হত্যার পরও লাশের ওপর লাফালাফি

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৫, ০৭:৩৩ এএম

রাজধানীর পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল এলাকায় ব্যবসায়ী চাঁদ মিয়া ওরফে সোহাগকে তার নিজ দোকান থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে শত শত জনতার সামনে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এই নারকীয় ঘটনার সময় সোহাগের কর্মচারী মো. ইসমাইল ও মো. বাবুল প্রাণভিক্ষা চেয়ে খুনিদের পায়ে লুটিয়ে পড়েছিলেন। বারবার অনুনয়-বিনয় করলেও হামলাকারীদের মনে কোনো দয়া জাগেনি। হায়েনার মতো তারা সোহাগের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পিটিয়ে, কুপিয়ে এবং মাথা থেঁতলে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেন চকবাজার থানা যুবদলের সদস্য সচিব পদপ্রার্থী মাহমুদুল হাসান মহিন এবং একই থানার ছাত্রদলের সদস্য সচিব অপু দাস।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যক্তি এ হামলায় অংশ নেয়। এদের মধ্যে রিয়াদ, সজীব, নান্নু, লম্বা মনির ও ছোট মনির মিলে সোহাগের মাথা থেঁতলে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে। এ পাঁচজনই মহিনের ঘনিষ্ঠ অনুসারী।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, এ হত্যাকাণ্ডের হোতা মহিন এবং চকবাজার থানার ৩০ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক তারেক রহমান রবিনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। এ ছাড়া ঘটনায় জড়িত সন্দেহে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। এ পর্যন্ত চারজন গ্রেপ্তার হয়েছে। তবে এজাহারভুক্ত অন্য আসামিরা এখনো পলাতক এবং তাদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

স্থানীয় একাধিক ব্যবসায়ী জানান, মহিন-অপু সিন্ডিকেট গত বছর ৫ আগস্টের পর থেকে মিটফোর্ড এলাকায় চাঁদাবাজি ও ব্যবসা দখলের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছে। কেউ প্রতিবাদ করলে তাদের ওপর নেমে আসত নির্মম হামলা। প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন ছিল তাদের নিয়মিত কার্যকলাপ।

একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটসংলগ্ন এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে থাকা রাস্তায় সোহাগ অর্ধবিবস্ত্র অবস্থায় পড়ে আছেন। তার প্রায় নিথর দেহটি নড়াচড়ার ক্ষমতা হারিয়েছে। হায়েনার মতো হামলাকারীদের নৃশংসতায় তখন তার শুধু নিঃশ্বাস বাকি ছিল। রাস্তার একপাশে পড়ে থাকা সোহাগ তখন মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। এ সময় হালকা আকাশি রঙের শার্ট ও জিন্স পরিহিত রিয়াদ রাস্তা থেকে একটি বড় কংক্রিটের টুকরো তুলে নেয় এবং সোহাগের কোমর ও বুকের মাঝখানে সজোরে আঘাত করে। সোহাগ তখন দুই হাত ও পা ছড়িয়ে রাস্তায় পড়ে থাকেন। এরপর রিয়াদ বুকের ওপর আরেকটি আঘাত করলে সোহাগ মুখ ফিরিয়ে নেন। তখন গোল গলার টি-শার্ট ও গ্যাবাডিন প্যান্ট পরিহিত সজীব এগিয়ে এসে আরেকটি বড় কংক্রিটের টুকরো মাথার ওপর তুলে সোহাগের মুখে আঘাত করে। এরপর ছোট মনির একটি ইট দিয়ে মাথায় আঘাত করে, লম্বা মনির পাশ থেকে আরেকটি আঘাত করে এবং নান্নু তাদের ইট এগিয়ে দেয়। এভাবে বারবার আঘাত করে সোহাগের মাথা থেঁতলে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। এই হামলা ও হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্ব দেন মহিন ও অপু দাস। জানা যায়, ছোট মনির মিটফোর্ড হাসপাতালের আউটসোর্সিং কর্মচারী, নান্নু হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার এবং লম্বা মনির, রিয়াদ ও সজীব যুবদল নেতা মহিনের কর্মী।

স্থানীয়রা জানান, গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে চকবাজার এলাকায় মহিন ও অপু দাস একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, অস্ত্রবাজি ও চাঁদাবাজিতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন। ফুটপাত দখল করে দোকান ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে হুমকি দিয়ে চাঁদা আদায় করা ছিল তাদের নিয়মিত কাজ। যারা চাঁদা দিতে অস্বীকার করতেন, তাদের মারধর করা হতো এবং দোকান বন্ধ করে দেওয়া হতো। সোহাগ একসময় মহিনের সঙ্গে চলাফেরা করলেও, বিদ্যুতের তামার তার ও সাদা তারের অবৈধ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ সোহাগের হাতে ছিল। মহিন, অপু, চকবাজার থানা যুবদলের সাবেক সদস্য সারোয়ার হোসেন টিটু, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক রজ্জব আলী পিন্টুসহ মিটফোর্ড হাসপাতালের একটি চক্র এই ব্যবসার ৫০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ দাবি করেছিল। তা না পেলে নিয়মিত চাঁদা দিতে হবে বলে হুমকি দিয়েছিল তারা। এ দ্বন্দ্বের জের ধরেই সোহাগকে হত্যা করা হয়।

