এক্সবিবি কতটা ভয়ানক? যা বলছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা

আপডেট : ১০ জুন ২০২৫, ১১:০০ এএম

অমিক্রনের দুটি উপধরন—BA.2.10.1 ও BA.2.75—মিলিয়ে তৈরি হয়েছে করোনাভাইরাসের নতুন এক রূপ, যার নাম এক্সবিবি। এই ভ্যারিয়েন্টটি প্রথম দেখা যায় ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে, তারপর তা ধীরে ধীরে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

এক্সবিবি: কী রয়েছে বৈশিষ্ট্যে?

এক্সবিবি অত্যন্ত দ্রুত ছড়ায় এবং এতে রয়েছে ‘ইমিউন এস্কেপ’ ক্ষমতা, অর্থাৎ যারা আগেই সংক্রমিত হয়েছেন বা টিকা নিয়েছেন, তাদের শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকেও এ ভ্যারিয়েন্ট কিছুটা ফাঁকি দিতে পারে। তবে এখনো পর্যন্ত এক্সবিবি সংক্রমণে মারাত্মক অসুস্থতা বা মৃত্যুহার বেড়েছে—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মেলেনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যাঁরা এক্সবিবি-ভিত্তিক আপডেটেড বুস্টার ডোজ নিয়েছেন, তাঁদের গুরুতর অসুস্থতা, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া কিংবা মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। যদিও এই ভ্যারিয়েন্ট টিকা নেওয়ার পরও সংক্রমণ ঘটাতে পারে, তবে জটিলতা প্রতিরোধে টিকা কার্যকর ভূমিকা রাখে।

এক্সবিবি থেকে জন্ম নেওয়া আরও ধরন

এক্সবিবি-র বিকাশ থেকে তৈরি হয়েছে আরও কয়েকটি উপধরন—যেমন এক্সবিবি.১, এক্সবিবি.১.৫ এবং সাম্প্রতিক আলোচনায় থাকা এনবি.১.৮.১। এসবের কিছু কিছু ধরন আগের চেয়ে আরও বেশি সংক্রামক হলেও বর্তমান টিকাগুলো এখনও সেগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর।

বৈশ্বিক পর্যবেক্ষণ: ডব্লিউএইচও ও জিভিএনের মত

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এক্সবিবি ও এর সংশ্লিষ্ট উপধরনগুলোকে ‘Variant of Interest’ বা ‘Variant Under Monitoring’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর অর্থ হলো, এই ধরনগুলোর ওপর বৈজ্ঞানিকভাবে নিবিড় নজরদারি চালানো হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এগুলো জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

গ্লোবাল ভাইরাস নেটওয়ার্ক (জিভিএন) জানায়, এক্সবিবি অত্যন্ত সংক্রামক হলেও গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ানোর মতো কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। সংস্থাটি সবাইকে টিকা নেওয়ার পাশাপাশি সাবধানতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে।

সাধারণ মানুষের করণীয়

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এক্সবিবি ও এর উপধরনগুলো নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়াই সঠিক পথ। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় যেসব পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো—

* সর্বশেষ টিকা বা বুস্টার ডোজ নেওয়া হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করা
* জনবহুল জায়গায় মাস্ক পরা
* শরীরে উপসর্গ দেখা দিলে করোনা পরীক্ষা করানো ও নিজেকে আইসোলেশনে রাখা
* স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলা

টিকা নিয়ে বিশেষ সুপারিশ

গ্লোবাল ভাইরাস নেটওয়ার্ক বলছে, যেহেতু কোভিড-১৯-এর কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই, তাই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাই এখনো সবচেয়ে কার্যকর উপায়। তাদের মতে—

* ৬৫ বছর কিংবা তার বেশি বয়সীদের এবং যাঁরা উচ্চঝুঁকিতে রয়েছেন, তাঁদের আপডেটেড বুস্টার ডোজ নেওয়া খুবই জরুরি
* ৬ মাস বয়সী শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষকে কোভিড টিকার নির্ধারিত ডোজ সম্পন্ন করা উচিত
* শিশু ও কিশোরদের বছরে অন্তত একবার হালনাগাদ টিকা নেওয়া দরকার, কারণ পুরোনো টিকার কার্যকারিতা সময়ের সঙ্গে কমে
* গর্ভবতী নারীদের টিকা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ভবিষ্যৎ শিশুকে প্রথম ছয় মাস পর্যন্ত সুরক্ষা দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভাবস্থায় কোভিড আক্রান্ত হলে মৃত শিশুর জন্ম ও দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার আশঙ্কা বেড়ে যায়
* ফ্লু এবং কোভিডের টিকা একসঙ্গে নেওয়া নিরাপদ এবং এতে কোনো গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায় না

নতুন ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত: বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতেও বাড়ছে সংক্রমণ

সম্প্রতি ভারতসহ একাধিক দেশে করোনার নতুন ধরনগুলোর সংক্রমণ বাড়তে দেখা গেছে। বাংলাদেশেও গত বৃহস্পতিবার একজনের মৃত্যু হয়েছে কোভিডে। যদিও পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক নয়, তবে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

আইসিডিডিআরবি-র গবেষকেরা জানিয়েছেন, দেশে নতুন করে শনাক্ত হয়েছে এক্সএফজি নামের একটি ধরন, যার পাশাপাশি এক্সএফসি ধরনটিও মিলেছে। দুটোই অমিক্রনের শক্তিশালী উপধরন জেএন-১ থেকে উদ্ভূত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন সময়ে প্রয়োজন সচেতনতা, টিকাদান কার্যক্রমে গতি এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। আতঙ্ক নয়, বরং পূর্বপ্রস্তুতি ও তথ্যনির্ভর সচেতনতা দিয়েই এ ধরনের ভাইরাস মোকাবিলা সম্ভব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত