চাঁদপুরের রূপালী ইলিশ যুগ যুগ ধরে খ্যাতি ছড়িয়েছে দেশ-বিদেশে। আর সেই ইলিশের যোগান দিয়েছে চাঁদপুর বড় স্টেশনের মাছঘাট। কিন্তু কালের পরিক্রমায় জৌলুস হারাতে বসেছে একসময়ে জমজমাট এই মাছঘাট। সরবরাহ কমেছে মাছের, নেই আগের মত ক্রেতাও। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত কর্মে ব্যস্ত থাকা শত শত শ্রমিক হারিয়েছে তাদের কর্মচাঞ্চল্য। তাই চাইলেও যুগ যুগ ধরে চলে আসা মাছ বিক্রির পেশায় থাকতে পারছেন না আড়ৎদাররা।
ইলিশের প্রাপ্যতা আর যোগাযোগ সুবিধার কারণে ডাকাতিয়া নদীর তীরে বৃটিশ আমলে প্রতিষ্ঠা করা হয় চাঁদপুর বড় স্টেশন মাছঘাট। এখান থেকেই সড়ক ও রেল পথে সারা দেশের গ্রাম গঞ্জে পৌঁছে যায় রূপালী ইলিশ। স্থানীয় অর্থনীতিতেও এই বাজারের প্রভাব অসীম। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাজারে কমেছে মাছের সরবরাহ। বড় স্টেশন মাছঘাটের আগের সেই বনেদি অবস্থা আর নেই। যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মণ মাছ বিক্রি হতো, সেখানে আজ মাছের তীব্র সংকট।
মাছের অভাবে বছর বছর লোকসানের মুখে সর্বশান্ত হয়েছেন অনেক আড়ৎদার। কেউ কেউ পাল্টেছেন এই পেশা, কেউবা ছাড়ার অপেক্ষায়। আড়ৎদার মেসবাউদ্দিন বলেন, এই ঘাটের তাজা ইলিশ কিনার জন্য প্রতিদিন অনেক মানুষ আসে। কিন্তু আগের মত মাছ না আসায় অতিরিক্ত দামের কারণে অনেক ক্রেতাই ফিরে যান খালি হাতে। তিনি বলেন, “আমরা যারা আড়ৎদার রয়েছি, তারা জেলেদের লক্ষ লক্ষ টাকা দাদন দিয়েছি। কিন্তু জেলেরা মাছ না পাওয়ায় আমরা লোকসানে পড়ছি”। চলতি মৌসুমেও ইলিশের তেমন দেখা না পাওয়ায় কপালে চিন্তার ভাঁজ এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের।
ইলিশ বিক্রেতা নবির হোসেন বলেন, “চার-পাঁচ বছর আগেও ঘাটে প্রতিদিন ২-৩ হাজার মণ মাছ আসতো। কিন্তু এখন মাছ আসে মাত্র ৪০-৫০ মণ। মাছের অভাবে আমাদের অবস্থা ভালো নাই”। মাছঘাটের শ্রমিক জাকির হোসেন বলেন, “এই ঘাটে ট্রলার কিংবা ট্রাক থেকে মাছ উঠানো নামানোর কাজ করে অনেক শ্রমিক জীবিকা নির্বাহ করতো। আগে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করে দিশা পেতাম না, আর এখন বসে থাকতে হয় কখন মাছ আসবে। খুব কষ্টে আছি আমরা”।
শুধু মাছ ব্যবসায়ীরাই নয় বড় স্টেশন মাছঘাটকে ঘিরে গড়ে ওঠা খাবার হোটেল, চায়ের দোকান, প্যাকেজিং, বরফকলসহ নানা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন হাজারো মানুষ। কিন্তু এখন ভাটা পড়েছে সেই পেশাগুলোতেও। মাছঘাটের খাবারের হোটেলের মালিক শাহজাহান হোসেন বলেন, “প্রায় ৫০ বছর যাবত এই এলাকায় হোটেল ব্যবসা করছি। বাজারে মানুষ থাকলে আমাদের ব্যবসা চলে, না থাকলে চলে না। বাজারে মাছ না থাকায় ক্রেতা কমেছে। তাই সংসার চালাতেও বেশ কষ্ট হয়ে যায়”।
চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুল বারী জমাদার বলেন, মূলত ২০২২ সাল থেকে প্রতি বছর বড় স্টেশন মাছঘাটে ক্রমাগত ভাবে কমেছে ইলিশের সরবরাহ। এক দিকে চাঁদপুরের স্থানীয় পদ্মা-মেঘনায় চলছে মাছে আকাল, অপর দিকে নতুন নতুন আড়ৎ তৈরি হওয়ায় কমছে মাছের চালান। তিনি বলেন, মাছ সংকটে কয়েক বছরের ব্যবধানে ইলিশের দাম বেড়েছে ৩ গুনেরও বেশি।
আব্দুল বারী বলেন, “২০২০-২১ অর্থ সালে এই ঘাটে প্রায় সাড়ে ৩ লক্ষ মণ মাছ বিক্রি হয়েছিলো, তখন ১ কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হতো ৯শ’ থেকে ১ হাজার টাকায়। আর এখন ১ কেজি ওজনের মাছ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৪শ’ থেকে ২ হাজার ৫শ’ টাকায়”। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঐতিহ্যবাহী এই প্রাচীন ইলিশের বাজার টিকিয়ে রাখতে মাছের প্রাপ্যতার বিকল্প নেই। তাই নদীতে মাছের উৎপাদন বাড়াতে সরকারকে যুগোপযুগী ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান তারা।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মহসীন উদ্দিন বলেন, গত কয়েক বছর ধরে ইলিশের উৎপাদন কিছুটা কমলেও বৃদ্ধি পেয়েছে চাষ করা মাছের উৎপাদন। তাই বড় স্টেশন মাছ ঘাটের ব্যবসায়ী কিংবা শ্রমিকরা কর্মহারা হবে না বলেই বিশ্বাস করেন তিনি। পাশাপাশি চাঁদপুরে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে বলেও জানান জেলা প্রশাসক।
