কলকাতার সিনেমাপাড়ায় একটা সময়ে অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিকের নামই হয়ে গিয়েছিল মুশকিল আসান মল্লিক। পারিবারিক কলহ থেকে শুরু করে কারখানার শ্রমিক অসন্তোষ, এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি কিংবা প্রেমে ব্যর্থতা সব সমস্যার সমাধান পর্দায় রঞ্জিত মল্লিক করে দিতেন। বাস্তবে বাংলাদেশের ক্রিকেটে মেহেদী হাসান মিরাজকে বলা যায় মুশকিল আসান মিরাজ।
দলে উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান নেই, অধিনায়ক মিরাজকে পাঠিয়ে দিলেন এশিয়া কাপের ফাইনালে। মিরাজ ভালো একটা শুরু এনে দিলেন। রাওয়ালপিন্ডিতে শুরুতেই সব ব্যাটসম্যানরা সাজঘরে, মিরাজ ঠিকই সামলে নিলেন।
সেই মিরাজকেই এখন ওয়ানডে দলের অধিনায়ক করা হয়েছে আগামী ১ বছরের জন্য। ২ জুলাই কলম্বোতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৩ ম্যাচের সিরিজটি দিয়ে শুরু হবে অধিনায়ক মিরাজের আনুষ্ঠানিক পথচলা।
মিরাজের কাছে অবশ্য নেতৃত্ব নতুন কোনো বিষয় নয়। ২০১৬ সালে বাংলাদেশে হয়ে যাওয়া অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অধিনায়ক ছিলেন মিরাজ, সেই আসরে মিরাজ হয়েছিলেন সেরা খেলোয়াড়। ঘরোয়া ক্রিকেটেও বিভিন্ন পর্যায়ে দলকে নেতৃত্ব দেওয়া মিরাজ গত বছর নিয়মিত অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর চোটজনিত অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের ২ টেস্ট ও ৩ ওয়ানডেতে। এর ভেতর ১টি টেস্টে বাংলাদেশ জিতেছে, হেরেছে ১ টেস্টে এবং ওয়ানডে সিরিজের সবকয়টি ম্যাচেই।
বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) টি-টোয়েন্টির সবশেষ আসরে খুলনা টাইগার্স দলের অধিনায়ক ছিলেন মিরাজ। দলটি বেশ কঠিন সমীকরণ মিলিয়ে প্লে-অফ পর্বে এলেও শেষ পর্যন্ত ফাইনালে খেলতে পারেনি। খুলনা টাইগার্স দলের কোচ ছিলেন তালহা জুবায়ের।
জাতীয় দলের সাবেক এই পেসার দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন অধিনায়ক মিরাজকে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতার কথা। দেশ রূপান্তরকে তালহা জানান, ‘মিরাজের সব থেকে ভালো দিক হচ্ছে ওর আত্মবিশ্বাস। দলের অবস্থা যাই থাকুক না কেন, ধরেন আমাদের খুলনা দলটা আমরা প্রথম দিকে কিছু ম্যাচ জিতেছি আবার টানা হেরেছি, জেতা ম্যাচ হেরেছি কিন্তু ওর আত্মবিশ্বাসের মাত্রা কখনো কমেনি। খেলোয়াড়দের ওপর ভরসা করা, সবার খোঁজখবর রাখা, পুরো দলটাকে এক করে রাখা... এগুলো মিরাজের খুব ভালো গুণ। একজন ভালো নেতার মধ্যে যে গুণগুলো থাকা দরকার তার সবই মিরাজের মধ্যে আছে। সবার ব্যাপারে সে চিন্তা করে, কোন প্লেয়ারের মানসিক গড়নটা কেমন সেভাবে তার সঙ্গে আচরণ করতে হবে, যে ভালো ফর্মে নেই তাকে একটু মানসিকভাবে সহায়তা করা... এই জিনিসগুলো একজন নেতার মধ্যে থাকা উচিত এবং ওর মধ্যে ভালোভাবেই আছে।’
