ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হয়েছিল ১৩ জুলাই ১৯৩০ উরুগুয়ের মন্টেভিডিও শহরের সেন্টেনারিও স্টেডিয়ামে। এখন ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ একটি বিশ্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। এ নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব
১৩ জুলাই ১৯৩০ উরুগুয়ের মন্টেভিডিও শহরের সেন্টেনারিও স্টেডিয়ামে ফুটবল বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচটি যখন শুরু হয়েছিল, তখন হয়তো আয়োজকরাও কল্পনা করতে পারেননি যে, এই ছোট্ট টুর্নামেন্ট একদিন এমন এক বিশ্বজনীন উৎসবে পরিণত হবে। মাত্র ১৩টি দেশের অংশগ্রহণে শুরু হওয়া সেই প্রতিযোগিতা, যেখানে ইউরোপ থেকে এসেছিল কেবল চারটি দল এবং অধিকাংশ খেলোয়াড়কে সপ্তাহব্যাপী জাহাজ যাত্রার মাধ্যমে আটলান্টিক পাড়ি দিতে হয়েছিল, তা আজ এক অভূতপূর্ব বৈশি^ক মহোৎসবে রূপান্তরিত হয়েছে। ১৩ জুলাই এখন কেবল একটি তারিখ নয়; এটি এক ঐতিহাসিক ক্যালেন্ডার চিহ্ন, যা থেকে শুরু হয়েছে ফুটবলকে কেন্দ্র করে মানবজাতির আবেগ, পরিচয়, রাজনীতি এবং বাণিজ্যের এক যুগপৎ উত্তরণ।
ট্রফির আত্মপ্রকাশ
উরুগুয়ে তাদের স্বাধীনতার শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে প্রথম বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পেয়েছিল। ১৩ জুলাই, ১৯৩০-এ ফ্রান্স ও মেক্সিকোর মধ্যকার ম্যাচ দিয়ে টুর্নামেন্টের শুভ সূচনা হয়। তবে আসল উত্তেজনা জমে ওঠে ৩০ জুলাইয়ের ফাইনালে, যেখানে স্বাগতিক উরুগুয়ে ৪-২ গোলে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা জয় করে। এই জয় শুধু উরুগুয়েকে বিশ্বমঞ্চে এক নতুন পরিচয় এনে দেয়নি, বরং ফুটবলের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এই প্রথম বিশ্বকাপেই জন্ম হয়েছিল জুলে রিমে ট্রফির। ১৯৪৬ সালে ফিফার তৎকালীন সভাপতি জুলে রিমের স্মরণে এই ট্রফির নামকরণ করা হয়। নিয়ম ছিল, যে দেশ তিনবার বিশ্বকাপ জিতবে, তারা ট্রফিটি চিরতরে নিজেদের কাছে রেখে দিতে পারবে। সেই সুযোগ আসে ১৯৭০ সালে, যখন ব্রাজিল তৃতীয়বারের মতো শিরোপা জিতে এই ঐতিহাসিক ট্রফিটি নিজেদের করে নেয়। এরপর ১৯৭৪ সাল থেকে চালু হয় বর্তমান ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি, যা আর কোনো দেশকে স্থায়ীভাবে দেওয়া হয় না, বরং বিজয়ী দেশকে একটি সোনার প্রলেপ দেওয়া রেপ্লিকা প্রদান করা হয়।
ফুটবলের রাজনৈতিক মানচিত্র
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফুটবল বিশ্বকাপ আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও জাতীয় পরিচয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। বিভিন্ন দেশের খেলার শৈলী তাদের জাতীয় চরিত্রের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে যেমন ব্রাজিলের ‘সাম্বা ফুটবল’ তাদের জীবনযাত্রার আনন্দকে তুলে ধরে, বা জার্মানির ‘মেশিনের মতো সংগঠিত খেলা’ তাদের শৃঙ্খলা ও কঠোর পরিশ্রমকে ফুটিয়ে তোলে। ১৯৫০-এর দশক থেকে যখন আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশগুলো এই মঞ্চে আসে, তখন বিশ্বকাপ কেবল একটি খেলা না থেকে পোস্ট-কলোনিয়াল বিশ্বের প্রতিরোধের একটি সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়। অনেক সময় স্বাগতিক দেশগুলো নিজেদের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে বিশ্বকাপ আয়োজনকে ব্যবহার করেছে। যেমন : ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপ চলাকালীন স্পেনে সামরিক শাসনের প্রভাব ছিল স্পষ্ট বা ২০০৬ সালের জার্মান বিশ্বকাপ তাদের পুনর্মিলিত হওয়ার চিত্র তুলে ধরেছিল।
বাণিজ্যিকীকরণ ও দর্শকদের বিপ্লব