নিহত সোহাগের পরিবার ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, সাদা তারের অবৈধ ব্যবসা নিয়ে সোহাগ ও মহিন-অপু সিন্ডিকেটের মধ্যে দীর্ঘদিন বিরোধ চলছিল। এ বিরোধের জেরে সোহাগের সোহানা মেটাল নামের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গুলি চালায় প্রতিপক্ষরা। এমনকি তিন দিন ধরে সোহাগকে তার দোকান খুলতে দেওয়া হয়নি। চাঁদা না দেওয়ায় তার দোকান বন্ধ করে দেওয়া হয়। হত্যার আগের দিন মঙ্গলবারও চকবাজার এলাকায় এ নিয়ে গোলাগুলি হয়। এরপর বুধবার পরিকল্পিতভাবে সোহাগকে ডেকে এনে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী জানান, সোহাগ হত্যার কয়েক দিন আগে এক অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসায়ীকে চাঁদার জন্য সবার সামনে মারধর করেন মহিন ও অপু দাস।

গত মার্চে রজ্জব আলী পিন্টু, রবিন ও স্থানীয় বিএনপি নেতা ইসহাক আলী সরকারের নেতৃত্বে গোলাগুলি ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় চাঁদাবাজির অভিযোগে চকবাজার থানায় বিস্ফোরক আইনে মামলা হয়।

সোহাগ হত্যার ঘটনায় তার বোন মঞ্জুয়ারা বেগম বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেছেন। মামলায় মাহমুদুল হাসান মহিন, সারোয়ার হোসেন টিটু, মনির ওরফে ছোট মনির, আলমগীর, মনির ওরফে লম্বা মনির, নান্নু, সজীব, রিয়াদ, টিটন গাজী, রাকিব, সাবা করিম লাকী, কালু ওরফে স্বেচ্ছাসেবক কালু, রজ্জব আলী পিন্টু, মো. সিরাজুল ইসলাম, রবিন, মিজান, অপু দাস, হিম্মত আলী, আনিসুর রহমান হাওলাদারসহ অজ্ঞাতপরিচয় ১৫ থেকে ২০ জনকে আসামি করা হয়।

মামলার বাদী মঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, ‘পরিকল্পিতভাবে আমার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। কয়েকজন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। আমরা চাই, এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবাই দ্রুত গ্রেপ্তার হোক।’

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে এবং রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে এজাহারভুক্ত আসামি মাহমুদুল হাসান মহিন (৪১) ও তারেক রহমান রবিনকে (২২) গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারের সময় রবিনের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। ডিসি তালেবুর রহমান আরও জানান, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব ও পূর্ব শত্রুতার জেরে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান এবং জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অপারেশন) এসএন নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এমন বীভৎসতা আগে দেখিনি। সমাজে অস্থিরতা বিরাজ করছে। তরুণদের একটি অংশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। শৃঙ্খলা ও ঐক্য না থাকলে বিপদ আরও বাড়বে। রক্তাক্ত লাশের ওপর যা ঘটেছে, তা অবর্ণনীয়। এ আচরণ চিন্তার বাইরে।’

যুবদল নেতাদের বহিষ্কার : পুরান ঢাকায় ব্যবসায়ী হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক সহ-জলবায়ুবিষয়ক সম্পাদক রজ্জব আলী পিন্টু ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাবা করিম লাকীকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করেছে যুবদল। গতকাল সংগঠনের পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছেন। বহিষ্কৃত নেতাদের কোনো দায় সংগঠন গ্রহণ করবে না। সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের তাদের সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এদিকে এ ঘটনার প্রতিবাদে রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মিছিল করেছেন সাধারণ ছাত্ররা। তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। এ সময় তারা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নাম নিয়ে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন।

বিএনপি মহাসচিবের উদ্বেগ : রাজধানীর মিটফোর্ডে ব্যবসায়ী সোহাগকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এতে নিহতের পরিবারের প্রতি শোক ও সমবেদনা প্রকাশও করেছেন তিনি।

বিবৃতিতে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘এই পৈশাচিক ঘটনা কেবল একটি জীবনহানিই নয়, এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গভীর হতাশার বহিঃপ্রকাশ। আমাদের সংগঠনের নীতি, আদর্শ ও রাজনীতির সঙ্গে সন্ত্রাস ও বর্বরতার কোনো সম্পর্ক নেই। অপরাধী যেই হোক, তার স্থান কখনোই আইন ও ন্যায়বিচারের ঊর্ধ্বে হতে পারে না। প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘটিত পৈশাচিক ও ন্যক্কারজনক ঘটনাটির দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমাদের সমাজকে আরও গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত করবে।’

ঢাবিতে বিক্ষোভ : রাজধানীর মিটফোর্ডে ব্যবসায়ীকে হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের হলপাড়া থেকে মিছিল শুরু হয়ে ভিসি চত্বরে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়।

সমাবেশে শিক্ষার্থীরা বলেন, মিটফোর্ডে চাঁদার জন্য ব্যবসায়ী সোহাগকে পাথর মেরে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে যুবদল নেতাকর্মীরা। হত্যার পর তার লাশের ওপর বর্বর নৃত্য করেছে। এটা আইয়্যামে জাহেলিয়াতের চিত্র। বাংলাদেশের জনগণ ও ছাত্রসমাজ এই খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত