পাকিস্তানে ভারী বর্ষণে ১৮০ জনের মৃত্যু, আরও বৃষ্টির শঙ্কা

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৫, ১১:৩৯ এএম

পাকিস্তানজুড়ে চলছে বর্ষাকাল। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার বৃষ্টিপাত প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি। জাতীয় ও প্রাদেশিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ আগামীতে আরও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে।

জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিএমএ) জানিয়েছে, জুলাই মাসের শুরু থেকে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের কারণে এখন পর্যন্ত ১৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫০০ জনের বেশি আহত হয়েছে।

পাকিস্তান আবহাওয়া বিভাগ শনিবার (১৯ জুলাই) জানায়, আগামী ২৪ ঘণ্টায় সিন্ধু প্রদেশে ভারী বৃষ্টি, দমকা হাওয়া ও বজ্রপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে করাচি, হায়দরাবাদ, সুক্কুর, ঠাট্টা, বাদিন, লারকানা, জ্যাকোবাবাদ, নবাবশাহ ও মিরপুরখাসে বৃষ্টি বেশি হতে পারে।

এনডিএমএর জরুরি অপারেশন কেন্দ্র (এনইওসি) নিম্নভূমিতে নগর বন্যার আশঙ্কা প্রকাশ করে সতর্কতা জারি করেছে। নাগরিকদের প্রবল বৃষ্টির সময় ঘরে থাকতে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় না যেতে এবং পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা পরিষ্কার রাখতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

পাঞ্জাব প্রদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আজ থেকে বর্ষার চতুর্থ ধাপ শুরু হচ্ছে। ২০ থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত পাঞ্জাবের বেশিরভাগ জেলায় ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টি হতে পারে। রাওয়ালপিন্ডি, মুর্রি, গালিয়াত, অ্যাটক, চকওয়াল, মান্ডি বহাউদ্দিন, হাফিজাবাদ, গুজরাট, ঝেলাম ও গুজরানওয়ালায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। একই সময়ে লাহোর, ফয়সালাবাদ, শিয়ালকোট, নারোয়াল, টোবা টেক সিং, ঝাং, সারগোধা, মিয়ানওয়ালি, মুলতান, ডেরা ঘাজি খান, বাহাওয়ালপুর ও বাহাওয়ালনগরেও বৃষ্টি হতে পারে।

পাঞ্জাব দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (পিডিএমএ) সব প্রধান নদী ও সংযুক্ত জলধারায় উচ্চস্তরের বন্যা সতর্কতা জারি করেছে। ২২ জুলাই থেকে নতুন আবহাওয়া ব্যবস্থার কারণে নদীতে পানি বাড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

ফ্লাড ফরকাস্টিং বিভাগ জানিয়েছে, চেনাব, ঝেলাম, রাভি, শতলজ ও সিন্ধু নদী এবং তাদের উপনদী ও নিম্নভূমিতে পানির প্রবাহ বাড়বে, যা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

খাইবার পাখতুনখাওয়ায় বর্ষা ও হিমবাহ গলনের কারণে হঠাৎ বন্যার শঙ্কা তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে কাবুল, সোয়াত, পাঞ্জকোরা, বারা ও কালপানি নালার এলাকায়। এনডিএমএ জানিয়েছে, পার্বত্য এলাকায় পরিবহন ব্যবস্থা বিঘ্নিত হতে পারে।

ইসলামাবাদ ও মধ্য পাঞ্জাবে আগামী ২৪ জুলাই পর্যন্ত মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা নগর বন্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

সম্প্রতি বৃষ্টির কারণে রাওয়াল বাঁধের পানি সর্বোচ্চ ১,৭৪৮ ফুটে পৌঁছেছে। আজ রবিবার সকালে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিয়ে স্তর ১,৭৪৬ ফুটে নামানো হবে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। আশপাশের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

বৃষ্টিজনিত দুর্ঘটনায় তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আমানপুরে ছয় বছরের ফাতিমা পানির খালে ডুবে মারা যায়। ভাট্টায় বারো বছরের মোহাম্মদ সুলেমানের বাড়ির ছাদ ভেঙে পড়ে তার মৃত্যু হয়। ঘোরঘুশতিতে পাঁচ বছরের উমর আয়ুব বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যায়।

পাঞ্জাবে ২৫ জুন থেকে এখন পর্যন্ত রেসকিউ ১১২২ সংস্থা ১,৫৯৪ জনকে উদ্ধার করেছে। জরুরি সেবা সচিব ড. রিজওয়ান নাসের জানান, এদের মধ্যে ৪৪৯ জন গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ পর্যন্ত ১১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই পুরনো বাড়ি ধসে পড়ার শিকার।

উদ্ধার অভিযানে ৪৪৪ জনকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরিয়ে আনা হয়েছে। ১০০টির বেশি নৌকা ও ৩১২ জন উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। লাহোরে ২৭ জন, ফয়সালাবাদে ১৫ জন, শেখুপুরায় ১১ জন ও রাওয়ালপিন্ডিতে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

২৫ জুন থেকে এখন পর্যন্ত ৩৬৯টি বাড়ি ধসে পড়া, ২৩টি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট মৃত্যু ও ৬২টি বৃষ্টিজনিত দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। ড. নাসের নাগরিকদের ছাদ পরীক্ষা করতে, বৃষ্টির সময় বৈদ্যুতিক খুঁটি এড়িয়ে চলতে ও ভ্রমণের আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক দ্রুত মেরামতের নির্দেশ দিয়েছেন। পিন্ড দাদন খান-ঝেলাম রোড, মাট্টা খুরদ রোড ও চকওয়াল-কাল্লার কাহার সড়ক পুনরায় চালু করা হয়েছে। রাওয়ালপিন্ডিতে ক্ষতিগ্রস্ত ক্রলি ধোক ব্রিজ ও ধোক পরওয়ানা রোডও খুলে দেওয়া হয়েছে।

চকওয়ালে মুখ্যমন্ত্রী শনিবার সফর করেন। তিনি বন্যাকবলিত পরিবারগুলোর জন্য পরিবারপ্রতি ৫০ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেছেন। গত সপ্তাহে জেলায় রেকর্ড ৪৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি থেকে পরিবারগুলোকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন এবং চকওয়াল-সোহাওয়া রোডে স্টিলের সেতু নির্মাণের কথা বলেন।

পাঞ্জাব সরকার বেসরকারি আবাসিক এলাকার নালা পরিষ্কার রাখতে, রাওয়ালপিন্ডিতে আধুনিক সতর্কতা ব্যবস্থা স্থাপন করতে এবং রাভি, শতলজ ও বিয়াস নদীর পাশের বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এনডিএমএর চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইনাম হায়দার মালিক জানান, এবারের বর্ষা গত বছরের তুলনায় ৬০ শতাংশ বেশি তীব্র। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও হিমবাহ গলনের কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও সশস্ত্র বাহিনীর তত্ত্বাবধানে এনডিএমএ, পিডিএমএ, এনজিও ও শিল্প খাত একসঙ্গে কাজ করছে।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত