বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। প্রতি ডলারের দাম ১২০ টাকা ধরে হিসেব করে এর পরিমাণ দাড়িয়েছে ২৮ লাখ কোটি টাকা। এই হিসাবে প্রতিবছর গড়ে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে বলে অর্থনীতি নিয়ে তৈরি শ্বেতপত্র প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। তবে এই পাঁচার করা অর্থে এবারে সরকার কর বসানোর ঘোষণা দিয়েছে, বিধান রাখা হচ্ছে জরিমানার।
সোমবার (২ জুন) অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, জন্মসূত্রে বাংলাদেশি ছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করেছেন। এমন ব্যক্তি কর্তৃক বাংলাদেশ অর্জিত আয়ের ওপর যদি যথাযথভাবে কর পরিশোধ না করে বিদেশে পাচার করা হয়ে থাকে সেসব সম্পদের উপর কর ও জরিমানা আরোপের বিধান করা হয়েছে।
বিগত সরকারের আমলে দেশ থেকে রেকর্ড পরিমাণ টাকা পাচার করা হয়েছে। এই তালিকায় শীর্ষে ছিলেন এসআলম গ্রুপ। গ্রুপটির কর্ণধার যারা এই টাকা পাচারে জড়িত ছিলেন তারা সবাই বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করেছেন। এর আগে সামিট গ্রুপের কর্ণধার আজিজ খান তার নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করেছেন। আবার অনেক সরকারি আমলা, বিত্তবান, সহ অনেকে মানুষের সন্তানরা বিদেশে পড়াশোনা করতে গিয়ে আর ফেরত আসেন না এবং তাদের মধ্যেও নাগরিকত্ব পরিত্যাগের উদাহরণ রয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আর্থিক খাতের চিত্র তুলে ধরতে একটি শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি করে। এই কমিটি আর্থিক খাতের নানা সংকট ও সংস্কারের বিষয়ে তাদের প্রতিবেদন তুলে ধরে। এই প্রতিবেদনে বলা হয়, গত কয়েক বছরে অর্থ পাচার বাংলাদেশে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। টাকা পাচারের বিষয়টিকে অর্থনীতিতে ক্ষতিকর টিউমার হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। বিগত সরকারের আমলে অর্থনীতি ও সম্পদের বড় অংশ এই ক্ষতিকর টিমার চুষে নেয়।
শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি মনে করে, প্রতিবছর মোট দেশজ উৎপাদনের ৩ দশমিক ৪ শতাংশের পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ও প্রবাস আয় থেকে যত অর্থ এসেছে এর পাচ ভাগের একভাগ অর্থ এক বছরে পাচায় হয়। বিদেশি ঋণ ও বিনিয়োগ হিসেবে যত অর্থ আসে, এর দ্বিগুণ পরিমাণ অর্থ পাচার হয়।
শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রধান ছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দ্রেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তার এই প্রতিবেদেনে বলা হয়- টাকা পাচারের জন্য দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আর্থিক খাতের ক্রীড়নক, আমলাদের মধ্যে এক ধরনের অনৈতিক চক্র গড়ে উঠে। ঘুষ-দুর্নীতি, আর্থিক অপরাধ, মিথ্যা ঘোষণার আড়ালে বাণিজ্য, ব্যাংক থেকে টাকা লুটপাট, খেলাপি ঋণের অর্থ, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রকল্পের খরচ বাড়িয়ে দেখানো, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, কর ফাঁকির মাধ্যমে অর্জিত অর্থগুলোই মূলত পাচার হয়।
যুক্তরাষ্ট, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, হংকং, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভারতসহ করের অভয়ারন্য নামে পরিচিত ছোট ছোট অনেক দেশে বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচার হয়েছে। মূলত বাড়ি কিনে এবং ব্যবসায় বিনিয়োগ করে এসব টাকা পাচার করা হয়। যেমন দুবাইয়ে বাংলাদেশিদের ৫৩২টি বাড়ি বা সম্পদ আছে, সার মূল্য সাড়ে ৩৭ কোটি ডলার। ২০২৪ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত ৩ হাজার ৬০০ বাংলাদেশি মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম কর্মসূচিতে মনোনীয় হয়েছেন। ২০২৩ সালে ইউ ট্যাক্স অবজারভেটরি প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২১ সালে বাংলাদেশ থেকে ৮১৫ কোটি ডলার পাচার হয়।
