১৭ জুলাই: ঢাবির বেদনাবিধুর দিন

অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডারে যুক্ত হবে ‘সন্ত্রাস প্রতিরোধ দিবস’ 

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২৫, ০৫:৫৪ পিএম

২০২৪ সালের ১৭ জুলাই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) তথা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর দিন হয়ে আছে। দিনটি স্মরণ করলেই চোখের সামনে নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলা, টিয়ারগ্যাসের ধোঁয়ায় ছেয়ে যাওয়া ক্যাম্পাস, আর অশ্রুসিক্ত চোখে শিক্ষার্থীদের হল ছেড়ে যাওয়ার করুণ দৃশ্য মনে পড়ে।

১৫ জুলাই ঢাবি ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের হামলার পরদিন ১৬ জুলাই শহীদ হন আবু সাঈদসহ ৬ জন। এতে আন্দোলনে নতুন করে আগুন জ্বলে ওঠে। ক্ষোভে-বিদ্রোহে ফেটে পড়েন সারা দেশের শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারীরা ১৭ জুলাই দুপুরে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গায়েবানা জানাজা ও কফিন মিছিলের ডাক দেন। এ দিনই সন্ত্রাসী ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হল থেকে বের করে দেন শিক্ষার্থীরা। তাই এখন থেকে দিনটিকে ‘সন্ত্রাস প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালিত হবে বলে জানিয়েছে ঢাবি প্রশাসন।

তবে এর আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ‘ইজারা’ দেয় তৎকালীন ঢাবি প্রশাসন। তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল ঘোষণা দেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ আমার হাতে নেই’। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি প্রবেশপথ, টিএসসি, ভিসি চত্বরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান নেন কয়েক শতাধিক পুলিশ ও বিজিবির সদস্য। গায়েবানা জানাজা শেষে কফিন মিছিল শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ ও বিজিবি একযোগে আক্রমণ করে। সরাসরি শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে ছোঁড়া হয় রাবার বুলেট, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড। ক্যাম্পাসজুড়ে শুরু হয় তাণ্ডব। আহত হন বহু শিক্ষার্থী। ছত্রভঙ্গ হয়ে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন হলে গিয়ে আশ্রয় নেন।

কিন্তু সেখানেও রক্ষা পাননি শিক্ষার্থীরা। বিকাল গড়াতেই পুলিশের সঙ্গে বিজিবি বিশ্ববিদ্যালয়ের হলপাড়ায় অভিযান চালায়। বিকাল ৬টার মধ্যে আবাসিক হল থেকে সবাইকে বের হয়ে যেতে বলা হয়। অন্যথায় জোরপূর্বক হল ছাড়তে বাধ্য করা হবে বলে মাইকে ঘোষণা করা হয়। দেওয়া হয় মাত্র ৩০ মিনিটের আল্টিমেটাম। চোখেমুখে আতঙ্ক আর বেদনা নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী এক কাপড়ে হল ছাড়েন। শিক্ষার্থীরা কাঁদতে কাঁদতে হল ছাড়তে শুরু করেন। যারা বের হননি তাদের হল প্রশাসন প্রতিটি কক্ষে গিয়ে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়তে বাধ্য করা হয়।

এদিন সকাল থেকে আওয়ামী লীগ ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীদের নিজ নিজ ইউনিটকে অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিকভাবে আন্দোলনের মোকাবিলার ঘোষণা দেওয়া হয়। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থী বনাম আওয়ামী লীগ এক অবশ্যম্ভাবী সংঘাতের রূপ নেয়। যেখানে শিক্ষার্থীরা ছিলো নিরস্ত্র আর আওয়ামীলীগ ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীরা ছিলো পুলিশি পাহারায় দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত।

তাই হল ছাড়লেও মুক্তি মেলেনি শিক্ষার্থীদের। হল ছেড়ে ক্যাম্পাস থেকে বের হতেই ওঁৎ পেতে থাকা সন্ত্রাসী ছাত্রলীগের হামলার শিকার হন অসংখ্য শিক্ষার্থী। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা শাহবাগ, চানখারপুল, পলাশী, নীলক্ষেত, বাটা সিগন্যালসহ আশপাশের এলাকায় অবস্থান নেয়। ফলে লাগেজসহ কাউকে দেখলেই ছাত্রলীগ তাদের ওপর হামলা করে। ছাত্রলীগের বিজয় একাত্তর হলের সেক্রেটারি আবু ইউনূস কাটাবন-মুজিব হলের পকেটগেট এবং বাটা সিগন্যালে শিক্ষার্থীদের রাম দা দিয়ে আঘাত করেন। এতে কয়েকজন সংবাদকর্মীসহ শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন।

এর আগে, ১৬ জুলাই প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির এক সভায় শিক্ষার্থীদের হলেই শান্তিপূর্ণ পরিবেশে থাকার জন্য বলা হলেও ১৭ তারিখ সকালে সিন্ডিকেটের মিটিং ডাকে প্রশাসন। সভা থেকে বিকাল ৬টার মধ্যে আবাসিক হল/হোস্টেলে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের হল/হোস্টেল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও একাডেমিক পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

মূলত তখন আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছিলো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও হলকেন্দ্রিক। এরই মাঝে ১৬ জুলাই রাত থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল থেকে ছাত্রলীগ নেতাদের বিতাড়িত করার ঘটনা শুরু হলে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেই ভেবে আন্দোলন দমন করার প্রাথমিক ধাপ হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) দেশের সব সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও অধিভুক্ত কলেজ বন্ধ ঘোষণা করে এবং শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের নির্দেশ দেয়।

সারাদেশের শিক্ষার্থীরা প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গ্রুপগুলোতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এমনকি হল ছাড়ার নির্দেশনা আসলেও কেউ হল ছাড়বেন না এবং ঐক্যবদ্ধ হয়ে হলে অবস্থানের ঘোষণা দেন। যদিও সে সংকল্প ধরে রাখতে পারেননি কেউ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চাপের মুখে শিক্ষার্থীরা হল ছাড়তে বাধ্য হন।

এর আগে, কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সাথে ছাত্রলীগের সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনায় ১৫ জুলাই সন্ধ্যা থেকে ঢাবি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের স্বেচ্ছায় পদত্যাগের হিড়িক পড়ে। এ ছাড়া ছাত্রলীগের যেসব নেতাকর্মী যারা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জড়িত ছিল, তাদের বয়কট করেন শিক্ষার্থীরা। ১৪ জুলাই গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীদের রাজাকারের নাতি-পুতি হিসেবে আখ্যায়িত করার পর থেকে এই পদত্যাগ শুরু হয়। ওই দিন রাতেই স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন ছাত্রলীগ নেতা। ১৭ জুলাই এসে পদত্যাগের পরিমাণ বাড়ে এবং তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে মিলে আন্দোলনে অংশ নেন।

১৬ জুলাই রাতে ‘ছাত্রলীগ মুক্ত হল’ অভিযান শুরু হওয়ার পর ১৭ জুলাই ভোর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হলে নিষিদ্ধ হয় ছাত্রলীগ। সর্বশেষ দুপুরে জগন্নাথ হল ছাত্রলীগমুক্ত ঘোষণা করা হয়। তাই দিনটিকে স্মরণে রাখতে প্রতি বছর ১৭ জুলাই ‘সন্ত্রাস প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে ঢাবি প্রশাসন। গত মঙ্গলবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নারী শিক্ষার্থী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত ‘প্রতীকী রাত দখল’ কর্মসূচিতে এমন ঘোষণা দেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান। দিবসকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডারে অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলেও জানান উপাচার্য।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত