পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোকে মালামাল কিনতে হয় বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি) থেকে। নীতি প্রণয়নসহ সমিতির জনবলের নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, বেতন-ভাতা, তদন্ত-শাস্তি—এ সবই বিআরইবির সিদ্ধান্তক্রমে বাস্তবায়িত হয়। যে বিআরইবি এই সিস্টেমের নীতিনির্ধারণ, মালামাল সরবরাহ, গুণগত মান যাচাইসহ সবকিছু করে, তাদের জবাবদিহির জন্য পাওয়া যায় না। অথচ কোনো দুর্ঘটনা বা ত্রুটি হলে বিআরইবিই আবার তদন্ত করে। তখন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরই শাস্তি হয়। এরপরও বিআরইবির দেওয়া ত্রুটিপূর্ণ ডিজাইন বা মালামাল সরবরাহ বন্ধ হয়নি।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড বা বিআরইবি বাংলাদেশের সংবিধান লঙ্ঘন ও সরকারী বিভিন্ন নির্দেশনা অমান্য করে পল্লী বিদ্যুতের কর্মীদের ওপর নির্যাতন চালায়। এছাড়াও বিআরইবির বিভিন্ন প্রকল্পে ও মালামাল ক্রয়ে নানা রকম অনিয়ম দুর্নীতির কথা তুলে ধরেন তারা। এসব দুর্নীতি ও অনিয়মের ফলে মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে নানা রকম হয়রানি ও গ্রাহকের তোপের মধ্যে পড়তে হয় পল্লী বিদ্যুতের কর্মীদের।
সম্প্রতি বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড কর্তৃক নিম্নমানের বিভিন্ন বৈদ্যুতিক মালামাল ক্রয়ের প্রতিবেদন বিভিন্ন পত্রিকায় এবং টিভি চ্যানেলে প্রকাশ পায়। এই প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে গ্রাহক পর্যায়ে স্থাপিত মিটারে বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকা সত্ত্বেও এগুলোতে লাল বাতি জ্বলে, গ্রাহকের বিল উঠে এবং গ্রাহককে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হয়। অথচ বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড এসব নিম্নমানের বৈদ্যুতিক মিটার উন্মুক্ত দরপত্রের নামে ক্রয় করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর মাধ্যমে গ্রাহক পর্যায়ে প্রদান করে থাকে।
তবে লক্ষণীয় যে এত আন্দোলন ও দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হলেও বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড কর্তৃক বৈদ্যুতিক মালামাল ক্রয়ে তাদের অনিয়ম ও দুর্নীতি রোদে তাদের কোন কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। জুন ২, ২০২৫ তারিখে “দৈনিক দেশ রূপান্তর” পত্রিকায় প্রকাশিত “অনভিজ্ঞ ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার সুপারিশ আরইবির” শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে তার প্রমাণ পাওয়া যায়।
গত ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি, বিআরইবি দুটি প্যাকেজের আওতায় ১২০টি ১১ কেভি এবং ১০০টি ৩৩ কেভি এসিআর কেনার জন্য স্থানীয়ভাবে দরপত্র আহ্বান করে। এসব দরপত্রে অংশ নেয় একাধিক প্রতিষ্ঠান, যার মধ্যে ‘এম আর বি আর কর্পোরেশন’ নামের একটি নতুন কোম্পানি দক্ষিণ কোরিয়ার বিএইচ সিস্টেম কো. লি.-এর পণ্য সরবরাহের প্রস্তাব দেয়। যদিও এই কোম্পানি বা তাদের প্রস্তাবিত সরবরাহকারী পূর্বে বাংলাদেশের কোন বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় কিংবা নিজ দেশসহ পৃথিবীর কোথাও কোনো বিদ্যুৎ বিতরণী সংস্থায় দরপত্রে চাহিদাকৃত ১১ কেভি এসিআর সরবরাহ করেনি, তথাপি সংশ্লিষ্ট মূল্যায়ন কমিটি তাদের প্রস্তাবিত পণ্যের কার্যকারিতা যাচাই-বাছাই না করে অনভিজ্ঞ এসিআর উৎপাদনকারী ও সার্ভিস প্রদানকারী দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার সুপারিশ করেছে। একই কোম্পানিকে ৩৩ কেভি এসিআর সরবরাহার কাজে ৭১৩ নং বোর্ড সভায় কারিগরিভাবে নন রেসপন্সিভ করা হয়েছে।
দরপত্রের শর্ত অনুসারে উৎপাদনকারীর ন্যূনতম ১ (এক) বছরের দরপত্রে আহ্বানকৃত মালের সন্তোষজনক অপারেশনের অভিজ্ঞতা সনদপত্র পৃথিবীর যেকোনো বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা থেকে দিতে হবে। কিন্তু দরপত্রে গুণগত মালামাল ক্রয় নিশ্চিত করার এই শর্তটিকে উপেক্ষা করা হয়েছে। অবাক করা বিষয় হচ্ছে দরপত্রে ১২০টি ১১ কেভি এসিআর ক্রয়ের জন্য আহ্বান করা হয়েছে অথচ উক্ত কোরিয়ান কোম্পানির তার ৯ বছরের উৎপাদন মেয়াদে এতগুলো এসিআর বানানোর কোন অভিজ্ঞতা নেই।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দরদাতা প্রতিষ্ঠানটি তাদের দরপত্রের সঙ্গে যে আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছে, তাতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তাদের আয় দেখানো হয়েছে ১৩ লাখ ৪৯ হাজার টাকা, যা আয়কর বিভাগের একজন উপ-কর কমিশনার কর্তৃক প্রত্যয়নও পেয়েছে। কিন্তু, হাফিজ আহমেদ অ্যান্ড কোং কর্তৃক জারি করা অডিট রিপোর্ট অনুসারে, ৩০ জুন, ২০২৪ তারিখে সমাপ্ত বছরের আয় ছিল ১ কোটি ২০ লাখ ১১ হাজার ৩২৯ টাকা। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি সরকারকে বড় অঙ্কের কর ফাঁকি দিয়ে কার্যত রাষ্ট্রীয় রাজস্ব হরণ করেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যা শুধু দুর্নীতির ইঙ্গিতই দেয় না, বরং সরকারী ক্রয়নীতির আইনি শর্তাবলীর সরাসরি লঙ্ঘনও। ইতিপূর্বে বিআরইবি এই ধরনের জাল কাগজপত্রাদির জন্য সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারীকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। কিন্তু এই দরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিআরইবি সম্পূর্ণ ব্যাপারটি লুকিয়ে গিয়েছে।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, দরদাতা প্রতিষ্ঠান-এম আর বি আর কর্পোরেশনের মালিক ইতিপূর্বে বিআরইবিতে কর্মরত ছিল। সে তার এই পরিচিতি ব্যবহার করে উক্ত অসামঞ্জস্যতা ডেকে কার্যাদেশ প্রাপ্তির জন্য তদবির করে বোর্ডে উপস্থাপন করেছিল। উক্ত অসামঞ্জস্যতার বিরুদ্ধে বোর্ড সিদ্ধান্ত না নিয়ে যাচাই করণের জন্য টিইসি কমিটিকে নির্দেশ দেয়। ইতিমধ্যে এম আর বি আর কর্পোরেশনের মালিক জনাব রাশেদ পুনরায় বিআরইবিতে যোগদান করে এবং সক্রিয়ভাবে কার্যাদেশ প্রাপ্তির জন্য তদবিরে ব্যস্ত আছেন বলে জানা যায়। এতে সুস্পষ্টভাবে বিআরইবির কর্মকর্তাদের ক্রয় কার্যে সক্রিয় অংশগ্রহণের ভূমিকা প্রমাণিত হয়।
পূর্বে বাপবিবো ২০১৫ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে চার্ডন কোরিয়া কোম্পানি লিমিটেডের কাছ থেকে প্রায় ৫০ কোটি টাকার ৫২৭টি এসিআর কিনে, যেগুলোর প্রায় সবকটিই খুব অল্প অতিদ্রুত সময়ের মধ্যেই বিকল হয়ে যায়। পরবর্তীতে এই ব্যাপারে, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে এই অপকর্মের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তি মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সুপারিশ প্রদান করে, কিন্তু আজ পর্যন্ত বিআরইবি কোন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। এই ঘটনার পেছনে একটি পুরাতন স্বার্থান্বেষী সিন্ডিকেটের পুনরায় সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
তাছাড়া ইতিপূর্বে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড সিংসান কোরিয়া থেকেও ৩০০টি নিম্নমানের এসিআর ক্রয় করেছিল। উক্ত এসিআর গুলো পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ব্যবহার করতে পারে নাই। পরবর্তীতে উক্ত এসিআর প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়।
ফলে বিদ্যমান এই দুর্নীতির জাল থেকে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড বের হয়ে না আসতে পারলে চলমান আন্দোলনকে কোনরকমে প্রশমিত করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের ক্রয় প্রক্রিয়ার সাথে যেসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত তাদের শাস্তির ব্যবস্থা না করলে কখনো বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের অনিয়ম দুর্নীতি দূর করা সম্ভব নয়।