১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ টিভিতে সম্প্রচারের ফলে বিশ্বকাপ একটি বৈশ্বিক বাণিজ্যিক ইভেন্টে রূপান্তরিত হয়। এই সম্প্রচারের ফলে বিশে^র কোটি কোটি মানুষ একই সঙ্গে খেলা দেখার সুযোগ পায়, যা ফুটবলের জনপ্রিয়তাকে অভূতপূর্ব উচ্চতায় নিয়ে যায়। এরপর ১৯৯৮ সাল থেকে ফিফা বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যা বাড়িয়ে ৩২ করা হয়। আধুনিক যুগে, বিশেষ করে একবিংশ শতাব্দীতে, সোশ্যাল মিডিয়ার উত্থান বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতাকে আরও বহুমাত্রিক করেছে। এখন ভক্তরা কেবল খেলা দেখেন না, তারা তাৎক্ষণিকভাবে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেন, খেলোয়াড়দের নিয়ে আলোচনা করেন এবং হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে বিশ্ব জুড়ে আলোচনায় অংশ নেন। ২০০৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখেছিল প্রায় ৭১৫.১ মিলিয়ন দর্শক, যা বিশ্বকাপকে বিশ্বের বৃহত্তম ক্রীড়া ইভেন্টে পরিণত করেছে। বাণিজ্যিক চুক্তির মাধ্যমে ফিফা প্রতি বিশ্বকাপ চক্রে বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করে, যা ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপের পর প্রায় ৬৪০ কোটি ডলার ছিল এবং ২০২৬ সাল নাগাদ ১১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্বায়ন, মানবাধিকার, আর বিতর্ক
বিশ্বকাপ শুধু খেলার মাঠে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বিশ্বায়ন, মানবাধিকার এবং বিভিন্ন বিতর্কের কেন্দ্রেও পরিণত হয়েছে।
কাতার বিশ্বকাপ (২০২২) : এই বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন উঠে আসে, বিশেষ করে স্টেডিয়াম নির্মাণে শ্রমিকদের অধিকার এবং সমকামী অধিকার নিয়ে বিশ্ব জুড়ে তীব্র সমালোচনা হয়। ফিফার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সেপ ব্লাটারও কাতারকে বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়াকে ‘ভুল সিদ্ধান্ত’ বলে মন্তব্য করেছিলেন।
রাশিয়া বিশ্বকাপ (২০১৮) : এই বিশ্বকাপ ভøাদিমির পুতিনের পিআর (চঁনষরপ জবষধঃরড়হং) প্রকল্প হিসেবে দেখা হয়েছিল, যা রাশিয়ার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার চেষ্টা করে।
ব্রাজিল বিশ্বকাপ (২০১৪) : ব্রাজিল বিশ্বকাপ আয়োজনকালে স্থানীয় দারিদ্র্য, দুর্নীতির অভিযোগ এবং গরিবদের উচ্ছেদ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। যদিও বিশ্বকাপ আয়োজনের ফলে অর্থনৈতিক উন্নতির আশা করা হয়েছিল, গবেষণায় দেখা গেছে যে ব্রাজিল এই আয়োজনে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছিল, কারণ স্টেডিয়াম নির্মাণ এবং অবকাঠামোগত খরচ প্রাথমিক অনুমানের চেয়ে অনেক বেশি ছিল।
এ ছাড়াও রেফারিদের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত বিশ্বকাপের ইতিহাসে বারবার আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ২০১০ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের বাতিল হওয়া গোল বা ১৯৬৬ সালের ফাইনালে ইংল্যান্ডের জিওফ হার্স্টের ‘ভৌতিক গোল’ (যেটি গোললাইন অতিক্রম করেনি বলে পরবর্তী সময় প্রমাণিত হয়) ফিফাকে প্রযুক্তি ব্যবহারের গুরুত্ব উপলব্ধি করিয়েছে। এই বিতর্কগুলোর ফলস্বরূপ পরবর্তী সময় গোল লাইন টেকনোলজি এবং ভিএআর (ঠঅজ)-এর মতো প্রযুক্তি আনা হয়েছে, যা খেলার স্বচ্ছতাকে বাড়িয়েছে। ফিফা বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হলেও, তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগগুলো ফুটবলের ভাবমূর্তিকে অনেকটাই ক্ষুন্ন করেছে।
প্রধান অভিযোগগুলো হলো :
ঘুষ ও অর্থ আত্মসাৎ : ফিফার শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঘুষ গ্রহণ এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে মিডিয়া ও মার্কেটিং চুক্তি এবং বিভিন্ন টুর্নামেন্টের আয়োজক দেশ নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যাপক ঘুষ লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে বলে জানা যায়।
বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব বিক্রি : ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ রাশিয়ায় এবং ২০২২ সালের বিশ্বকাপ কাতারে আয়োজনের স্বত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ ছিল, এই দেশগুলো বিশ্বকাপের স্বত্ব পেতে ফিফার কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়েছিল। এর ফলে ফিফার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সেপ ব্লাটারসহ (ঝবঢ়ঢ় ইষধঃঃবৎ) অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ব্যাপক সমালোচিত হন।
২০১৫ সালের কেলেঙ্কারি : ২০১৫ সালে মার্কিন বিচার বিভাগ ফিফার ১৪ জন কর্মকর্তা ও মার্কেটিং এক্সিকিউটিভের বিরুদ্ধে ১৫০ মিলিয়ন ডলারের বেশি ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ আনে। সুইজারল্যান্ডে অনেক কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ফিফার সদর দপ্তরেও অভিযান চালানো হয়। এই ঘটনা বিশ্ব জুড়ে তোলপাড় শুরু করে দেয় এবং ফিফার ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বেতন ও বোনাসের অসংগতি : ফিফার কিছু শীর্ষ কর্মকর্তা নিজেদের জন্য বিপুল অঙ্কের বেতন ও বোনাস অনুমোদন করেছেন, যা তাদের পদের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এই কেলেঙ্কারিগুলো ফিফাকে নিজেদের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ দিয়েছে। যদিও ফিফা পরবর্তী সময় কিছু সংস্কার আনার চেষ্টা করেছে, তবুও ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর দুর্নীতির কালিমা এখনো অনেকটাই রয়ে গেছে।
গৌরবের মুহূর্তগুলো
ফুটবল বিশ্বকাপ এমন এক মঞ্চ, যেখানে মানবিক ট্র্যাজেডি এবং গৌরবের নাটকীয় মুহূর্তগুলো বারবার রচিত হয়েছে। কিছু অমর মুহূর্ত, যা চিরকাল ফুটবলপ্রেমীদের মনে থাকবে :
পেলের উত্থান (১৯৫৮-১৯৭০) : তরুণ পেলের আবির্ভাব এবং তার তিনটি বিশ্বকাপ জয় ফুটবলকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। তার খেলা বিশ্ব জুড়ে কোটি কোটি মানুষকে মুগ্ধ করেছিল এবং ব্রাজিলকে ফুটবলের সমার্থক করে তুলেছিল।
ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ (১৯৮৬) : মেক্সিকো বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং দিয়ে করা জিনিয়াস গোল তাকে কিংবদন্তির আসনে বসায়। এই একটি ম্যাচই ম্যারাডোনাকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
জিদানের শেষ বিশ্বকাপ (২০০৬) : জিনেদিন জিদানের ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ, যেখানে তার অসাধারণ খেলা এবং ফাইনালে বিতর্কিত লাল কার্ড পেয়ে বিদায় নেওয়া ফুটবল বিশ্বকে আলোড়িত করে।
মেসি (২০২২) : লিওনেল মেসির বহু প্রতীক্ষিত বিশ্বকাপ জয়, যা তার ক্যারিয়ারের এক চূড়ান্ত পরিণতি ছিল এবং বিশ্ব জুড়ে কোটি কোটি ভক্তের স্বপ্ন পূরণ করেছিল। বিশ্বকাপের প্রতিটি গোলের পেছনে থাকে ইতিহাস, প্রতিটি পতনের পেছনে থাকে যুগের গল্প। এটি কেবল ফুটবল ম্যাচ নয়, এটি মানব ইতিহাসের এক চলমান নাট্যমঞ্চ, যেখানে খেলোয়াড়রা নিজ নিজ জাতিসত্তার প্রতিনিধিত্ব করে এবং কোটি কোটি মানুষের আশা-আকাক্সক্ষাকে নিজেদের কাঁধে বহন করে।
১৩ জুলাইয়ের এই ঐতিহাসিক যাত্রা ফুটবলের শতবর্ষের পথ ধরে মানবসভ্যতার আবেগময় এক উত্থানকে নির্দেশ করে। ভবিষ্যতের দিকে তাকালে, ফুটবল বিশ্বকাপ আরও বড় পরিসরে আয়োজিত হতে চলেছে। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ ইতিহাসের বৃহত্তম বিশ্বকাপ হবে, যা প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ কানাডা, মেক্সিকো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে আয়োজন করবে। এই বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যাও ৩২ থেকে বেড়ে ৪৮ হবে।
