প্রশিক্ষণ শেষে প্রথম উড্ডয়নেই চিরবিদায়

আপডেট : ২২ জুলাই ২০২৫, ০৯:০৪ এএম

সকালটা ছিল স্বপ্নের মতো। কারণ এদিনই ছিল ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামের প্রথম একক প্রশিক্ষণ ফ্লাইট। রাজশাহীতে তাঁর পরিবার সেই খবরে সকাল থেকেই ছিল আনন্দিত। কিন্তু দুপুর গড়াতেই সে আনন্দ বদলে যায় শোকে। বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার সংবাদ পাওয়ার পর থেকে তাঁদের ঘর ভরে ওঠে কান্নার আওয়াজে।

গতকাল সোমবার দুপুরে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান রাজধানীর উত্তরা এলাকার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভবনে বিধ্বস্ত হয়। এতে বৈমানিক তৌকিরসহ অন্তত ২০ জনের প্রাণহানির খবর নিশ্চিত করেছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)। তবে আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ২৭ জনের মৃত্যুর বিষয় নিশ্চিত করেছে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন ডা. শাওন বিন রহমান।

তৌকির ইসলামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার কানসাট এলাকায় হলেও পরিবারের বসবাস রাজশাহীর উপশহর ৩ নম্বর সেক্টরের একটি ভাড়া বাসায়। তাঁর বাবা আমদানি-রপ্তানির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।

তৌকিরের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত তাঁরা জানতেন না যে তৌকির মারা গেছেন। তখন ধারণা ছিল তিনি ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন। এই খবরে তাঁরা তাঁকে দেখতে ঢাকায় যেতে চান। বিমানবাহিনীর পক্ষ থেকে দ্রুত একটি হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা করা হয় এবং বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তাঁর বাবা, মা, বোন ও ভগ্নিপতি রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন।

তৌকিরের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর রাজশাহীর উপশহরের বাসার সামনে ভিড় করতে থাকেন প্রতিবেশী ও সংবাদকর্মীরা। বাড়ির ভেতর ছিলেন তাঁর নানা, নানি ও খালা। তাদের কান্নার আওয়াজ বাইরে পর্যন্ত শোনা যাচ্ছিল। বাসার সামনে দাঁড়িয়ে তৌকিরের মামা মোতাকাব্বির উপস্থিত মানুষকে ঘটনার বিস্তারিত জানাচ্ছিলেন।

মোতাকাব্বির জানান, তৌকির রাজশাহীর ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। এরপর ভর্তি হন পাবনা ক্যাডেট কলেজে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে যোগ দেন। বছরখানেক আগে তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষিকাকে বিয়ে করেন।

তিনি আরও বলেন, তৌকিরের পরিবার যখন ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে, তখনও তাঁরা জানতেন না যে সাগর (তৌকির) আর জীবিত নেই। তাঁরা ভেবেছিলেন, তিনি সিএমএইচে চিকিৎসাধীন আছেন।

আইএসপিআরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এফটি-৭ বিজিআই মডেলের যুদ্ধবিমানটি রুটিন প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে গতকাল দুপুর ১টা ৬ মিনিটে ঢাকার কুর্মিটোলার বিমানবাহিনী ঘাঁটি এ কে খন্দকার থেকে উড্ডয়ন করে। উড্ডয়নের পরপরই এটি যান্ত্রিক ত্রুটির মুখে পড়ে।

বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দুর্ঘটনা এড়াতে এবং সম্ভাব্য বড় ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে বৈমানিক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলাম বিমানটিকে জনবহুল এলাকার বাইরে নিতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেটি ঢাকার দিয়াবাড়ি এলাকায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভবনে গিয়ে আছড়ে পড়ে।

আইএসপিআর আরও জানায়, আহতদের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল ও নিকটবর্তী বিভিন্ন হাসপাতালে হেলিকপ্টার ও অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে দ্রুত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় বিমানবাহিনী গভীরভাবে শোকাহত এবং আহতদের চিকিৎসা ও অন্যান্য সহায়তায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।

বিমানবাহিনীর প্রধান বর্তমানে বিদেশ সফরে থাকায় সহকারী প্রধান (প্রশাসন) এবং অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে ইতোমধ্যেই একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে আইএসপিআরের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত