নেত্রকোনা শহরকে ঘিরে রেখেছে মগরা নদী। তবে দখল দূষণ আর নদীর বুকে ময়লায় প্রাণ হারাচ্ছে মগড়া নদী। নদীতে পানি আর মাছের পরিবর্তে ময়লাই যেন রয়েছে সর্বত্র।
নেত্রকোনা জেলা শহর প্রথম শ্রেণীর তালিকাভুক্ত পৌরসভা। ১৮৮৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর নেত্রকোনা পৌরসভাকে ১৯৯৬ সালে প্রথম শ্রেণীতে উন্নীত করা হয়। বর্তমানে এই শহরটিতে কয়েক লাখ মানুষের বসবাস। আর দিন যত যাচ্ছে বাড়ছে মানুষের বসতি। বাড়ছে নাগরিক চাহিদা আর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চাপ। তবে পৌরসভার নাগরিকের ঘাড়ে করের বোঝা চেপে দিলেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় হিমশিম প্রথম শ্রেণীর এই পৌরসভার।
দিনভর শহরের জয়ের বাজার, সাতপাই, কুরপাড়, নাগড়া, মোক্তারপাড়া সহ অলিগলির সংগ্রহীত ময়লা আবর্জনা ফেলার জন্য পৌর শহরের বাহিরচাপড়া এলাকায় তিন দশমিক শূন্য পাঁচ একর জায়গায় ৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ব্যয়ে স্যানেটারি ল্যান্ড ফিলের অবকাঠামো নির্মাণ করে পৌরসভা। ২০২৪ সালের এপ্রিলে অনেকটা ঢাকঢোল পিটিয়েই স্যানিটারী ল্যান্ডফিলটি উদ্বোধনও করেন তৎকালীন পৌর মেয়র। তবে উদ্বোধনের পর এক বছরের বেশি সময় পার হলেও এখনো আলোর মুখ দেখেনি পৌরসভার বহুল কাঙ্খিত এই প্রকল্প।
এই প্রকল্প ময়লা আবর্জনা প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য যন্ত্রপাতি স্থাপন করার কথা থাকলেও তার কোন কিছুই হয়নি। শুধু কোটি টাকায় নির্মিত হয়েছে ভবন যার ভিতরে বাহিরে ফেলা হচ্ছে মেডিকেল, মরা জীবজন্তু সহ সকল প্রকার বর্জ্য। দিনরাত বিষাক্ত ধোঁয়ায় দূষিত হচ্ছে আশপাশের পরিবেশও। যা নিয়ে কোনো প্রকার মাথা ব্যথার নেই পৌর কর্তৃপক্ষের।
বাহিরচাপড়া এলাকার বাসিন্দা হাজেরা আক্তার জানান, ময়লা প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য একটি ল্যান্ডফিল্ড তৈরি করল তা কোন কাজে আসছে না। এখন এই সড়ক দিয়ে আমাদের চলাচল করতে ভয় হয়। বিশেষ করে রাতে কোনভাবেই চলাচল করা যায় না। এই রাজুর বাজার এলাকায় বড় একটি গরুর হাট ছিলো এই গরু হাটটিও বন্ধ হয়ে গেছে এই ময়লা ফেলার কারণে।
পরিবেশকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জনউদ্যোগের ফেলো শ্যামলেন্দু পাল জানান, নেত্রকোনা পৌরসভা থেকে ময়লা আবর্জনা ফেলার জন্য একটি ল্যান্ডিং স্টেশন তৈরি করা হয়েছিলো এবং এটা ঘটা করে উদ্বোধন করা হয়। আমরা যত্রতত্র ময়লা ফেলতে দেখছি। এই যে ল্যান্ডিং স্টেশনটা এটা কোন কাজেই আসছে না। প্রতিদিন শত শত টন বর্জ্য নেত্রকোনা রাস্তার আশেপাশে ফেলা হচ্ছে। এমনকি মগড়া নদীতে প্রতিদিন আবর্জনা ফেলে নষ্ট করা হচ্ছে। এতে আমাদের নদীর ক্ষতি হচ্ছে। এখানে কি পৌর কর্তৃপক্ষের লোকের অভাব নাকি অলসতা? সেই জিনিসটা আমাদের জানা নেই। পাশাপাশি আমাদের নাগরিকদেরও আরো সচেতন হতে হবে। তাই যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা ফেলা বন্ধ করে সঠিক স্থানে আমাদের ময়লা ফেলার অভ্যাস তৈরি করতে হবে।
এই দিকে নেত্রকোনা পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হুমায়ুন কবির জানান, নেত্রকোনায় ইউজিপ থ্রি প্রকল্পের আওতায় ময়লা আবর্জনা প্রক্রিয়াজাত করণের জন্য একটি ল্যান্ডিং স্টেশন তৈরি করা হয়েছে। কথা ছিল এই ল্যান্ডফিল পরিকল্পিতভাবে ময়লা আবর্জনা রিসাইকেল করা হবে। ল্যান্ডফিল্ড তৈরি করার পরে যে অবকাঠামো গুলো তৈরি করা হয়েছে সেগুলো ঠিক আছে। প্রজেক্টের আওতায় যতগুলো কার্যক্রম ছিলো সবগুলোই সম্পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু এটা অপারেশন এবং ফাংশনিং জন্য যে যন্ত্রাংশ দরকার সেই জিনিস গুলো আমাদের দেয়া হয়নি। না দেয়ার কারণে পরিকল্পিতভাবে যে ময়লা ফেলতে হবে আমরা সেটা পারছি না। কারণ ল্যান্ডিং স্টেশনে ময়লা ফেলতে হলে ব্লক আকারে ফেলতে হবে। যে গার্বেজ টা তৈরি হয় সে গার্বেজ থেকে অপচনশীল, পলিথিনসহ সবকিছু আলাদা করতে হবে। অপচাশীল বর্জ্য ধাপে ধাপে ফেলে স্তরে স্তরে বালু ফেলে তা থেকে সার তৈরি করে বাজারে বিক্রি করে আয়ের করার একটি কথা ছিল। এখন এই প্রকল্পের জন্য যা কিছু দরকার অবকাঠামো হয়েছে তবে ফাংশনিং করার জন্য যা যা দরকার কোন কিছুই নেই এই প্রকল্প থেকে আমাদের সরবরাহ করা হয়নি। এটিকে পুরোপুরি কার্যকর করতে হলে যন্ত্রাংশের প্রয়োজন। যন্ত্রাংশ ছাড়া এটিকে কোনভাবেই কার্যকর করা যাবে না। এখন আমরা কোন পথ না পেয়ে ম্যানুয়াল ভাবে শহরের ময়লা আবর্জনা ল্যান্ড ফিল্ডের ভেতরে ফেলছি। পুরোপুরি কার্যকর করতে ঊর্ধ্বতন ও কর্তৃপক্ষের সাথেও যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
