প্রবাসে জন্ম, লক্ষ্য লাল-সবুজের জার্সি

আপডেট : ৩০ জুন ২০২৫, ০৯:৪২ পিএম

নামটা গালভারী, 'বিএফএফ নেক্সট গ্লোবাল স্টার'। আদতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত ফুটবলারদের বাছাই পর্ব। বিভিন্ন দেশে নানান পর্যায়ে খেলা বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত ফুটবলাররা নিজেদের উদ্যোগেই এসেছেন বাংলাদেশে। তাদের চোখে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলে খেলার স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রাখার প্রক্রিয়ার শুরুটা হলো উৎসবমুখর পরিবেশে। তবে এই বাছাইপর্ব থেকে বাংলাদেশ পরবর্তী ফুটবল তারকার খোঁজ পাবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর বোধহয় সহজে মিলবে না।

যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, সুইডেন, ইংল্যান্ড, ওয়েলসসহ বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছেন নানান জায়গায় খেলা ফুটবলাররা। সর্বমোট ৪৯ জন। দুই দিনের অনুশীলনের পর সোমবার দুটো ফুটবল ম্যাচ খেলেছেন অংশ নেয়া ফুটবলাররা। বিকাল ৪টা থেকে ৫টা, ১ ঘন্টার ম্যাচে অংশ নেন ১৯ বছরের নিচের বয়সী ২৫ ফুটবলার। 'নেক্সটগ্লোবাল স্টার লাল' ও 'নেক্সট গ্লোবাল স্টার সবুজ' দুই দলে বিভক্ত হয়ে খেলেছেন সায়ইদ তাইসির, ইব্রাহিম নাওয়াজ, ইফাজ আবেদ, আসিফ আকরাম সহ বিদেশ থেকে আসা কিশোর ফুটবলাররা। লাল ও সবুজের ম্যাচটা শেষ হয়েছে ২-২ সমতায়। এই ম্যাচে নজর কেড়েছেন মার্কিন প্রবাসী বিতোশক চাকমা। বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার বরুণ বিকাশ দেওয়ানের ভাইপো বিতোশক লাল দলের হয়ে একটি গোল করেছেন। চমৎকার ড্রিবল এবং বক্সের ভিতর থেকে সুন্দর ফিনিশিংয়ের মাধ্যমে গোলটা করে বিতোশক নিজেকে অন্যদের চেয়ে আলাদা প্রমাণ করেছেন। অনূর্ধ-২৩ বছর বয়সীদের ম্যাচটা শেষ হয়েছে গোলশুন্য সমতায়।

ট্রায়াল ম্যাচ। ছবি: বাফুফে

আগ্রহের কমতি ছিল না অংশগ্রহণকারীদের ভেতর, তবে ব্যক্তিগত নৈপুন্য কিংবা দক্ষতায় মনে দাগ কাটতে পেরেছেন খুব কম ফুটবলারই। অনেকটা ডাচ ফুটবলার এডগার ডাভিডসের মত দেখতে, লম্বা চুলের সঞ্জয় করিম এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড থেকে। অনূর্ধ-১৯ বয়সীদের ম্যাচ চলাকালীন সাইড লাইনের বাইরে দাঁড়িয়ে বল নিয়ে অনেক কসরৎ করেছেন। কিন্তু মাঠে খেলার সময় তার পায়ে মুগ্ধ করার মত মুহূর্তের জন্ম হয়নি। নারায়ণগঞ্জের ছেলে আরমান আয়াজ থাকেন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়াতে। নানা'র স্বপ্ন তাকে নিয়ে, নাতি একদিন বাংলাদেশের হয়ে খেলবে। আয়াজের দাবী তিনি মেক্সিকান দ্বিতীয় বিভাগে খেলেছেন, এখন খেলছেন ইউপিএসএল (ইউনাইটেড প্রিমিয়ার সকার লিগ) এর দল অ্যাটলেটিক বিউফোর্ড দলে। ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখা গেল, এই লিগটা যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লিগ কাঠামোর বাইরে একটা আধা-পেশাদার লিগ, যার অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের লিগ পিরামিডের চতুর্থ স্তরে। তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, গোল করতে না পারার আক্ষেপ, 'বাংলাদেশে এসেছিলামই গোল করার জন্য। কিন্তু আফসোস আমি গোল করতে পারলাম না। আমি বাংলাদেশের হয়ে খেলতে চাই আর অনেক গোল করতে চাই।' তার সবশেষ মৌসুমে গোলের সংখ্যা কত জানতে চাইলে উত্তর মিলল, 'গত মৌসুমে আমি খেলিনি, অনুশীলন করেছি। তার আগের মৌসুমে আমি ২৫ গোল করেছিলাম, এক ম্যাচে সর্বোচ্চ ৪ গোল পর্যন্ত করেছি।'

