জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যার দীর্ঘ ১১ মাস পর মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা পেয়েছে প্রসিকিউশন। যাতে ৩০ জনের সম্পৃক্ততা পেয়েছে বলে নিশ্চিত করেন সংশ্লিষ্ট সূত্র। তবে ট্রাইবুনালের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা মামলার বাদী, প্রধান সাক্ষী ও বেরোবির ছাত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে যথাযথ যোগাযোগ করেনি। এছাড়া তথ্য নিলেও সেটা ভিন্নভাবে উপস্থাপন কিংবা সেটা প্রতিবেদনে তুলেই ধরেনি বলে অভিযোগ করেন তারা।
বৃহস্পতিবার (২৬ জুন) এই হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা ও চার্জশিটের কথা গণমাধ্যমে শোনার পর থেকেই আন্দোলনে ফেটে পড়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
তারা অভিযোগ করেন, এই তদন্তে অনেক গ্যাপ রয়েছে, তারা ঢাকায় বসে তথ্য সংগ্রহ করেছে, যেখানে হত্যা হয়েছে ক্যাম্পাসের গেটের সামনে এবং সাক্ষী সবাই রংপুরে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অভিযোগ করে বলেন, আমরা তাদের (ট্রাইবুনাল) সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে বসতে চেয়েছি কিন্তু তারা আসেনি। তারা বলছে হামলা নাকি ক্যাম্পাসের ভিতর থেকে বের হয়েছে এটা মিথ্যাচার। বাংলাদেশের বিচারহীনতার বড় প্রমাণ আজ এই চার্জশিট দেওয়ার মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।
অনুসন্ধানকালে উঠে আসে ভিন্নরকমের তথ্য। জানা যায়, এই মামলার প্রধান স্বাক্ষীসহ অন্যান্য স্বাক্ষীর থেকে যে তথ্যগুলো নেওয়া হয়েছিল সেগুলোকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছে তারা।
এ বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শী ও মামলার অন্যতম প্রধান সাক্ষী শাহরিয়ার সোহাগ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা সকল তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করেছি কিন্তু তারা সেই তথ্যগুলোকে উপস্থাপন না করে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে। যেখানে এটা সম্পূর্নরুপে একটা পুলিশি হত্যাকাণ্ড সেখানে তারা একবারো তাদের কথায় এটা উল্লেখ করেনি। যার ফলে আমরা তাদের এই প্রতিবেদনে অনাস্থা প্রকাশ করছি।
আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সঙ্গেও করা হয়েছে দ্বিরূপ আচরণ। তারা জানায়, মামলার শুরু থেকে আমাদের সঙ্গে বিভিন্নভাবে পিবিআই বেশ কয়েকবার আলোচনায় বসে। পরে মামলা দ্রুতগতি ও সঠিক তদন্তের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে গেলে তারাও যোগাযোগ করেন। কিন্তু আমাদের সঙ্গে যে কথা হয়েছে সেসবের বহিঃপ্রকাশ হয়নি এই প্রতিবেদন ও তাদের কথার মাধ্যমে। যার ফলে আমরা আজ এখানে অবস্থান কর্মসূচি করছি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র প্রতিনিধি আশিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে জানান, এভাবে একটা মামলায় হুট করে প্রতিবেদন জমা দিয়ে চার্জশিট গঠনের কথা বলেন অথচ এর আগে আমাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য বলা হয়েছিল। কিন্তু তারা তা করেনি ফলে আমরা এই প্রতিবেদনে অনাস্থা প্রকাশ করছি।
মাহিদ শাকিল বলেন, এই মামলার সর্বশেষ আপডেট, তথ্য ও অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা করার লক্ষ্যে আমাদের সঙ্গে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের গত ২৩ জুন তথ্য প্রমাণাদি ও আলোচনার লক্ষ্যে মিটিং ছিল। কিন্তু তারা আসেনি। আবার ২২ জুন রাতে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে চাই কখন আসবেন? তারা জবাবে বলেন, আমরা সময় জানিয়ে দেব। কিন্তু তারা না এসেই কীভাবে ২ দিন পর এই প্রতিবেদন জমা দেন? অথচ প্রসিকিউটর ময়নুল করিম আমাদের এই বিষয়টি কনফার্ম করেছিলেন যে তারা ২৩ তারিখ আমাদের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন। ঠিক কি কারণে তারা আসলেন না এবং এভাবে প্রতিবেদন জমা দিলেন প্রশ্ন এখানেই তৈরি হয়।
প্রতিবেদন ও যোগাযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার বাদী আবু সাঈদের বড় ভাই রমজান আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফোন দিলে যোগাযোগ হয়না, এটা তো খারাপ তার কারণ হচ্ছে আমার সঙ্গে যোগাযোগ না হলে কার সঙ্গে হবে!
তিনি আরও বলেন, আমরা যখন গিয়েছিলাম তখন তো তিনি আসতে চাইলেন এবং ঈদের পরেও তারা আসতে চাইলেন কিন্তু তারা আসলো না। এটা আমাদের জন্য আসলেই খুবই দুঃখজনক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, সাক্ষী ও প্রতিনিধিরা বলেন, এমন একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদনে সর্বশেষ পর্যায়ে তারা সবাইকে জানিয়ে আসতে চেয়েও আসলো না এবং প্রতিবেদন জমা দিলো। তিলকে তাল এবং তালকে তিল বানিয়ে কথা বলছেন। এটা তো হতে পারে না।
তারা আরও বলেন, এখনই সময় এই বিষয়ে আমাদের যথাযথ পদক্ষেপ দরকার। আমরা এই মামলার সঠিক তদন্ত ও সঠিক বিচার চাই।
উল্লেখ্য, শহীদ আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডে তার বড় ভাই রমজান আলী গত বছরের ১৮ আগস্ট রংপুরের কোতোয়ালি থানায় ১৭ জনের নাম উল্লেখ এবং ৩০–৩৫ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করেন। পরবর্তীতে, চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি আবু সাঈদের পরিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ২৫ জনের বিরুদ্ধে পৃথক অভিযোগ দায়ের করে। জুলাই আন্দোলনে শহীদ আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের মামলাটি গত ২ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা হয়। এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের জুলাই হত্যাকাণ্ডের প্রথম মামলা।
