ময়নাতদন্তের রিপোর্টে আটকে আছে গৃহবধূ আঁখি খাতুনের (২৩) মৃত্যু রহস্য। গৃহবধূ আঁখি খাতুন সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার নরিনা ইউনিয়নের চরটেপরি গ্রামের আলামিন হোসেনের (৩১) স্ত্রী ও পার্শ্ববর্তী উল্লাপাড়া উপজেলার সলপ ইউনিয়নের নওকৈর গ্রামের আলম সরদার ও শিল্পী খাতুনের মেয়ে।
গত ৭ জুন ঈদুল আজাহার দিন সকালে পুলিশ চরটেপরি গ্রামের স্বামীর বাড়ি থেকে আঁখির লাশ উদ্ধার করে। আঁখির মা-বাবার দাবি এটা পরিকল্পিতভাবে পিটিয়ে ও শ্বাসরোধে হত্যা। অপরদিকে আঁখির স্বামী আলামিনের দাবি এটা আত্মহত্যা। পুলিশ মৃত্যুর আসল রহস্য উদঘাটনে নিহতের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সিরাজগঞ্জ হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছেন। সেই থেকে নিহতের মা-বাবা ও পুলিশ ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পাওয়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। আর পুলিশ ময়নাতদন্তের রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছেন না।
আঁখির মা শিল্পী খাতুন জানান, চার বছর আগে ২০২১ সালে আঁখি খাতুন পরিবারের অমতে প্রেম করে পালিয়ে ১০ম শ্রেণির ছাত্র আলামিন হোসেনকে বিয়ে করে। এরপর তারা কয়েক মাস আত্মগোপনে থাকে। আঁখির বাবা আলম সরদার মেয়েকে খুঁজে না পেয়ে উল্লাপাড়া থানায় আলামিনের বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা দায়ের করেন। কিছুদিন খোঁজাখুজির পর ফিরে না পেয়ে আশা ছেড়ে দেই। কয়েক মাস পর আঁখি নিজেই বাবার বাড়িতে যাওয়া আশা শুরু করে। আস্তে আস্তে দুই পরিবারের সম্পর্ক স্বাভাবিক হলে ১ বছর আগে আমরা অপহরণ মামলা তুলে নেই। এরপর থেকে আলামিন ঠিকমত কাজ কাম না করায় তার মা-বাবা তাদের সংসার আলাদা করে দেন। মেয়ের অভাব ঘোচাতে আমরা তাদের অর্থ ও নানাভাবে সাহায্য করি। বেকার আলামিন ক্রমশ জুয়া ও নেশায় আশক্ত হয়ে পড়ে। আঁখি টের পেয়ে তাকে বাঁধা দেয়। এ নিয়ে প্রায়ই আঁখিকে মারধর ও নির্যাতন করে আলামিন। আঁখির সংসারে নেমে আসে অশান্তি। অনেক চেষ্টা করেও আঁখি তার স্বামীকে এ অন্ধকার পথ থেকে ফেরাতে পারেনি। গত ঈদুল আজাহার কয়েকদিন আগে আঁখির বাবা একটি ষাঁড় গরু ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। আলামিন সেখান থেকে ১০ হাজার টাকা দাবি করে। এ টাকা না দেওয়ায় আঁখিকে মারধর করে।
শিল্পী খাতুন আরও বলেন, অপহরণ মামলা তুলে নেওয়ার সময়ে দুই পরিবারের মধ্যে অনুষ্ঠিত সালিশ বৈঠকে আলামিনের চর নরিনা গ্রামের চাচি হোসনে আরা ফকিন্নি (এলাকায় ফকিন্নি হিসাবে পরিচিত) তাদের কাছে ১ ভরি স্বর্ণের গহনা ও নগদ ৫০ হাজার টাকা যৌতুক দাবি করেন। গহনা দিতে রাজি হলেও তিনি মামলা তোলার খরচ দাবি করেন। তা দেওয়ায় তারা আমাদের উপরে ক্ষুব্ধ ছিলেন। হোসনে আরা ফকিন্নির অবৈধ টাকার জোড়ে আমরা আঁখি হত্যার সঠিক বিচার পাচ্ছি না। টাকা দিয়ে সে পুলিশকে ম্যানেজ করেছে। ফলে পুলিশ আমাদের হত্যা মামলা নেয়নি।
তিনি বলেন,আমার মেয়েকে তারা পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে। আমি এ হত্যার সঠিক বিচার চাই।
আঁখির বাবা আলম সরদার জানান, গত ৬ জুন শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে কোরবানির ঈদ উপলক্ষে মেয়েকে নায়োর আনরতে চরটেপরি মেয়ের বাড়িতে যাই। এ সময় আমার মেয়ে আঁখি আসতে চাইলেও জামাই আসতে দেয়নি। আমি রাত ১০টার দিকে সেখান থেকে বাড়ি এসে ঘুমিয়ে পড়ি। ভোর রাত ৪টার দিকে খবর পাই আঁখি খুব অসুস্থ। আমি সেখানে ছুটে গেলে মেয়ের শ্বশুর আব্দুর রাজ্জাক বলে আঁখি ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেছে। এ সময় তারা তড়িঘড়ি করে লাশ দাফন করতে চাইলে আমি বাঁধা দিয়ে আমার পরিবারের সবাইকে খবর দেই। আমার পরিবারের লোকজন সেখানে গিয়ে আঁখির গলা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারধরের আঘাতের চিহ্ন দেখে পুলিশে খবর দেয়। ৭ জুন শনিবার ঈদের দিন সকালে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। আমরা হত্যা মামলা করতে চাই। কিন্তু পুলিশ হোসনে আরা ফকিন্নির টাকায় ম্যাসেজ হয়ে হত্যা মামলা না নিয়ে ইউডি মামলা রেকর্ড করে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য সিরাজগঞ্জ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। আমি আঁখি হত্যার সুষ্ঠু বিচার চাই।