ট্রায়াল শেষে সার্টিফিকেট দেয়া হয় বাফুফে থেকে। ছবি: বাফুফে

ওয়েলস থেকে আসা ফুটবলার সামির মিয়া বলেন, “তিন দিনের ট্রায়ালের পর আমি আশাবাদী। নিজের পজিশনে খুব ভালো খেলেছি। বিশেষ করে শেষ দশ মিনিট নিজের সেরার বেশি দিয়ে খেলেছি। এখানে আসতে পেরে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি বাফুফেকে।”

সুইডেন থেকে আসা অনিক রহমান বলেন, “এটা আমার জন্য দারুণ এক অভিজ্ঞতা। এক কথায় অবিশ্বাস্য। খুব ভালো লাগছে। বিশেষ করে এটা আমার স্বপ্ন ছিল যে বাংলাদেশের জন্য খেলব। সেই সুযোগ করে দেওয়ার জন্য খুব সম্মানিত বোধ করছি। বাংলাদেশের হয়ে ট্রায়াল দিতে পেরেছি এবং এখানে এই মাঠে খেলতে পেরেছি। এতে আমি অনেক খুশি।'

প্রবাসী ফুটবলারদের উৎসাহ দিতে মাঠে এসেছিলেন তাদের অনেক আত্মীয় স্বজন এবং শুভাকাংখীরা। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা ফুটবলার জায়ান আহমেদের বাবা মায়ের জন্ম চাঁদপুর। ঢাকা স্টেডিয়ামে জায়ানের খেলা দেখতে এসেছিলেন তাদের আত্মীয়রা।  হাতে প্ল্যাকার্ড ধরে উচ্ছ্বসিত একজন বলছিলেন, “আমরা ঢাকায় থাকি। কিন্তু আমাদের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর। এবারই প্রথম এই স্টেডিয়ামে এসেছি আমাদের ভাইয়ের খেলা দেখতে। ওকে খেলতে দেখে অনেক গর্ব হচ্ছে। জায়ান যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসে বাংলাদেশের জন্য খেলছে। আমরা গর্বিত। আমরা আশাবাদী ইনশাল্লাহ দ্রুতই ও বাংলাদেশের হয়ে খেলবে।” একরামুল ক্যাসপার হক থাকেন ইংল্যান্ডে। তার খেলা দেখতে সাভার থেকে এসেছেন দাদি মিসেস রোকেয়া হক। তিনি জানালেন ৭ বছর পর একরামুল বাংলাদেশে এসেছে। ইংল্যান্ডে স্পোর্টস সায়েন্সে স্নাতক করা একরামুলের স্বপ্ন লাল সবুজের জার্সি গায়ে তোলা। মাঠে একরামুলকে দেখে রোকেয়া হক  রোমাঞ্চিত। তিনি বলেন, “আমার খুবই ভালো লাগছে। আমরা নাতি বাংলাদেশের হয়ে খেলবে এটা ভাবতেই খুব এক্সাইটেড। এই মাঠে আমি আগেও এসেছি। কিন্তু এবার এসে বেশি ভালো লাগছে।'

ট্রায়াল শেষে অংশ নেয়া সব ফুটবলারকে দেয়া হয়েছে সনদ ও উপহার সামগ্রী। তবে বিদেশ থেকে আসা ফুটবলারদের সবার যে মূল লক্ষ্য, অর্থাৎ লাল সবুজের জার্সি গায়ে তোলা সেই লক্ষ্যের কতটা কাছাকাছি তারা সেই ফল এখনো জানায়নি বাফুফে। সংস্থার এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পরবর্তীতে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই ট্রায়ালের ফল জানানো হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত