বিমান থেকে ত্রাণ ছোড়ার ঘোষণা দিল ইসরায়েল, নিহত আরও ৫৩

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৫, ০৮:৪৩ এএম

দীর্ঘদিনের চাপে অবশেষে গাজায় বিমান থেকে ত্রাণ সরবরাহ ও মানবিক করিডোর চালুর ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। শনিবার (২৬ জুলাই) রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে তারা জানায়, রাত থেকেই ত্রাণ ফেলা শুরু হবে এবং জাতিসংঘের গাড়িবহরের জন্য মানবিক করিডোর তৈরি করা হবে।

এই ঘোষণা আসে এমন এক সময়, যখন গাজায় অনাহারে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক মহলের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের—সমালোচনার মুখে রয়েছে ইসরায়েল। গত কয়েক সপ্তাহে খাবার সংগ্রহ করতে গিয়ে বহু ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

কোথায় ত্রাণ পড়বে, এখনও পরিষ্কার নয়

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ঘোষণায় ঠিক কোথায় বিমান থেকে ত্রাণ ফেলা হবে বা মানবিক করিডোর চালু হবে, তা স্পষ্ট করা হয়নি। তবে তারা জানিয়েছে, জনবহুল এলাকায় ‘মানবিক বিরতি’ দেওয়া হতে পারে।

একইসঙ্গে তারা আবারও দাবি করেছে, গাজায় ‘ক্ষুধা নেই’ এবং যুদ্ধ অভিযানও বন্ধ হয়নি। সেনাবাহিনী বলেছে, তারা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে এই ত্রাণ ফেলার কাজ করছে। শনিবার রাতে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা দপ্তরের অধীনস্থ সংস্থা কোগাটের নেতৃত্বে তোলা একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়, যেখানে দেখা যায়—আটা, চিনি ও ক্যানজাত খাবারভর্তি সাতটি প্যাকেট বিমান থেকে ফেলা হচ্ছে।

মানবেতর অবস্থা, ক্ষুধায় কাতর শিশু

গাজার স্বাস্থ্যকর্মীরা জানিয়েছেন, এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছেন যে নিজেরাই স্যালাইন নিতে বাধ্য হচ্ছেন। অভিভাবকেরা দুর্বল, কঙ্কালসার শিশুর ছবি দেখাচ্ছেন, আর আহত ব্যক্তিরা জানাচ্ছেন, কীভাবে গুলির মধ্য দিয়ে খাবার নিতে দৌঁড়েছেন।

সাহায্যের অপেক্ষায় গুলিতে ঝরছে প্রাণ

শনিবার গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলা ও গুলিতে অন্তত ৫৩ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা ও অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস। এর মধ্যে অনেকে খাবার নিতে গিয়ে গুলিতে মারা যান।

উত্তর গাজার জিকিম ক্রসিং এলাকায় দুইবার গুলির ঘটনা ঘটে। প্রথম ঘটনায় শিফা হাসপাতালে আনা অন্তত ১২ জনের লাশের কথা জানিয়েছেন হাসপাতালের কর্মীরা। ইসরায়েলি সেনারা দাবি করেছে, তারা ‘তাৎক্ষণিক হুমকি’র জবাবে সতর্কতামূলক গুলি ছুড়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী শরীফ আবু আইশা বলেন, ‘আমরা ভাবলাম ত্রাণবাহী ট্রাক এসেছে। ছুটে যেতেই দেখি, ওটা আসলে ইসরায়েলের ট্যাংক। তখনই গুলি শুরু হয়। আমার চাচাও মারা গেছেন।’

শনিবার সন্ধ্যায় জাতিসংঘের একটি কনভয়ের কাছাকাছি আরও ১১ জন নিহত এবং ১২০ জন আহত হন, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই খাবার নিতে গিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন শিফা হাসপাতালের পরিচালক ড. মোহাম্মদ আবু সেলমিয়া।

অন্যদিকে খান ইউনুসের মোরাগ করিডোরে খাবার নিতে গিয়ে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে ৯ জন নিহত হয়েছেন বলে হাসপাতালের মরচুয়ারি রেকর্ডে জানা গেছে। একইসঙ্গে গাজা শহরের একটি ভবনে চারজন এবং খান ইউনুসের মুয়াসি শরণার্থী শিবিরে আটজন, যার মধ্যে চার শিশু রয়েছে, নিহত হন।

বিতর্কিত এয়ারড্রপ, কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন

এই বিমান থেকে ত্রাণ সরবরাহের উদ্যোগ আসে প্রতিবেশী জর্ডানের অনুরোধে। জর্ডানের একজন কর্মকর্তা জানান, এতে মূলত খাবার ও শিশুদের জন্য দুধ থাকবে। সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তারা তাৎক্ষণিক এয়ারড্রপ শুরু করবে। ব্রিটেন জানিয়েছে, তারা অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে ত্রাণ পাঠাবে ও চিকিৎসা সহায়তা প্রয়োজন এমন শিশুদের সরিয়ে নেবে।

তবে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থার প্রধান ফিলিপ লাজারিনি বলেছেন, এয়ারড্রপ খুব ব্যয়বহুল, অকার্যকর এবং এতে অনাহারে থাকা মানুষের মৃত্যু ঝুঁকি বাড়ে।

ইসরায়েল দাবি করছে, তারা গাজায় সাহায্য প্রবেশে কোনো সীমা আরোপ করছে না। কিন্তু জাতিসংঘ বলছে, সেনাবাহিনীর বিধিনিষেধ ও লুটপাটে তাদের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। হামাস-নিয়ন্ত্রিত পুলিশ নিরাপত্তা দিত, কিন্তু বিমান হামলায় লক্ষ্যবস্তু হওয়ার পর তারা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

ইসরায়েলের মতে, গত এক সপ্তাহে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থার ২৫০টি ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশ করেছে। অথচ সর্বশেষ অস্ত্রবিরতির সময় প্রতিদিন গড়ে ৬০০টি ট্রাক প্রবেশ করত।

সহিংসতার বিরুদ্ধে বাড়ছে আন্তর্জাতিক চাপ

আন্তর্জাতিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে। পশ্চিমা ঘরানার দুই ডজনের বেশি দেশ ও শতাধিক ত্রাণ ও মানবাধিকার সংস্থা যুদ্ধ বন্ধের দাবি জানিয়েছে। তারা ইসরায়েলের অবরোধ ও নতুন ত্রাণ ব্যবস্থার সমালোচনা করেছে।

জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তর বলছে, মে মাস থেকে এখন পর্যন্ত খাবার নিতে গিয়ে ১ হাজার জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত নতুন ত্রাণকেন্দ্রের আশপাশে ছিলেন।

শান্তি আলোচনা স্থগিত

ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে শান্তি আলোচনা বর্তমানে স্থবির। বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আলোচক দল প্রত্যাহার করে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, তারা ‘বিকল্প পথ’ ভাবছেন। তবে হামাসের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আলোচনা আবার শুরু হবে এবং দল প্রত্যাহার ছিল চাপ সৃষ্টির কৌশল।

মধ্যস্থতাকারী মিসর ও কাতার আলোচনা পুনরায় শুরুর কথা বললেও তারিখ জানায়নি।

অক্টোবর ৭-এ হামাসের আক্রমণে অপহৃত ৫০ জন এখনও গাজায় রয়েছেন। তাদেরই একজন অব্রাহাম মুন্ডারের ভাগনে জাহিরো শাহার মর তেলআবিবে এক সমাবেশে বলেন, ‘আমাদের প্রিয়জনদের আর সময় নেই, আর কোনো আংশিক সমাধান তারা সহ্য করতে পারবে না।’

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৫৯ হাজার ৭০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি নারী ও শিশু। যদিও মৃতদের মধ্যে কারা যোদ্ধা আর কারা সাধারণ মানুষ, সে হিসাব দেওয়া হয়নি। তবে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই মন্ত্রণালয়ের তথ্যকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করে।

সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত