পুশইনে মানবতা লঙ্ঘিত হচ্ছে

  • ভারত পুশইন করে অন্যায় করছে
  • এটা মানবতার চরম লঙ্ঘন
  • সরকারের নীরবতা প্রশ্ন জাগায়
  • এ নিয়ে বোঝাপড়া দরকার 
আপডেট : ৩১ মে ২০২৫, ০১:১২ এএম

ভারত পুশইন করে বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যায় করছে। এটা মানবতার চরম লঙ্ঘন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলেন, ভারতকে এর শক্ত জবাব দেওয়ার এখনই সময়। অন্তর্বর্তী সরকার কেন নীরব, সেটিই এখন প্রশ্ন।

এ ব্যাপারে দেশ রূপান্তরকে তারা বলেন, পুশইনের ব্যাপারে এখনই সরকারের কঠোর হওয়া উচিত। না হলে অল্প কিছুদিনের মধ্যে আরও জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে বাংলাদেশকে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করে এর কারণ জানা দরকার। প্রয়োজনে অন্য দেশগুলোর কূটনীতিকদের সঙ্গে পরামর্শ করা দরকার। ভারতের সঙ্গে পুশইন বিষয়ে বোঝাপড়া করা উচিত। 

আন্তর্জাতিক সম্পর্কোন্নয়ন, নিরাপত্তা ও কূটনীতিক বিশ্লেষকরা বলেন, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে চরম অন্যায় করছে। কেন করছে, সরকার কেন নীরব, সেটি তাদের বোধগম্য নয়। প্রায় প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে পুশইন করছে ভারতের সীমান্ত পাহারাদার বিএসএফ। গতকালও মৌলভীবাজারের জুড়ী ও কমলগঞ্জ উপজেলার তিনটি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে ২৯ জন বাংলাদেশিকে পুশইন করেছে বিএসএফ। খাগড়াছড়ির মাটিরাঙা সীমান্ত দিয়ে ফের ১৯ জনকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে পুশইন করেছে বিএসএফ। হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার রেমা-কালেঙ্গা জঙ্গল সীমান্ত দিয়ে ২২ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ৯ জন পুরুষ, ৮ জন নারী ও ৫ জন শিশু। কোনো প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই প্রতিদিন পুশইনের ঘটনা ঘটে যাচ্ছে।

জানা গেছে, বিএসএফ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে বাংলাদেশি এসব মানুষকে ধরে সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় জড়ো করে। তারপর রাতের আঁধারে বাংলাদেশ ঠেলে পাঠায়।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদে পুশইন হওয়া ব্যক্তিরা জানান, তারা জীবিকার সন্ধানে বিভিন্ন সময় ভারতে গিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাস করছিলেন। নিয়মকানুন না মেনেই তাদের আটক করা হয় এবং সুযোগ বুঝে পুশইন করা হয়। এ কারণে সীমান্তবর্তী প্রায় সব এলাকায় উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। এখনই বিষয়টির সুরাহায় না গেলে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কোন্নয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহাদুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইস্যুটি নিয়ে দ্রুততার সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অ্যাকশনে যাওয়া উচিত। প্রমাণসহ দেখানো উচিত যে, তারা অন্যায় করছে। প্রয়োজন হলে পশ্চিমা কূটনীতিকসহ হেলিকপ্টারে করে ভারতে চলে যাওয়া উচিত। অন দ্য স্পট দেখানো উচিত, কীভাবে অন্যায় করছে ভারত।’

তিনি বলেন, ‘অবৈধ হলেও তো একটা নিয়ম আছে। নিয়ম মেনে ফেরত পাঠাক। এখন ভারত যেটা করছে সেটা সহজ করে বললে সন্ত্রাসী আচরণ। বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলকে জানানো। কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে কড়া ভাষায় প্রতিবাদ করা। কিন্তু সরকার তা করছে না। কেন, সেটাই রহস্য।’

এই অধ্যাপক বলেন, পুশইন নিয়ে ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করা উচিত। প্রয়োজনে পশ্চিমা কূটনীতিকসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে দ্রুত ভারত চলে যাওয়া উচিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কোন্নয়ন বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) মধ্যে পতাকা মিটিং হওয়া দরকার। ভারতের হাইকমিশনকে জানানো উচিত, কেন এটা হচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কোনো মাইগ্রেশন আইন নেই। যদিও ভারত বলছে অবৈধ মাইগ্রেশন। কিন্তু বিষয়টি অবৈধ তখনই হবে, যখন বৈধ কোনো কাঠামো থাকবে। ৭৩-এর মুজিব-ইন্দিরা অ্যাগ্রিমেন্টের পর দুই দেশ ঠিক করেছে যে, এটাই হচ্ছে কাঠামো।’

তিনি বলেন, ‘ভারতে বাংলাদেশের এমন অনেকে আছে হয়তো ১০-১৫ বছর সে দেশে থেকে সেখানকার আইন অনুযায়ী ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে ভারতের অর্থনীতিতে অংশীদারত্ব ও অবদান রাখছে। এখন তাদের কী হবে? তারা তো কাজ ছাড়া সেখানে থাকেনি। বরং দেখা দরকার তারা কী কাজ করে ওখানে ছিল। কত বেতন পেত। যাদের পাঠানো হচ্ছে তাদের শ্রমের মূল্য ঠিকঠাক দেওয়া হয়েছে কি না।’

এ অধ্যাপক বলেন, ‘এত বছর পর তাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে, এটা তো বড় আকারের হিউম্যান ভায়োলেন্স। যদি প্রথম পাঁচ-দশ দিনেই দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হতো তাহলে ঠিক ছিল। আমার মনে হয়, বিষয়টি নিয়ে দুটি দেশেরই বসা দরকার। আমাদের হিউম্যান রাইট অ্যাকটিভিস্টদের মাথায় এটা ঢুকল না কেন? আমাদের হিউম্যান রাইট অ্যাকটিভিস্টরাও তো ভারতের হিউম্যান রাইট অ্যাকটিভিস্টদের সঙ্গে ইস্যুটি নিয়ে বসতে পারে। বাংলাদেশ সরকারও পেছন থেকে তাদের সহায়তা করতে পারে। দুই দেশের মিডিয়াও এ বিষয়ে কাজ করতে পারে। প্রযুক্তির মাধ্যমে মিটিং কনফারেন্স করা যায়। এসবের কিছুই আমি দেখছি না।’

এ প্রসঙ্গে নিরাপত্তা বিশ্লেষক আ ল ম ফজলুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি একটি কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। কমিশনের রিপোর্ট জমা দেওয়া শেষ হয়ে গেলে এ ইস্যুতে আমি কথা বলব।’

ভারত সরকারের পুশইনকে ভালো চোখে দেখছেন না জানিয়ে সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ধাক্কাধাক্কি করে একটি দেশে বসবাসকারী মানুষকে পাঠিয়ে দিলাম, এটি যুক্তিযুক্ত হতে পারে না। পুশইনের আগে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা উচিত। নিয়ম না মানা হলে এটি মানবতাবর্জিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত