিশ্বের সেরা কারুশিল্পীরা তাদের উদ্ভাবনী কাজ প্রদর্শন করার সুযোগ পান এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের পরিচিতি লাভ করেন। রেভেলেশনস দ্বিবার্ষিকী তার ব্যতিক্রমী মানের শিল্পকর্ম এবং এর আন্তর্জাতিক পরিধির জন্য বিখ্যাত। এখানে কাঠ, ধাতু, কাচ, সিরামিক, টেক্সটাইল এবং অন্যান্য বিভিন্ন উপকরণে তৈরি অত্যাশ্চর্য শিল্পকর্ম দেখা যায়। ঐতিহ্যবাহী কৌশল এবং আধুনিক ডিজাইনের সংমিশ্রণে তৈরি এই কাজগুলো  কারুশিল্পের অসীম সম্ভাবনাকে তুলে ধরে। এই বছর, ২০২৫ সালের ২১ থেকে ২৫ মে পর্যন্ত অনুষ্ঠিত দ্বিবার্ষিকীতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এই প্রথমবার কোনো বাংলাদেশি শিল্পী তাদের কাজ নিয়ে এই আন্তর্জাতিক মঞ্চে অংশ নিয়েছেন। এটি বাংলাদেশের শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনের জন্য একটি অত্যন্ত গর্বের মুহূর্ত এবং বিশ্ব দরবারে দেশের সৃজনশীল প্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ।

দুর্জয় বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন

শিল্পের পৃষ্ঠপোষক এবং সুযোগ সৃষ্টিকারী : দুর্জয় বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান যা বাংলাদেশের শিল্প, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার লক্ষ্যে কাজ করে। এই ফাউন্ডেশন বাংলাদেশি শিল্পীদের আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে, যা তাদের কাজকে বৃহত্তর দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে সহায়ক। দুর্জয় বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন শুধুমাত্র শিল্পকলার প্রচারেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দেশের ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের উৎসাহিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে। দুর্জয় বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের সহায়তায় শিল্পী সুবর্ণা মোর্শেদার রেভেলেশনস দ্বিবার্ষিকীতে অংশগ্রহণ বাংলাদেশের শিল্পকলার ইতিহাসে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। দুর্জয় বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন শিল্পীর কাজ নির্বাচন, পরিবহন এবং প্রদর্শনী সংক্রান্ত যাবতীয় সহায়তা প্রদান করেছে। এর মাধ্যমে, বাংলাদেশের একজন শিল্পী বিশ্বসেরা কারুশিল্পীদের সঙ্গে একই মঞ্চে নিজেদের কাজ তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছেন। এটি অন্য বাংলাদেশি শিল্পীদের জন্যও একটি অনুপ্রেরণা এবং ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের অংশগ্রহণের পথ প্রশস্ত করবে। দুর্জয় বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের এই উদ্যোগ বাংলাদেশের শিল্পকলাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আরও দৃশ্যমান করে তুলবে এবং দেশের সাংস্কৃতিক ভাবমূর্তিকে আরও উজ্জ্বল করবে। এই ফাউন্ডেশন নীরবে দেশের শিল্প ও সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকে আরও শক্তিশালী করতে বদ্ধপরিকর। তাদের এই সহযোগিতা শুধুমাত্র একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি সমগ্র বাংলাদেশের শিল্পকলার জন্য একটি সম্মিলিত অর্জন। সুবর্ণা মোর্শেদার অংশগ্রহণ এবং দুর্জয় বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের সমর্থন প্যারিসের রেভেলেশনস ইন্টারন্যাশনাল ফাইন ক্রাফট অ্যান্ড ক্রিয়েশন দ্বিবার্ষিকীতে বাংলাদেশের একটি শক্তিশালী এবং ইতিবাচক উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে। এটি নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতে আরও অনেক বাংলাদেশি শিল্পীকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাদের প্রতিভা প্রদর্শনের জন্য উৎসাহিত করবে।

