সরকার পতন ঠেকাতে ইরান হামলার তিন দিন আগে গোপন তথ্য নেসেটের অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান মোশে গাফনির সঙ্গে শেয়ার করেছিলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। শুক্রবার নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন বিস্ফোরক তথ্য।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতানিয়াহু ৯ জুন গাফনিকে তেল আবিবের কিরিয়া সামরিক সদর দপ্তরে ডেকে নিয়ে যান। সেখানে তাকে আসন্ন ইরান হামলা সম্পর্কে গোপন তথ্য দেন। অথচ গাফনিকে এই বলার অনুমতি ছিল না।
ইসরায়েলের হারেদি (অতি-রক্ষণশীল ইহুদি) দলগুলো একটি প্রস্তাবিত সামরিক খসড়া আইন নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে সরকার ভাঙার হুমকি দেওয়ার সময় ঘটনাটি ঘটে। তথ্যানুযায়ী, গাফনি গোপন তথ্য জানার পরও সরকার থেকে পদত্যাগের হুমকি দিয়ে যাচ্ছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অতি গোপনীয় এ ধরনের সামরিক তথ্য অনুমতি ছাড়া কোনো রাজানীতিবিদের সঙ্গে শেয়ার করার বিধান নেই। এটি চরম বিপজ্জনক। তার ওপর যখন সেই রাজনীতিবিদরা সরকার পতনের হুমকি দেয় তখন তা আরও বিপজ্জনক।
নিউইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধানে ১১০ জন ইসরায়েলি, মার্কিন ও আরব কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার তুলে ধরা হয়ে। এ থেকে বুঝা যায় নেতানিয়াহুর অনেক সিদ্ধান্ত ছিল মূলত নিজের রাজনীতিতে টিকে থাকার ওপর ভিত্তি করে বিশেষ করে গাজায় হামাসের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে।
নেতানিয়াহু তখন ইসরায়েলের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। বহু বছর ধরেই তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করার স্বপ্ন দেখেছেন। আগেরবার প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি বড়সড় এক হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন, কিন্তু সেনাবাহিনীর উদ্বেগে তা স্থগিত করেন। গাজায় যুদ্ধ চলাকালে তিনি হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে একটি হামলা বাতিল করেন, কারণ এতে আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু হতে পারত।
২০২৫ সালের জুনে এসে নেতানিয়াহু সিদ্ধান্ত নেন যে এই মুহূর্তেই আঘাত হানা উচিত। ইরান তখন একটি দুর্বল অবস্থানে ছিল— তাদের আঞ্চলিক মিত্ররা পরাজিত বা ক্ষতিগ্রস্ত এবং ইসরায়েলের আগের হামলায় ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে আলোচনায় বসেছিলেন যার নেতানিয়াহু তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ ট্রাম্প কোনো সামরিক হামলা পছন্দ করতেন না। এছাড়াও চুক্তি হয়ে গেলে হামলার সুযোগ চিরতরে বন্ধ হয়ে যেত।
এই অস্থির প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহু ঘরোয়া রাজনৈতিক অবস্থান মজবুত করতে চেষ্টা করেন। তার জোটের কয়েকজন সংসদ সদস্য, বিশেষ করে হারেদি সদস্যরা, সামরিক খসড়া আইনে ক্ষুব্ধ হয়ে সরকার ভাঙার পক্ষে ভোট দেওয়ার প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন। পার্লামেন্ট ভেঙে গেলে নেতানিয়াহু আইনগতভাবে আক্রমণ চালাতে পারলেও রাজনৈতিক বৈধতা হারাতেন।
নিউইয়র্ক টাইমস আরও জানায়, এই সংকটকালে ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র মাইক হাকাবি নেতানিয়াহুর পাশে দাঁড়ান। হাকাবি জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাসে কিছু হারেদি রাজনীতিবিদকে আমন্ত্রণ জানিয়ে সতর্ক করেন যে তাদের পদক্ষেপ ইরানবিরোধী যুদ্ধে ইসরায়েলের অবস্থান দুর্বল করতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, হাকাবি ওই নেতাদের বলেন, সরকার ভেঙে গেলে অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রীর অধীনে যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলের বড় কোনো পদক্ষেপে সমর্থন দেবে না। যদিও হাকাবি পরবর্তীতে এসব মন্তব্য অস্বীকার করেছেন।
এই বাস্তবতা বিবেচনা করে নেতানিয়াহু ৯ জুন গাফনিকে গোপন বৈঠকে ডেকে নেন। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, গাফনির দল সরকার ভেঙে দিতে ভোট দিতে পারে, যা ইরান হামলার পরিকল্পনা ভেস্তে দিতে পারত।
সন্ধ্যা ছয়টার দিকে গাফনি কিরিয়ায় পৌঁছালে নেতানিয়াহু তাকে একটি গোপনীয়তা চুক্তি সই করান। ইসরায়েলের আইন অনুযায়ী গোপন তথ্য জানার আগে চুক্তি সই করা বাধ্যতামূলক।
এরপর নেতানিয়াহু ইরান হামলার বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরেন, যা তিন দিন পরেই বাস্তবায়িত হওয়ার কথা ছিল। তবে বৈঠক শেষে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন গাফনি। তিনি বুঝে উঠতে পারছিলেন না নেতানিয়াহু তাকে রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে ব্যবহার করছেন, নাকি সত্যিই বড়সড় হামলা আসন্ন।
তবে সব দ্বিধার মধ্যেও গাফনির দল সরকার টিকিয়ে রাখতে ভোট দেয়, যা নেতানিয়াহুকে প্রধানমন্ত্রীর পদে ধরে রাখতে সহায়তা করে।
এর চব্বিশ ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যেই ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ইরানের দিকে রওনা দেয় যা নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনের মোড় পরিবর্তনকারী মুহূর্ত হিসেবে স্মরণীয়।