ঘাটতির জায়গা হিসেবে তালহার মনে হয়েছে শীর্ষ পর্যায়ে অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালনে একটু অভিজ্ঞতার অভাব আছে, ‘অধিনায়ক হিসেবে অভিজ্ঞতার অভাব আছে। অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে অধিনায়কত্ব করা আর শীর্ষ পর্যায়ে অধিনায়কত্ব করাটা ভিন্ন কারণ অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে দলে সবাই একই বয়সের থাকে আর এখন তো হিসাবটা ভিন্ন কারণ দলে বিভিন্ন বয়সের খেলোয়াড়রা থাকে, সিনিয়র এবং জুনিয়র। তাদের ম্যানেজ করা। এই জিনিসগুলা আমার মনে হয় ওর দিন দিন উন্নতি করবে। ওর আগ্রহের কমতি নেই। নেতৃত্ব নিয়ে অনেকে খেলতে পছন্দ করে না, মিরাজ দায়িত্ব নিয়ে খেলতে পছন্দ করে।’
কাগজে-কলমে ২৮ বছর হতে আর মাস চারেক বাকি মিরাজের। তার চেয়ে বছর দুয়েকের ছোট শুবমান গিলকে টেস্ট অধিনায়ক করেছে ভারত, তার নেতৃত্বেই ইংল্যান্ড সফর করছে ‘টিম ইন্ডিয়া’। তালহার কাছে তাই মনে হচ্ছে অধিনায়ক হওয়ার জন্য বয়সটা কোনো বিষয় না, ‘বয়সটা কিন্তু কোনো বিষয় না অধিনায়ক হওয়ায় জন্য। অনেক তরুণ অধিনায়কও ভালো অধিনায়কত্ব করেছে, সিনিয়রদের ভালো করে হ্যান্ডেল করেছে। মহেন্দ্র সিং ধোনি যখন অধিনায়ক হয় তখন অনেক বড় বড় নামকে তার বাদ দিতে হয়েছে। ওর পেছনে যে বড় ব্যাকআপটা ছিল সেটা হচ্ছে ক্রিকেট বোর্ড। তারা তাকে ফুল সাপোর্ট দিয়েছ, মিডিয়ারও একটা বড় ভূমিকা ছিল। আমরাও যদি এই ব্যাপারগুলো বজায় রাখতে পারি যে একজন অধিনায়ককে পরিপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া, সে কী চিন্তা করছে লম্বা সময়ের জন্য সেই পরিকল্পনাকে সমর্থন করা তাহলে একজন অধিনায়ক ভালোভাবে তার কাজটা করতে পারবে।’
পরিকল্পনা ও কৌশল প্রণয়নেও মিরাজ অনেক বুদ্ধিদীপ্ত বলেই জানিয়েছেন তালহা, ‘স্ট্র্যাটেজি এবং ট্যাকটিকস-এর ব্যাপারে পরিকল্পনা করার বেলায় মিরাজ খুবই উদ্ভাবনী এবং বুদ্ধিদীপ্ত। তবে অনেক পরিকল্পনাই হয়তো শেষ পর্যন্ত মাঠে বাস্তবায়ন করা যায় না, সেটা বাস্তবায়নের সমস্যা। তবে পরিকল্পনা করার জায়গাটাতে মিরাজ খুবই দারুণ।’
আপাতত বিসিবি মিরাজকে ১ বছরের জন্য অধিনায়ক করেছে ওয়ানডেতে, তবে তালহা মনে করেন মেয়াদটা আগামী বিশ্বকাপ অর্থাৎ ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ পর্যন্ত হলেই ভালো হতো।
মিরাজের আত্মবিশ্বাসের কমতি যে নেই, সেটা তার খেলার ধরনেই স্পষ্ট। ইনিংসের সূচনায় নেমে যাচ্ছেন, প্রথম ওভারেই বোলিংয়ে চলে আসছেন, যে কোনো সংকটে হাল ধরছেন; মিরাজ যাকে বলে সব কাজের কাজী। এই আত্মবিশ্বাস থেকেই মাঝেমধ্যে উইকেটের আশায় এমন কিছু ‘রিভিউ’ নিতে অধিনায়ককে প্ররোচিত করেন, যেটা হয়তো সাদা চোখে দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে নটআউট। অধিনায়ক হিসেবে মিরাজ নিজের বলে এমন রিভিউ কয়টা নেবেন, এটাই তার জন্য বড় ধৈর্যের পরীক্ষা।
মেসি বললেন, 'আমরা ভালো খেলেছি, কিন্তু পিএসজি এক অন্য গ্রহের দল'
মেসির বিদায়ে কী ক্লাব বিশ্বকাপের উত্তাপেও ভাটা পড়বে!
উত্তপ্ত দিনে উইম্বলডনের রঙ্গমঞ্চে নামছেন আলকারাজরা