১৯৯৪ সালের ১৭ই জুলাই, ক্যালিফোর্নিয়ার প্যাসাডেনার রোজ বোল স্টেডিয়ামের উষ্ণ দুপুরে ফুটবল বিশ্ব এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছিল। ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল ফুটবলের দুই পরাশক্তি ব্রাজিল এবং ইতালি। এটি ছিল বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী ম্যাচ, যা নির্ধারিত ৯০ মিনিট এবং অতিরিক্ত ৩০ মিনিট মিলিয়ে মোট ১২০ মিনিট গোলশূন্য থাকার পর টাইব্রেকারে গড়িয়েছিল। এই ফাইনালই একমাত্র ফাইনাল যা ট্রাইব্ৰেকারে শিরোপা নির্ধারণ করেছে।
কৌশলগত লড়াই ও গোলের আকাল
ফাইনালটি ছিল মূলত একটি কৌশলগত লড়াই, যেখানে দু’দলের রক্ষণভাগের দৃঢ়তা ছিল চোখে পড়ার মতো। ব্রাজিল দলে ছিল রোমারিও এবং ইতালি দলে ছিল রবার্তো ব্যাজিও-এর মতো বিশ্বমানের আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়, কিন্তু কেউই প্রতিপক্ষের জালে বল জড়াতে পারেননি।
প্যাসাডেনা প্রচণ্ড গরম (প্রায় ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) ম্যাচের গতিকে প্রভাবিত করেছিল। এই তাপমাত্রায় খেলোয়াড়দের জন্য ১২০ মিনিট ধরে সেরা পারফরম্যান্স দেওয়া ছিল কঠিন। দুদলই সতর্ক মনোভাব নিয়ে খেলেছিল, গোলের ঝুঁকি না নিয়ে রক্ষণভাগকে শক্তিশালী করার দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছিল। ব্রাজিল তাদের পরিচিত আক্রমণাত্মক ফুটবলের চেয়ে কিছুটা সংযত ছিল, অন্যদিকে ইতালি তাদের ঐতিহ্যবাহী "কাতেনাচিও" (রক্ষণাত্মক) কৌশলকে আরও শক্তিশালী করেছিল। মাঝমাঠের দখল নিয়ে দুই দলের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা চললেও, চূড়ান্ত পাস বা ফিনিশিংয়ে কোথাও যেন একটি অভাব ছিল। অনেক সুযোগ তৈরি হলেও তা কাজে লাগেনি, কারণ দুই গোলরক্ষক- ব্রাজিলের তাফারেল এবং ইতালির জিয়ানলুকা পালিউকা, নিজ নিজ গোলপোস্টের নিচে দুর্দান্ত ছিলেন।
পেনাল্টি শুটআউটের নাটকীয়তা: ব্যাজিওর দুঃখজনক মুহূর্ত
১২০ মিনিট শেষে স্কোরলাইন ০-০, বিশ্বকাপের ভাগ্য গড়ায় পেনাল্টি শুটআউটে। রোজ বোলের গ্যালারিতে তখন পিনপতন নীরবতা, কারণ প্রতিটি শটই ছিল শিরোপা নির্ধারণী।
শুরুতেই নাটকীয়তা। ইতালির কিংবদন্তি ডিফেন্ডার ফ্রাঙ্কো বারেসি প্রথম কিকটি বারের উপর দিয়ে মেরে দেন। ব্রাজিলের মার্সিনহো সান্তোস শট মিস করেন, ফলে প্রথম দুটি কিক শেষে স্কোর সমান থাকে। এরপর ইতালির দিমেত্রিও আলবার্টিনি এবং আলবেরিকো ইভানি গোল করেন। ব্রাজিলের হয়ে রোমারিও এবং ব্রাঙ্কো ঠান্ডা মাথায় গোল করেন।
এরপর ইতালির হয়ে চতুর্থ শট নিতে আসেন দানিয়েল মাসারো, কিন্তু তাঁর শট ঠেকিয়ে দেন তাফারেল। এই সেভ ব্রাজিলের জয়ের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে। এরপর ব্রাজিলের অধিনায়ক দুঙ্গা গোল করে ব্রাজিলকে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে দেন।
ফাইনালের শেষ এবং সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তটি আসে ইতালির পঞ্চম শট নিতে আসা রবার্তো ব্যাজিও-এর মাধ্যমে। 'ডিভাইন পনিটেইল' খ্যাত এই ইতালিয়ান ফরোয়ার্ড টুর্নামেন্ট জুড়ে ইতালির ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন, একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ গোল করে দলকে ফাইনালে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সেই মুহূর্তেই তিনি স্নায়ুর চাপে তার শটটি ক্রসবারের উপর দিয়ে মেরে দেন।
বল আকাশে উঠতেই এক মুহূর্তের নীরবতা—তারপরই ব্রাজিলিয়ান শিবিরে বাঁধভাঙা উৎসব! পেলে, রোমারিও, দুঙ্গারা মিলিয়ে ব্রাজিল পেল তাদের চতুর্থ বিশ্বকাপ শিরোপা। ব্যাজিওর হতাশ মুখচ্ছবি আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বেদনাদায়ক দৃশ্য হিসেবে রয়ে গেছে।
এই জয়ের মধ্য দিয়ে ব্রাজিলই প্রথম দেশ হিসেবে চারটি বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের মাইলফলক স্পর্শ করে। এটি ব্রাজিলের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ তাদের আগের তিনটি শিরোপা (১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০) জুলে রিমে ট্রফির অধীনে এসেছিল, আর এটি ছিল বর্তমান ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি জেতার তাদের প্রথম অভিজ্ঞতা। এর পর ব্রাজিল আর একবারই বিশ্বকাপ জিতেছে, ২০০২ সালে।