এ বিষয়ে আঁখির চাচি শিরিন আক্তার ও সুফিয়া খাতুন বলেন, মহিলা পুলিশ সাথে নিয়ে আমরা ভালোভাবে লাশ চেক করে আঁখির গলায় ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে কালো জখমি একাধিক মারধরের চিহ্ন পাই। এ সময় ফাঁস নেওয়ার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। তারা বলেন, আঁখিকে হত্যা করে আত্মহত্যা বলে প্রচার করে হত্যার ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আমরা আঁখি হত্যার বিচার চাই।
এ বিষয়ে জানতে হোসনে আরা ফকিন্নির চর নরিনার বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। তবে তার স্বামী ফরহাদ মন্ডল আঁখির পরিবারের সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তার স্ত্রী হোসনে আরা বাড়িতে নেই। আমরা এ সবের কিছুই জানি না। হোসনে আরার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও মনগড়া।
এ বিষয়ে আলামিনের বড় ভাই আলাউদ্দিন ও ভাবী আখলিমা খাতুন বলেন, আলামিনের কান্নাকাটি শুনে ছুটে গিয়ে আঁখিকে ওরনা দিয়ে ধরনার সাথে ফাঁস নিয়ে ঝুঁলতে দেখি। এ সময় আমার বাবা মা ছুটে এসে বটি দিয়ে ওরনা কেটে দিয়ে আঁখিকে বিছানায় শুয়ে দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে আঁখির স্বামী আলামিন হোসেন বলেন, আঁখি ও আমার দূরত্ব হাফ কিলোমিটারের কম। ২০১৯ সালে ১০ শ্রেণিতে পড়াকালে আঁখিকে দেখে আমার ভালো লাগে। ৮ম শ্রেণিতে পড়ুয়া আঁখিকে প্রেমের প্রস্তাব দিলে সে রাজি হয়ে যায়। গোপনে ২ বছর প্রেমের পর তা জানাজানি হয়ে যায়। আঁখির মা-বাবা তাকে অন্যত্র বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। আমার পরিবার থেকে আঁখির মা-বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিলে তারা নাকোচ করে দেন। ফলে আমরা দুজন পালিয়ে বিয়ে করি। পরে আঁখির বাবা আমাদের বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা করেন। কিছুদিন পালিয়ে থাকার পর তারা আমাদের বিয়ে মেনে নেন। এক বছর পর তারা অপহরণ মামলা তুলে নেন। ফলে দুই পরিবারের মধ্যে আর কোনো সমস্যা ছিল না।
আলামিন জানায়, গত ৬ জুন কোরবানির ঈদের আগের রাতে আঁখির বাবা ঈদ উপলক্ষে আমাদের নিতে আসে। আমরা ঈদের পরের দিন যেতে চাই। আঁখির বাবা রাতের খাওয়া শেষে নিজ বাড়িতে চলে যায়। আমিও রাতের খাওয়া শেষে নদীতে মাছ ধরতে যাই। ভোর ৪টার দিকে বাড়ি এসে আঁখিকে ডাকাডাকি শুরু করি। কিন্তু আঁখির কোনো সারা না পেয়ে টিনের দরজার ফুটো দিয়ে হাত ঢুকিয়ে দরজা খুলে দেখি আঁখি গলায় ওরনা পেচিয়ে ঘরের ধরনার সাথে ফাঁস নিয়ে ঝুঁলে আছে। আমি চিৎকার ডাকাডাকি শুরু করলে আমার মা-বাবা ছুটে এসে বটি দিয়ে ওড়না কেটে আঁখিকে নিচে নামায়। কী কারণে আঁখি ফাঁসি নিয়েছে তা আমার জানা নেই।
আলামিন বলেন, আঁখি নিজেই গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেছে। আঁখির মা-বাবার হত্যার দাবি সঠিক না। শ্বশুর বাড়িতে টাকার দাবি, নেশা ও জুয়া খেলার বিষয় অস্বীকার করে আলামিন বলেন, তাদের এ অভিযোগ মিথ্যা। আমি কখনো যৌতুকও দাবি করিনি।
এ বিষয়ে শাহজাদপুর থানা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. কামরুজ্জামান বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে নিহতের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সিরাজগঞ্জ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। এ ঘটনায় থানায় একটি ইউডি মামলা রের্কড করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে যা আসবে সে অনুযায়ী পরবর্তীতে নিহতের পরিবারের সাথে কথা বলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, হোসনে আরা ফকিন্নির মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ সত্য নয়। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও মনগড়া অভিযোগ। এর কোনো সত্যতা নেই।
শাহজাদপুর থানার ওসি আসলাম আলীও এ অভিযোগ অস্বীকার করে একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন।