ফিনিক্স পাখির গল্প

রোদে পোড়া মরুভূমির মাঝখানে, এক পাথরের চূড়ায়, দাঁড়িয়ে থাকে সে নিঃসঙ্গ, দীপ্তিমান, অলৌকিক। তার চোখে চিরন্তন রাতের ছায়া, তার ডানায় রক্তিম সূর্যোদয়ের রঙ। এই পাখির নাম ফিনিক্স। সে জন্ম নেয় আগুনে, পুড়ে যায় আলোর  ভেতর, আবার জন্মায় নিজের ছাই থেকে যেন মৃত্যুই তার প্রকৃত জন্ম, আর পুড়ে যাওয়াই তার অবিনশ্বরতা। ফিনিক্সের জীবন একটি বৃত্ত। শতবর্ষে একবার, যখন তার শরীর ক্লান্ত, ডানা ভারী, হৃদয় নিঃশেষ সে নিজেই সাজায় নিজের চিতা। জ্বালিয়ে দেয় নিজেকে, এক পবিত্র আত্মদহন। চারদিকে তখন ছড়িয়ে পড়ে আগুনের ফুলকি, আকাশে ওঠে ধোঁয়ার নৃত্য। পাখিটির সোনালি পালক একে একে আগুনে দগ্ধ হয়, তার গলা থেকে ভেসে আসে শেষ গান এক চিরন্তন বিদায়ের স্তবক। সে গানে থাকে অতীতের যন্ত্রণা, ভবিষ্যতের প্রত্যয়, আর বর্তমানের জ্বলন্ত শুদ্ধতা। অবশেষে যখন সব নিস্তব্ধ, ছাইয়ের স্তূপের নিচে কেঁপে ওঠে এক অদৃশ্য শ্বাস। ফিনিক্স ফিরে আসে। পুনর্জন্মের সেই মুহূর্তে সে আর এক পাখি নয় সে হয়ে ওঠে প্রতীক, হয়ে ওঠে প্রতিজ্ঞা। তার ছাইয়ের ভেতর থাকে কালো অন্ধকারের স্মৃতি, আর তার জাগরণে থাকে আলোয় রাঙা প্রতিশ্রুতি। এই ফিনিক্স কেবল একটি পাখির কল্পকাহিনি নয়। সে আমাদের সবার মধ্যে লুকিয়ে থাকা প্রাণশক্তির প্রতিচ্ছবি ভেঙে পড়ার পরও উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা, হারিয়ে গিয়েও ফিরে আসার সাহস, ধ্বংসের বুক চিরে সৃষ্টি করার দুর্নিবার আকাক্সক্ষা। মানুষও ফিনিক্সের মতো। কোনো একান্ত ক্ষণের প্রলয়ে আমরা পুড়ে যাই ভেতরটা ভেঙে যায়, ভালোবাসা খসে পড়ে, বিশ্বাস ছাই হয়ে যায়। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই, আমাদের ভেতরের ছোট্ট একটি স্ফুলিঙ্গ বলে ওঠে ‘শেষ নয়, এখনো অনেক কিছু বাকি আছে।’ সেই আগুনেই জন্ম নেয় নতুন আমরা। আরও শক্তিশালী, আরও কোমল, আরও দীপ্ত। সেই স্ফুলিঙ্গকে নিয়ে শিল্প করেছেন শিল্পী সুবর্ণা। করাইল বস্তির সেই সব মানুষই হয়ে উঠেছেন একেকজন আগুন-পাখি। ফিনিক্স তাই শুধু এক কিংবদন্তি নয়, সে এক জীবনদর্শন। যে জীবনদর্শনকে উদযাপন করেছেন তীক্ষè মানবিকবোধসম্পন্ন শিল্পী সুবর্ণা। সুবর্ণার শিল্প তৈরির এই দৃষ্টিভঙ্গি মনে করিয়ে দেয় এস এম সুলতানের কথা। যিনি বাংলার মানুষদের দেখেছিলেন বলশালী সুগঠিত প্রাণ হিসেবে। প্রতিবার পতনের মধ্যে সে মনে করিয়ে দেয়, পুড়ে যাওয়ার মধ্যেই নিহিত আছে নতুন জন্মের বীজ। মৃত্যুর গহ্বরে গোপন থাকে এক বিস্ময়কর প্রত্যাবর্তনের গল্প।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত